যুদ্ধাঞ্চল থেকে এল প্রথম এলপিজি ট্যাংকার
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর পারস্য উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো জাহাজ বাংলাদেশে আসেনি। তেল-গ্যাসবাহী দুটি ট্যাংকার এখনো পারস্য উপসাগরে আটকে রয়েছে। তবে হরমুজের সঙ্গে সংযুক্ত ওমান উপসাগর থেকে এলপিজি নিয়ে একটি ট্যাংকার সীতাকুণ্ডে পৌঁছেছে। শিপিং এজেন্টদের মতে, যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এলাকা থেকে এটাই বাংলাদেশে পৌঁছানো প্রথম এলপিজিবাহী ট্যাংকার।
শিপিং এজেন্টস সূত্রে জানা গেছে, ‘এমটি বিডব্লিউইকে বোর্নহোম’ নামের ট্যাংকারটি ওমান থেকে ৩ হাজার ৮০০ টন তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি নিয়ে এসেছে। আকারে এটি ছোট এলপিজি ট্যাংকার। চালানটির আমদানিকারক স্মার্ট গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিএম এনার্জি (বিডি) লিমিটেড।
স্মার্ট গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক ক্যাপ্টেন মইনুল আহসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এলপিজির বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয়। যুদ্ধ শুরুর পর সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমরা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। আমাদের অব্যাহত অনুরোধে যুদ্ধ এলাকা থেকেই এলপিজি সংগ্রহ করে পাঠিয়েছে একটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান।’
ট্যাংকারটির স্থানীয় প্রতিনিধি সি-সাইড ট্রেডার্সের কর্ণধার হুমায়ুন কবীর বলেন, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে ট্যাংকারটি ওমানের দুকম বন্দর থেকে যাত্রা করে প্রথমে শ্রীলঙ্কায় যায়। সেখানে আংশিক খালাসের পর সীতাকুণ্ডে এসে বাকি এলপিজি খালাস করে। গত শুক্রবার এলপিজি খালাস শেষে ট্যাংকারটি ফিরেও গেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পাল্টা জবাব দেয় ইরান। এতে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করে ইরানি বাহিনী। এই প্রণালির সঙ্গে সংযুক্ত পারস্য উপসাগরেও নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যায়। ৩ মার্চ ওমানের দুকম বন্দরের কাছে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে ড্রোন হামলার ঘটনাও ঘটে।
যুদ্ধ এলাকা হওয়ায় পারস্য উপসাগরের ওমান থেকে জাহাজ চলাচলেও এখন বিমা কোম্পানিগুলো যুদ্ধ প্রিমিয়াম বাড়িয়েছে, তাতে পণ্য পরিবহনে খরচ অনেক বেড়ে গেছে
জানতে চাইলে মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, পারস্য উপসাগর থেকে শুরু করে হরমুজ প্রণালি হয়ে ওমান উপসাগর, বাব আল মান্দে ও লোহিত সাগরকে যুদ্ধ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে আইবিএফ (ইন্টারন্যাশনাল বার্গেনিং ফোরাম)। ইরানের অনুমতি ছাড়া পারস্য উপসাগর থেকে হরমুজ হয়ে কোনো জাহাজ আসার সুযোগ নেই। তবে যুদ্ধ এলাকা হওয়ায় পারস্য উপসাগরের ওমান থেকে জাহাজ চলাচলেও এখন বিমা কোম্পানিগুলো যুদ্ধ প্রিমিয়াম বাড়িয়েছে, তাতে পণ্য পরিবহনে খরচ অনেক বেড়ে গেছে।
আটকে আছে দুটি ট্যাংকার
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে ইরান ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। এ জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চলতি মাসের শুরুতে তেহরানকে অনুরোধ জানানো হয়। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি বহনকারী জাহাজগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করে কূটনৈতিক চিঠি দিতে হবে। এরপর ২৫ মার্চ বাংলাদেশগামী জাহাজগুলোর বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠিও পাঠানো হয়েছে। তবে গতকাল শনিবার পর্যন্ত পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা বাংলাদেশমুখী দুটি জ্বালানিবাহী ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারেনি।
এই দুটি ট্যাংকারের একটি ‘এমটি লিব্রেথা’। কাতারের রাস লাফান বন্দর থেকে ৬২ হাজার টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) নিয়ে জাহাজটি যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই আটকে আছে। অন্যটি ‘এমটি নরডিক পলুকস’, যা সৌদি আরবের রাস তানুরা টার্মিনাল থেকে ১ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে বাংলাদেশে আসার কথা ছিল।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী লিব্রেথা ট্যাংকারটি কাতারের উপকূলের কাছে বহির্নোঙরে অবস্থান করছে। আর এমটি নরডিক পলুকস ট্যাংকারটিও সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থান করছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে অপরিশোধিত তেলের ৮০ শতাংশ, এলএনজির ৬৫ শতাংশ এবং এলপিজির ৫১ শতাংশ এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। আবার পরিশোধিত ডিজেলের বড় অংশ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে এলেও সেসব দেশও মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা কবে কাটবে, তার জন্য এখন অপেক্ষা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশের জাহাজ চলাচলের সুযোগ পেলে পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দেওয়া যাবে। অন্যথায় এসব জাহাজের বাংলাদেশে পৌঁছানো আরও বিলম্বিত হতে পারে। ফলে এলপিজিসহ জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।