নিতাইগঞ্জে জমজমাট ব্যবসা আর নেই

শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে নারায়ণগঞ্জ শহরের নিতাইগঞ্জের খালঘাট। পাশেই দাদার ঘাট, কেরোসিন ঘাট ও বটতলা ঘাট। সকাল থেকে এসব ঘাটে চলছে ওঠা-নামানোর কাজ। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পাইকারদের কেনা আটা, ময়দা, ডাল, লবণসহ নিত্যপণ্যের বস্তা ট্রলারে তুলছেন শ্রমিকেরা। নদীপথে চট্টগ্রাম থেকে আসা জাহাজ থেকে গমসহ বিভিন্ন পণ্য নামানো হচ্ছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে এমন চিত্র দেখা যায় নিতাইগঞ্জে। নিতাইগঞ্জ দেশের আটা, ময়দা, ভোজ্যতেল, লবণ, চিনি ও গোখাদ্যের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসাকেন্দ্র। এখানে একসঙ্গে সব পণ্য পাওয়া যায়।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, একসময় নিতাইগঞ্জ দিনরাত পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের পদচারণে মুখর থাকত। এখন মোকামে আগের মতো পাইকারি ব্যবসায়ীদের ভিড় নেই। কারণ, নিত্যপণ্যের বাজারে এখন করপোরেটদের দাপট। দেশজুড়ে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের যোগাযোগ অনেক সহজ হয়ে গেছে। তাতে নিতাইগঞ্জের ব্যবসায়ীরা পড়েছেন পুঁজির সংকটে। তাই করপোরেটদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না এখানকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি মিলগুলো। এতে আটা, ময়দা, ডাল ও লবণের বেশ কিছু মিল বন্ধ হয়ে গেছে।

নিতাইগঞ্জের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি শংকর সাহার হিসাবে ১০ বছর আগে এই মোকামে প্রতিদিন গড়ে ২০০ কোটি টাকার লেনদেন হতো। এখন তা কমে ৫০ কোটি টাকায় নেমেছে। শুধু লেনদেনের অঙ্ক নয়, কমেছে পাইকারি ব্যবসায়ীদের আনাগোনাও।

নিতাইগঞ্জের ভাই ভাই ট্রেডার্সের ব্যবস্থাপক পরিতোষ সাহা প্রথম আলোকে বলেন, আগে তাঁদের প্রতিষ্ঠানে দিনে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৩০ থেকে ৪০ জন পাইকারি ক্রেতা আসতেন। এখন আসেন ১০ থেকে ১৫ জন।

তবে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যেও নিতাইগঞ্জ এখনো পুরোপুরি গুরুত্ব হারায়নি। দেশের নিত্যপণ্যের বড় একটি অংশের সরবরাহ এই অঞ্চল থেকেই হচ্ছে।

শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে নিতাইগঞ্জের পাইকারি ব্যবসা গড়ে উঠেছিল। নব্বইয়ের দশকে সপ্তাহের সাত দিনই নিতাইগঞ্জের বিভিন্ন ঘাটে কার্গো জাহাজ ও নৌযানের আনাগোনা থাকত। চট্টগ্রাম থেকে আমদানি করা গম, ডাল, লবণসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী জাহাজ ঘাটে ভিড়ত। আবার নিতাইগঞ্জ থেকে আটা, ময়দাসহ বিভিন্ন পণ্য বড় ট্রলারে করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যেত। সড়কপথেও শত শত মালবাহী ট্রাকের সারি থাকত।

করপোরেটদের প্রভাব ও যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হওয়ায় নিতাইগঞ্জ ক্রমেই গুরুত্ব হারিয়েছে। এ অবস্থায় এখানকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের টিকিয়ে রাখতে হলে স্বল্প সুদে ঋণসুবিধা ও সরকারের নীতি সহায়তা লাগবে
শংকর সাহা, সভাপতি, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী মালিক সমিতি, নিতাইগঞ্জ

নিতাইগঞ্জের প্রবীণ ব্যবসায়ীরা জানান, আগে রংপুর, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, ভৈরব, চাঁদপুর ও মুন্সিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ ৪০টি জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা নিতাইগঞ্জ থেকে পণ্য কিনতে আসতেন। রাজধানীর কাপ্তান বাজারসহ দেশের বিভিন্ন বাজারেও নিতাইগঞ্জ থেকে আটা, ময়দা ও অন্যান্য নিত্যপণ্য সরবরাহ করা হতো। এখন সেই বাজার অনেকটাই ছোট হয়ে ১০-১২টি জেলায় নেমে এসেছে।

স্থানীয় জয়কালী ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী কৃষ্ণ সাহা বলেন, আগে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকতে হতো নিতাইগঞ্জে। এখন সেই ব্যবসায় ভাটা পড়েছে। দুপুরের পর নিতাইগঞ্জ ফাঁকা হয়ে যায়।

সরেজমিনে কথা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুরের সলিমগঞ্জ বাজার থেকে পণ্য নিতে আসা ট্রলারের মাঝি মাঈনউদ্দিনের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘পাইকারেরা ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে নিতাইগঞ্জের ব্যবসায়ীদের কাছে টাকা পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমরা আড়ত থেকে মাল নিয়ে পাইকারদের বুঝিয়ে দেব। প্রতি বস্তা মালের জন্য পাব ৩০ টাকা। আগে সপ্তাহে দুবার মালামাল নিতে আসতাম। এখন আসি একবার।’

বন্ধ ১২টি আটার মিল

নিতাইগঞ্জের আটা, ময়দার মিলের ব্যবসার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬০–এর দশকে এই এলাকায় গম থেকে আটা উৎপাদন শুরু হয়। পরে ১৯৬৫ সালের দিকে নতুন প্রযুক্তি যুক্ত হয়। ২০০০ সালের পর শুরু হয় স্বয়ংক্রিয় মেশিনের ব্যবহার। জেলার আটা-ময়দা মিল মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, নিতাইগঞ্জের বি কে রোড ও কাচারি গলির এক কিলোমিটারের মধ্যে আটা, ময়দার ৭২টি মিল রয়েছে। এর মধ্যে ১২টি মিল বর্তমানে বন্ধ। আর যেসব মিল চালু রয়েছে, সেগুলোতে ৫ থেকে ৭ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। যদিও আগে শ্রমিকের সংখ্যা আরও বেশি ছিল।

মিলমালিকেরা জানান, একসময় নিতাইগঞ্জ থেকে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টন আটা-ময়দা দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হতো। এখন তা কমে ১০০ থেকে ১৫০ টনে দাঁড়িয়েছে।

নিতাইগঞ্জের মীম শরৎ গ্রুপের আটটি ফ্লাওয়ার মিল রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক ফিরোজ আলম প্রথম আলোকে বলেন, পাঁচ বছর আগেও নিতাইগঞ্জে ভালো ব্যবসা ছিল। এখন বড় বড় প্রতিষ্ঠান প্যাকেটজাত পণ্য উৎপাদন করে সরাসরি দোকানে পৌঁছে দিচ্ছে। এতে নিতাইগঞ্জের ব্যবসা অনেকাংশে কমে গেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার মিল মালিক সমিতির সভাপতি সোহাগ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে নিতাইগঞ্জের আটা-ময়দার ছোট ও মাঝারি মিলগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। সরকারের সহায়ক নীতি সহায়তা না পেলে আরও মিল বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

লবণের মিল কমে এখন ৭টি

আটা-ময়দার পাশাপাশি নিতাইগঞ্জের লবণ ব্যবসারও বড় পরিবর্তন হয়েছে। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, একসময় নিতাইগঞ্জে লবণের ৪২টি মিল ছিল। সেখানে এখন চালু আছে মাত্র ৭টি। আগে চট্টগ্রাম থেকে ক্রুড লবণ এনে নিতাইগঞ্জের মিলে ক্রাশিং করা হতো। পরে স্বয়ংক্রিয় মেশিনের ব্যবহার শুরু হয়। তবে সময় ও প্রযুক্তির পরিবর্তনে ধীরে ধীরে এই ব্যবসাও কমতে থাকে।

নিতাইগঞ্জের পুরোনো লবণ মিল গরিবে নেওয়াজ। প্রতিষ্ঠানটি একসময় নিয়মিত লবণ উৎপাদন করত। কিন্তু উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এখন তারা নিয়মিত উৎপাদন করছে না। মিলমালিক জামাল উদ্দিন দেওয়ান প্রথম আলোকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের মিলগুলো সরাসরি মাঠ থেকে লবণের কাঁচামাল সংগ্রহ করে; তাই তাদের উৎপাদন খরচ কম পড়ছে। তাই চট্টগ্রামের মিলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছি না। এ কারণে অনেক মিল বন্ধ হয়ে গেছে।’

একই সমস্যার কথা জানান নারায়ণগঞ্জ সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপক শ্যামল সাহা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নিতাইগঞ্জে উৎপাদিত লবণের ৮০ শতাংশই ব্যবহার হয় বিভিন্ন ডায়িং কারখানায়। বাকি ২০ শতাংশ রান্নার কাজে ব্যবহার হয়।

নারায়ণগঞ্জ জেলা লবণ মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাউসার আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, চট্টগ্রামের মিলগুলোর তুলনায় নারায়ণগঞ্জের মিলগুলো প্রক্রিয়াজাতের পর প্রতি মণে ৫ থেকে ১০ কেজি লবণ কম পায়। এ ছাড়া অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠান এই যুক্ত হয়েছে। ফলে প্রতিযোগিতায় কুলিয়ে উঠতে পারছে না নিতাইগঞ্জের মিলগুলো।

ডালের মিল কমে ১২টি

পাইকারি ডাল ব্যবসারও একসময়কার বড় বাজার ছিল নিতাইগঞ্জ। এখানকার উৎপাদিত মসুর, খেসারি, মুগ, মাষকলাই ও ছোলাসহ বিভিন্ন ধরনের ডাল সরবরাহ হতো সারা দেশে। স্থানীয় ডাল ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, নিতাইগঞ্জের বি কে দাস রোডে একসময় ডালের ৩৫টি মিল ছিল। বর্তমানে আছে ১২টি। এর মধ্যে চালু ৬টি, বন্ধ ৬টি।

নিতাইগঞ্জ ডাল মিল মালিক সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি বিকাশ সাহা প্রথম আলোকে বলেন, আগে দেশে ডালের বড় অংশ নিতাইগঞ্জের মিলগুলো থেকে সরবরাহ করা হতো। এখন বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে বাজার চলে যাওয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি মিলগুলো টিকতে পারছে না। এসব ছোট ও মাঝারি মিল রক্ষায় সরকার নীতি সহায়তা দরকার। তা না হলে চালু মিলগুলোও একসময় বন্ধ হয়ে যাবে।

ব্যবসায় বাধা যেখানে

নিতাইগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, বড় করপোরেটরা একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করে উৎপাদনের পর প্যাকেটজাত করে নিজস্ব ব্যবস্থায় সারা দেশে দোকানে দোকানে পৌঁছে দেয়। তার বিপরীতে নিতাইগঞ্জের ক্ষুদ্র ও মাঝারি মিলগুলোর সামর্থ্য সীমিত। ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ, পুঁজির সংকট, শ্রমিক খরচ, প্যাকেজিং ও পরিবহন ব্যয় মিলিয়ে এসব মিলের উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। ফলে একই বাজারে করপোরেটদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে নিতাইগঞ্জের ছোট ও মাঝারি মিলগুলো।

স্থানীয় জয়কালী ভান্ডারের ব্যবস্থাপক কৃষ্ণ সাহা বলেন, আগে দিনরাত পণ্য বিক্রি হতো। পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের আনাগোনা ছিল। এখন দুপুরের পর নিতাইগঞ্জ অনেকটাই ফাঁকা হয়ে যায়। স্থানীয় উৎপাদনের পাশাপাশি বড় বড় কোম্পানির পণ্য বিক্রি করে অনেকে ব্যবসা ধরে রেখেছেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, করপোরেট প্রতিযোগিতার পাশাপাশি অবকাঠামোগত সমস্যা নিতাইগঞ্জের ব্যবসার ক্ষেত্রে বড় বাধা। যানজটের কারণে নিতাইগঞ্জে মালবাহী ট্রাক ঢোকে না। দূরে ট্রাক রেখে সেখান থেকে পণ্য আনা–নেওয়া করতে হয়। এতে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় দুটোই বেশি লাগে। এ কারণে নিতাইগঞ্জের ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা পণ্য ওঠা–নামানোর জন্য আশপাশের একটি নির্ধারিত স্থানে ট্রাকস্ট্যান্ড তৈরির দাবি জানিয়ে আসছেন।

স্বল্প সুদে ঋণ ও নীতি সহায়তা চান ব্যবসায়ীরা

নিতাইগঞ্জের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি শংকর সাহা প্রথম আলোকে বলেন, প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এই পাইকারি মোকামের আগের জৌলুশ নেই। ১০ বছর আগেও যেখানে প্রতিদিন প্রায় ২০০ কোটি টাকার লেনদেন হতো, এখন তা কমে প্রায় ৫০ কোটি টাকায় নেমেছে। করপোরেটদের প্রভাব ও যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হওয়ায় নিতাইগঞ্জ ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে। এ অবস্থায় এখানকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের টিকিয়ে রাখতে হলে স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা ও সরকারের নীতি সহায়তা লাগবে। তাহলেই কেবল নিতাইগঞ্জ তার ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারবে।