বড় বিনিয়োগে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, যুক্ত হচ্ছে ২১টি বোয়িং উড়োজাহাজ
দেশের বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ব্যাপকভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণে যাচ্ছে। এ জন্য বড় অঙ্কের বিনিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৭ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে এই বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
কোম্পানি–সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী দেড় বছরের মধ্যে বেসরকারি এই বিমান পরিবহন সংস্থা তাদের বহরে নতুন করে ২১টি বোয়িং ৭৩৭–৮ উড়োজাহাজ যুক্ত করবে। এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটি ধাপে ধাপে ১১১ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন ২১টি বোয়িং যুক্ত হলে বিমান সংস্থাটির বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হবে। বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি এয়ারক্রাফট লিজিং প্রতিষ্ঠান (লেসর) থেকে বোয়িং উড়োজাহাজগুলো সংগ্রহ করা হবে। ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনাও ইতিমধ্যে চূড়ান্ত হয়ে গেছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই বিনিয়োগে শুধু ইউএস-বাংলার বহর ও আন্তর্জাতিক গন্তব্যই সম্প্রসারিত হবে না, এর পাশাপাশি এই শিল্পে দেশীয় সক্ষমতাও নতুন উচ্চতায় উন্নীত হবে।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন সম্প্রতি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনকে এক চিঠির মাধ্যমে এই বিনিয়োগ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। চিঠিতে তিনি বলেন, ব্যবসা সম্প্রসারণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগামী বছরের মধ্যে ২১টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ ইউএস–বাংলার বহরে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এসব উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হওয়ার পর ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটকে আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তুলবে ইউএস-বাংলা। ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে নতুন ফ্লাইট বা উড্ডয়ন চালু করবে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, ২৯ জুলাই রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ২১টি নতুন উড়োজাহাজ সংযোজনের পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে। অনুষ্ঠানে বোয়িংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট পল রিগিহ এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারক্রাফট লিজিং প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিসহ দেশি-বিদেশি এভিয়েশন, ট্রাভেল ও পর্যটন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন। সেখানে বিনিয়োগ পরিকল্পনা, উড়োজাহাজ সরবরাহের সময়সূচি ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ কৌশলের বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।
জানতে চাইলে ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের এমডি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘নতুন উড়োজাহাজগুলো যুক্ত হলে আমরা আন্তর্জাতিক গন্তব্যে উড্ডয়ন বাড়াব। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান কিছু পথে উড্ডয়ন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন গন্তব্যেও যাত্রা শুরু করা হবে। সম্ভাব্য নতুন গন্তব্যের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের দাম্মাম, দক্ষিণ কোরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) রাসেল খাইমা, মালয়েশিয়ার পেনাং ও জহুরবারু, শ্রীলঙ্কার কলম্বো এবং ব্রুনাই ইত্যাদি। তখন চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন গন্তব্যে সরাসরি উড্ডয়ন পরিচালিত হবে।’
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন উড়োজাহাজগুলো ইউএস–বাংলার বহরে যুক্ত হবে। তাতে পাইলট, প্রকৌশলী, কেবিন ক্রু, কারিগরি জনবল মিলিয়ে তিন হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এতে দেশের পর্যটন, বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা সংস্থাটির।
ইউএস বাংলা বর্তমানে ১০ দেশের ১৪টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে নিয়মিত চলাচল করছে। গন্তব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারতের কলকাতা ও চেন্নাই; মালদ্বীপের মালে; ওমানের মাসকাট; কাতারের দোহা; সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাই, শারজা ও আবুধাবি; সৌদি আরবের জেদ্দা ও রিয়াদ; থাইল্যান্ডের ব্যাংকক; মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর; সিঙ্গাপুর ও চীনের গুয়াংজু প্রভৃতি।
এ ছাড়া দেশের ভেতরে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট, যশোর, সৈয়দপুর, কক্সবাজার, রাজশাহী গন্তব্যে নিয়মিত উড্ডয়ন পরিচালনা করছে ইউএস–বাংলা। বর্তমানে এই সংস্থার বহরে ২৫টি উড়োজাহাজ রয়েছে। তার মধ্যে ৯টি বোয়িং, ৩টি এয়ারবাস, ১০টি এটিআর ও বাকি ৩টি অন্যান্য উড়োজাহাজ। লিজ বা ভাড়াভিত্তিতে এসব উড়োজাহাজ পরিচালিত হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, ইউএস-বাংলা শুধু বহরের আকার বৃদ্ধিই নয়, যাত্রীসেবায়ও বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। নতুন উড়োজাহাজগুলোয় আন্তর্জাতিক মানের কেবিন ইন্টেরিয়র ও প্রিমিয়াম সিট থাকবে। প্রতিটি উড়োজাহাজে থাকবে আধুনিক ওয়্যারলেস ইন-ফ্লাইট এন্টারটেইনমেন্ট সিস্টেম, যার মাধ্যমে যাত্রীরা নিজেদের স্মার্টফোন, ট্যাবলেট বা ল্যাপটপ ব্যবহার করে কোনো তার ছাড়াই দেশি-বিদেশি সিনেমা, নাটক, টিভি অনুষ্ঠান, সংগীতসহ হলিউড-বলিউডের বিভিন্ন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারবেন। প্রতিটি উড়োজাহাজে ইন-ফ্লাইট ওয়াই-ফাই সুবিধাও থাকবে। ফলে যাত্রীরা আকাশে ভ্রমণের সময়ও ইন্টারনেট ব্যবহার, বার্তা আদান-প্রদান এবং ফোন কলে কথা বলতে পারবেন। এ ধরনের প্রযুক্তিগত সুবিধা বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলোতে রয়েছে।
বড় বিনিয়োগ উদ্যোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির এমডি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘বিদেশি বিমান সংস্থাগুলো বাংলাদেশ থেকে সেসব আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে, যেখানে বাংলাদেশি যাত্রী বেশি। এ কারণে দেশীয় বিমান সংস্থা হিসেবে আমরা ওই সব গন্তব্যে বিমান পরিচালনার জন্য দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছি। আমরা চাই, বাংলাদেশি বিমান সংস্থা হিসেবে আমাদেরও বিশ্ব চিনুক। তাই বিশ্বের শীর্ষ বিমান সংস্থাগুলো যে ধরনের সুবিধাসংবলিত উড়োজাহাজ পরিচালনা করে, আমরাও একই ধরনের উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করতে যাচ্ছি।’
একনজরে ইউএসবাংলা এয়ারলাইনস
যাত্রা শুরু ২০১৪ সালের জুলাই, প্রথম গন্তব্য ঢাকা–যশোর।
আন্তর্জাতিক গন্তব্যে যাত্রা শুরু ২০১৮ সাল, প্রথম গন্তব্য কাঠমান্ডু, নেপাল।
বর্তমানে ছয়টি অভ্যন্তরীণ গন্তব্যে নিয়মিত উড্ডয়ন।
আন্তর্জাতিক পথে ১০টি দেশের ১৪টি গন্তব্যে নিয়মিত উড়ছে।
বর্তমান বহরে ২৫টি উড়োজাহাজ—৯টি বোয়িং, ৩টি এয়ারবাস, ১০টি এটিআর ও ৩টি অন্য উড়োজাহাজ।
নতুন আসছে ২১টি বোয়িং উড়োজাহাজ।
চালু হবে নতুন গন্তব্য, বিদ্যমান গন্তব্যেও বাড়বে ফ্লাইট।