গ্যাসের অভাবে শতাধিক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ
গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকটে ভুগছে দেশের গ্যাসনির্ভর ছোট-বড় সব কারখানা। ইতিমধ্যে নিত্যপণ্যসহ ওষুধ, সিরামিক, ইস্পাতসহ গ্যাসনির্ভর প্রায় সব কারখানায় উৎপাদন কমেছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও চট্টগ্রাম এলাকার কারখানাগুলো।
এদিকে ওষুধ, ইস্পাত, হিমাগার খাতের কিছু কারখানা বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালু রেখেছে। এতে তাদের ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।
গতকাল শনিবার নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, হবিগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও খুলনা এলাকায় বিভিন্ন শিল্পকারখানার তথ্য নিয়েছে প্রথম আলো। দেশের বেশির ভাগ উৎপাদনমুখী বড় শিল্পকারখানা এসব এলাকায় অবস্থিত।
শিল্পমালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে প্রায় এক মাস ধরে গ্যাসের বেশি সরবরাহ–সংকট রয়েছে। এর মধ্যে গত সপ্তাহে এই সংকট তীব্র হয়েছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানায় শ্রমিকদের কাজ বন্ধ রেখে বসে থাকতে হচ্ছে।
জানা গেছে, গ্যাস–সংকটের কারণে গত এক সপ্তাহে এসব অঞ্চলে ১০০টির বেশি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ নিত্যপণ্যের কারখানা। বন্ধ হওয়া কারখানার মধ্যে বড় শিল্পগোষ্ঠীর কারখানাই অর্ধশতাধিক। এ ছাড়া বন্ধ না হলেও উল্লেখযোগ্য হারে উৎপাদন কমেছে দেড় শতাধিক কারখানায়।
শিল্পমালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে প্রায় এক মাস ধরে গ্যাসের বেশি সরবরাহ–সংকট রয়েছে। এর মধ্যে গত সপ্তাহে এই সংকট তীব্র হয়েছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানায় শ্রমিকদের কাজ বন্ধ রেখে বসে থাকতে হচ্ছে।
চাপ কিছুটা বাড়লেই আবার উৎপাদন শুরু করছে তারা। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক না হলে উৎপাদন আরও ব্যাহত হতে পারে। যদিও গতকাল গ্যাসের সরবরাহ সামান্য বেড়েছে বলে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে।
একদিকে বিদ্যুতের সমস্যা ভোগাচ্ছে। আবার যেসব কারখানায় জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হতো, গ্যাস না থাকায় এখন সেই জেনারেটরও চালানো সম্ভব হচ্ছে না। আবার গ্যাস না থাকায় বয়লারনির্ভর কারখানায় উৎপাদন একেবারেই কমে গেছে। সব মিলিয়ে আমাদের বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি মুখে পড়তে হচ্ছে।কামরুল হাসান, নির্বাহী পরিচালক, এসিআই লিমিটেড
নিত্যপণ্যের অর্ধশত কারখানা বন্ধ
নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম এলাকায় চিনি, গম, ভোজ্যতেল ও ডালসহ নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতের শতাধিক কারখানা রয়েছে। গ্যাস–সংকটের কারণে এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক কারখানাই সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছে। যেগুলো চালু রয়েছে, তারাও সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম উৎপাদন করতে পারছে।
দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) দুই-তৃতীয়াংশের বেশি কারখানায় উৎপাদন বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গতকাল বিকেল পর্যন্ত মেঘনা গ্রুপের মালিকানাধীন ৫৭টি কারখানার মধ্যে ৪০টির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ ছিল। এর একটি বড় অংশ নিত্যপণ্যের। বাকি যে কারখানাগুলো চালু আছে, সেগুলোতে ছোটখাটো পণ্য বা স্বল্প পরিমাণে উৎপাদন হচ্ছে।
আরেক বড় শিল্পগোষ্ঠী টি কে গ্রুপের ২৮টি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন গ্রুপের পরিচালক মুহাম্মদ মোস্তফা হায়দার। তিনি জানান, ঢাকার আশপাশের গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোর মধ্যে মাত্র একটিতে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালু রয়েছে; বাকিগুলো একেবারে বন্ধ। বন্ধ কারখানাগুলোর বেশির ভাগই নিত্যপণ্যের।
দেশের উত্তরাঞ্চল এবং যশোর ও খুলনা অঞ্চলেও টি কে গ্রুপের বেশ কিছু কারখানা রয়েছে। এগুলো বিদ্যুৎনির্ভর। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে এগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এসব স্থানে দিনে ৮ থেকে ১০ বার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে জানান মোস্তফা হায়দার।
দেশের আরেক শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী এসিআই লিমিটেডের বিভিন্ন কারখানায় সামগ্রিক উৎপাদন কমেছে। ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় তাদের বেশ কয়েকটি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে লবণ কারখানা, বন্দর এলাকায় আটা-ময়দা ও ওষুধ তৈরির কারখানা এবং গাজীপুরের কোনাবাড়ী ও টঙ্গীতে ন্যাপকিন, ডায়াপার, বিভিন্ন কৃষি উপকরণ, মোটরসাইকেল সংযোজন ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম তৈরি করে কোম্পানিটি। সব কারখানাতেই উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক নিচে নেমে গেছে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, তাদের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোথাও ৩০ শতাংশ, কোথাও ৫০ শতাংশ, কোথাও এর চেয়েও বেশি হারে উৎপাদন কমে গেছে। বিশেষ করে লবণ উৎপাদন বেশি ব্যাহত হচ্ছে।
এসিআই লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক কামরুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘একদিকে বিদ্যুতের সমস্যা ভোগাচ্ছে। আবার যেসব কারখানায় জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হতো, গ্যাস না থাকায় এখন সেই জেনারেটরও চালানো সম্ভব হচ্ছে না। আবার গ্যাস না থাকায় বয়লারনির্ভর কারখানায় উৎপাদন একেবারেই কমে গেছে। সব মিলিয়ে আমাদের বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি মুখে পড়তে হচ্ছে।’
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। একটি প্ল্যান্ট বন্ধ রেখে আরেকটি প্ল্যান্ট চালিয়ে কোনোভাবে উৎপাদন চালু রাখা হচ্ছে। বর্তমানে যতটুকু উৎপাদন হচ্ছে, সেটুকুই বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে।সৈয়দ রফিকুর রহমান, টেকনিক্যাল ডিরেক্টর, সিটি গ্রুপ
চিনির ট্রাক ঢোকেনি পাইকারি বাজারে
গ্যাস–সংকটে উৎপাদন বন্ধের প্রভাব পড়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি ব্যবসাকেন্দ্র নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জে। সেখানে গত তিন দিনে কোনো চিনির ট্রাক ঢোকেনি। উৎপাদন ও সরবরাহে ঘাটতির কারণে পাইকারি বাজারে চিনির দাম কেজিতে বেড়েছে ৭ টাকা।
কমেছে ভোজ্যতেল উৎপাদনও। যেমন: নারায়ণগঞ্জে মেঘনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান মেঘনা এডিবল অয়েল রিফাইনারিতে গ্যাসের সংকটে তিন দিন ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কারখানাটিতে দৈনিক ২ হাজার ৫০০ টন ভোজ্যতেল উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এর মধ্যে ৪৬ শতাংশ সয়াবিন ও ৫৪ শতাংশ পাম তেল। অন্যদিকে রূপগঞ্জের রূপসী এলাকায় সিটি গ্রুপের সিটি এডিবল অয়েল লিমিটেডে সয়াবিন ও পাম তেল মিলিয়ে দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ২ হাজার ৫০০ টন। গ্যাস–সংকটে উৎপাদন কমে প্রায় ১ হাজার টনে নেমেছে। একইভাবে আটা, ময়দা ও সুজির দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতাও কমেছে।
সিটি গ্রুপের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর সৈয়দ রফিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় তাঁদের উৎপাদন প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। একটি প্ল্যান্ট বন্ধ রেখে আরেকটি প্ল্যান্ট চালিয়ে কোনোভাবে উৎপাদন চালু রাখা হচ্ছে। বর্তমানে যতটুকু উৎপাদন হচ্ছে, সেটুকুই বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে।
আগে যেখানে কোনো পণ্য দৈনিক ৫০ টন বাজারে সরবরাহ করা হতো, সেখানে এখন ২০ থেকে ২৫ টন করে ছাড়া হচ্ছে, যাতে অন্তত দুই-তিন দিন সরবরাহ ধরে রাখা যায়। বাজার যাতে হঠাৎ খালি না হয়ে যায়, সে জন্যই এই ব্যবস্থা।মোস্তফা কামাল, চেয়ারম্যান, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই)
পরিস্থিতি সামাল দিতে রেশনিং চালু
উৎপাদন অনেকাংশে বন্ধ থাকায় বাজার সরবরাহ ও মজুত পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, বাজারে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তাঁরা এখন গুদামে থাকা মজুত পণ্য ব্যবহার করছেন। সংকট কত দিন চলবে, তা নিশ্চিত না থাকায় পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেকে ‘রেশনিং’ পদ্ধতিতে পণ্য সরবরাহ করছে। তবে সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাজারে পণ্য সরবরাহে ঘাটতি হতে পারে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে যেখানে কোনো পণ্য দৈনিক ৫০ টন বাজারে সরবরাহ করা হতো, সেখানে এখন ২০ থেকে ২৫ টন করে ছাড়া হচ্ছে, যাতে অন্তত দুই-তিন দিন সরবরাহ ধরে রাখা যায়। বাজার যাতে হঠাৎ খালি না হয়ে যায়, সে জন্যই এই ব্যবস্থা।’
টি কে গ্রুপের পরিচালক মুহাম্মদ মোস্তফা হায়দার জানান, ‘আমরা চরম সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আগে থেকে উৎপাদিত পণ্যের যে মজুত ছিল, তা দিয়ে সরবরাহ ধরে রাখছি। এ পরিস্থিতি ৮-১০ দিনের বেশি স্থায়ী হলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ ও দামে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’
ইস্পাত বা রড উৎপাদনকারী দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি বিএসআরএমের কারখানায়ও কয়েক দিন ধরে গ্যাস–সংযোগ বন্ধ রয়েছে।
অন্যান্য খাতের কী অবস্থা
গ্যাস–সংকটে গত বুধবার থেকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে সিরামিক খাতের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি আরএকে সিরামিকসের (বাংলাদেশ) উৎপাদন। কোম্পানিটির চারটি ইউনিটে সিরামিক পণ্য উৎপাদিত হতো। কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ খোরশেদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্যাস ছাড়া আমাদের কারখানায় উৎপাদন সচল রাখা সম্ভব নয়। বুধবার থেকে গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কারখানার উৎপাদনও বন্ধ হয়ে গেছে।’
ইস্পাত বা রড উৎপাদনকারী দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি বিএসআরএমের কারখানায়ও কয়েক দিন ধরে গ্যাস–সংযোগ বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে আমরা ডিজেল ব্যবহার করে বিকল্প উপায়ে কোনোরকমে উৎপাদন সচল রেখেছি। তা–ও উৎপাদন হচ্ছে সক্ষমতার অর্ধেকের কম। ডিজেল ব্যবহারের কারণে উৎপাদন খরচ বেশি পড়ছে। তারপরও পরিবেশকদের চাহিদার কারণে কারখানা সচল রাখা হয়েছে।’
একই অবস্থা জরুরি শিল্প খাত ওষুধেরও। দেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কোম্পানি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের পাবনা ও গাজীপুরের কালিয়াকৈরের গ্যাসনির্ভর দুটি কারখানা এখন চলছে বিকল্প জ্বালানি ডিজেল দিয়ে। ওষুধের কারখানা একবার বন্ধ করলে আবার সেটি চালুর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ১০-১৫ দিন লেগে যায়। এ কারণে গ্যাস না থাকার পরও ডিজেল ব্যবহার করে কারখানার উৎপাদন সচল রেখেছে কোম্পানিটি।
এ বিষয়ে স্কয়ার ফার্মার নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘কারখানা সচল রাখতে প্রয়োজনীয় ডিজেল সংগ্রহ করতে গিয়েও বেগ পেতে হচ্ছে। নানাভাবে এই ডিজেল সংগ্রহ করা হচ্ছে। বর্তমানে আমাদের হাতে যে পরিমাণ ডিজেল রয়েছে, তা দিয়ে দুই কারখানায় এক দিন উৎপাদন চালানো যাবে। যদি সময়মতো প্রয়োজনীয় ডিজেল পাওয়া না যায়, তাহলে কী হবে, এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছি।’
চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় (ইপিজেড) অবস্থিত কারখানাগুলোর জন্য ৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১৫ থেকে ১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে এর অর্ধেক।
চট্টগ্রাম ইপিজেডে চাহিদার অর্ধেক গ্যাস
চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় গ্যাসের সংকট এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যার কারণে অন্তত ৩৫টি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর মধ্যে চারটি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ এবং ১০ থেকে ১২টি কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে বলে চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় (ইপিজেড) অবস্থিত কারখানাগুলোর জন্য ৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১৫ থেকে ১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে এর অর্ধেক। এ নিয়ে চট্টগ্রাম ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ২০ থেকে ২৫টি টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানায় গ্যাসের সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তবে কোনো কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রামের ছোট কারখানাগুলোর মধ্যে বেকারি ও নিত্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো গ্যাসের বিকল্প ব্যবস্থা না পেলে উৎপাদন চালাতে পারছে না। অন্যদিকে টেক্সটাইল কারখানাগুলোর কেউ কেউ গ্যাসের পরিবর্তে ডিজেল ব্যবহার করছেন। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন কারখানা থেকে উৎপাদন ব্যাহত ও কারখানা বন্ধ থাকার তথ্য তাঁদের জানানো হচ্ছে। তবে অনেক ব্যবসায়ী সরাসরি বিষয়টি বলতে চাইছেন না। তাঁরা আশঙ্কা করছেন, এ নিয়ে পরে কোনো ধরনের সমস্যায় পড়তে পারেন।
সারা দেশে স্থানীয় কাপড়ের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ জোগান আসে নরসিংদী জেলা থেকে। জেলায় টেক্সটাইল, ডাইং ও স্পিনিং মিলের সংখ্যা সব মিলিয়ে তিন হাজারের বেশি। তীব্র গ্যাস–সংকটে নরসিংদীর শিল্পকারখানাগুলো এখন স্থবির। গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ৯০ শতাংশ কারখানা এখন পুরোপুরি বন্ধ। কারখানাগুলোর গড় উৎপাদন ১০ শতাংশে নেমেছে।
অন্যান্য জেলার চিত্র কী
দেশে চলমান গ্যাস–সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পরেছে সাভারের বিভিন্ন শিল্পকারখানায়। সাভার উপজেলা ও পার্শ্ববর্তী ধামরাই উপজেলা আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ ১–এর এর আওতাধীন। এ দুটি উপজেলায় ১ হাজার ৭০৫টি শিল্পকারখানা রয়েছে। আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ ১-এর পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, গ্যাস–সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তবে কোনো কারখানা বন্ধ হয়নি। ৪-৫টি কারখানায় উৎপাদন বেশি ব্যাহত হওয়ার মাঝেমধ্যে তাঁরা ছুটি ঘোষণা করলেও পরে আবার চালু করছেন।
এদিকে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, উৎপাদন ব্যাহতের কারণ দেখিয়ে ইতিমধ্যে নোটিশ দিয়ে অনেক কারখানায় কয়েক শ শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। এতে শ্রমিকদের মধ্যে চাকরি হারানোর আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় ময়মনসিংহের ভালুকায় গ্যাসনির্ভর পোশাক কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন লাইন কমিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। এতে ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। তবে গ্যাস–সংকটের কারণে এখন পর্যন্ত কোনো কারখানা বন্ধ হয়নি।
যেমন: ভালুকার গ্লোরি টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলসের ইউটিলিটি বিভাগের ব্যবস্থাপক সোহেল আহাম্মেদ বলেন, দেড় থেকে দুই মাস ধরে গ্যাসের চাপ কিছুটা কম। কারখানায় গ্যাসের ১৫ পিএসআই চাপ প্রয়োজন হলেও পাওয়া যাচ্ছে ১১ থেকে ১২ পিএসআই। এতে উৎপাদন ৩ থেকে ৪ শতাংশ কমেছে।
সারা দেশে স্থানীয় কাপড়ের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ জোগান আসে নরসিংদী জেলা থেকে। জেলায় টেক্সটাইল, ডাইং ও স্পিনিং মিলের সংখ্যা সব মিলিয়ে তিন হাজারের বেশি। তীব্র গ্যাস–সংকটে নরসিংদীর শিল্পকারখানাগুলো এখন স্থবির। গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ৯০ শতাংশ কারখানা এখন পুরোপুরি বন্ধ। কারখানাগুলোর গড় উৎপাদন ১০ শতাংশে নেমেছে।
দেশের হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ খুলনা অঞ্চলের কারখানাগুলো থেকে হয়ে থাকে। বর্তমানে চিংড়ির ভরা মৌসুম চলছে। লোডশেডিংয়ে বিপাকে পড়েছে খুলনা অঞ্চলের মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলো। বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটর চালিয়ে হিমাগারে চিংড়ি সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। এতে কারখানাগুলোর উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
চাপে রপ্তানিমুখী শিল্প
তিন সপ্তাহ ধরে চাহিদার তুলনায় গ্যাস কম পাচ্ছে হবিগঞ্জের শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান শতভাগ রপ্তানিমুখী। গত এক সপ্তাহ গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় অনেক কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ছয়টি কারখানা গত সপ্তাহে পুরোপুরি বন্ধ ছিল। তবে গতকাল থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলার কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।
গাজীপুরের ব্যবসায়ীরা জানান, গ্যাসের চাপের এমন ওঠানামায় একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টারও সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানায় শ্রমিকদের কাজ বন্ধ রেখে বসে থাকতে হচ্ছে। চাপ কিছুটা বাড়লেই আবার উৎপাদন শুরু করা হয়।
দেশের হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ খুলনা অঞ্চলের কারখানাগুলো থেকে হয়ে থাকে। বর্তমানে চিংড়ির ভরা মৌসুম চলছে। লোডশেডিংয়ে বিপাকে পড়েছে খুলনা অঞ্চলের মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলো। বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটর চালিয়ে হিমাগারে চিংড়ি সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। এতে কারখানাগুলোর উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি শেখ কামরুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘হিমাগারগুলো সব সময় চালু রাখতে হয়। সেখানে কোটি কোটি টাকার মাছ থাকে। বাধ্য হয়ে উচ্চ দামে ডিজেল কিনে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। তাতে খরচ ব্যাপক বেড়ে যাচ্ছে।’
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, দেশে দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। ৩০০ কোটি ঘনফুট হলেও মোটামুটি সব খাতে সরবরাহ ধরে রাখা যায়।
গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে
এদিকে টানা ২৫ দিন তীব্র সংকটের পর গতকাল কিছুটা স্বস্তি এসেছে গ্যাস সরবরাহে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের টার্মিনাল সামিট পুরোদমে ও এক্সিলারেট এনার্জি আংশিক চালু হয়েছে। এতে ভোর ৪টা থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়তে শুরু করে। যদিও গ্যাসের সংকট পুরোপুরি কাটতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, দেশে দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। ৩০০ কোটি ঘনফুট হলেও মোটামুটি সব খাতে সরবরাহ ধরে রাখা যায়। যদিও স্বাভাবিক সময়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত সরবরাহ করে রেশনিংয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। গত শুক্রবার বিকেলে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ ১৭৩ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছিল। গতকাল সন্ধ্যায় এটি ২৪৪ কোটি ঘনফুটে পৌঁছায়। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে এখনো দিনে ২৬ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি রয়েছে। এক্সিলারেট টার্মিনাল থেকে পুরোদমে গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে সেই ঘাটতি পূরণ হতে পারে।
পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে, গতকাল সন্ধ্যা ছয়টায় দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন হয়েছে ১৬১ কোটি ঘনফুট গ্যাস। আর আমদানি করা এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হয়েছে ৮৩ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে সামিটের টার্মিনাল থেকে ৫৩ কোটি ঘনফুট ও এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে ৩০ কোটি ঘনফুট করে সরবরাহ করা হচ্ছে। গতকাল বিদ্যুৎ খাতে ৯৩ কোটি ঘনফুট, সার কারখানায় ১৫ কোটি ঘনফুট এবং শিল্প, আবাসিকসহ অন্যান্য খাতে ১৩৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে।
চলমান এই সংকট নিরসনে ভোলা থেকে সিএনজি বা বিশেষ বাহনে করে শিল্পকারখানায় গ্যাস আনার পরামর্শ দিয়েছেন এসিআই লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক কামরুল হাসান।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকট নিয়ে ইতিমধ্যে ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে তাঁদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। এমজিআইয়ের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি বাণিজ্যমন্ত্রী এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছি। তাঁরা চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন।’
চলমান এই সংকট নিরসনে ভোলা থেকে সিএনজি বা বিশেষ বাহনে করে শিল্পকারখানায় গ্যাস আনার পরামর্শ দিয়েছেন এসিআই লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক কামরুল হাসান। তিনি বলেন, বছর দুই আগেও ভোলা থেকে সিএনজি গ্যাস আনার একটি ব্যবস্থা চালু ছিল। কিন্তু প্রায় এক বছর ধরে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সেই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এই সংকটে সেটি চালু করা গেলেও কিছুটা সাময়িক সমাধান হতো।
[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম, খুলনা, ময়মনসিংহ, হবিগঞ্জ ও সাভার এবং প্রতিনিধি, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদী]