নুডলসের চার হাজার বছরের বিশ্বভ্রমণ, চীনের রাজপ্রাসাদ থেকে বাঙালির রান্নাঘর
স্কুলফেরত শিশুর মুখে হাসি ফোটানো কিংবা ব্যাচেলর–জীবনের রাত জাগা প্রজেক্টের সঙ্গী—সবখানেই নুডুলসের বিকল্প মেলা ভার। বৃষ্টিমুখর বিকেলে ধোঁয়া ওঠা এক বাটি গরম নুডলস যেন পরম তৃপ্তির নাম। একসময় যা ছিল নিছকই এক ভিনদেশি শৌখিন খাবার, তা বেশ কিছুদিন ধরে বাঙালির প্রাত্যহিক খাদ্যতালিকার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। কিন্তু কীভাবে এই লম্বাটে ও প্যাঁচানো খাবারটি বিশ্বজয়ের সীমানা পেরিয়ে আমাদের রান্নাঘরে স্থান করে নিল? কেমন ছিল এর বৈশ্বিক ইতিহাস; আর কীভাবেই–বা বাংলাদেশে গড়ে উঠল হাজার কোটির বাজার?
নুডলসের জন্মস্থান নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানা বিতর্ক থাকলেও বর্তমানে তাঁরা প্রায় একমত যে এর আসল উৎপত্তিস্থল চীন। ২০০৫ সালে উত্তর-পশ্চিম চীনের লাজিয়া এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননে উদ্ধার করা হয় প্রায় চার হাজার বছরের পুরোনো এক বাটি নুডলসের জীবাশ্ম। প্রাচীন হান রাজবংশের আমলে এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। পরবর্তী সময়ে বিখ্যাত সিল্ক রোড ধরে এই খাবার ছড়িয়ে পড়ে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপজুড়ে। বলা হয়ে থাকে, বিখ্যাত পর্যটক মার্কো পোলো চীন থেকে ইতালিতে নুডলস নিয়ে গিয়েছিলেন, যা থেকে জন্ম নেয় বিখ্যাত ‘পাস্তা’। তবে বিশ্বজুড়ে নুডলসের আধুনিক রূপ বা ‘ইনস্ট্যান্ট নুডলস’-এর বিপ্লব ঘটে জাপানে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–উত্তর জাপানে দেখা দিয়েছিল তীব্র খাদ্যসংকট। সেই পরিস্থিতি মেটাতে ১৯৫৮ সালে মোমোফুকু আন্ডো নামের এক জাপানি আবিষ্কার করেন ‘চিকেন রামেন’। ফুটন্ত গরম পানিতে মাত্র কয়েক মিনিটে তৈরি হয়ে যাওয়া এই উদ্ভাবন পুরো বিশ্বের খাদ্যাভ্যাসে এনে দেয় এক নীরব পরিবর্তন।
রেস্তোরাঁর আভিজাত্য থেকে গ্রামের মুদিদোকান
বাংলাদেশে নুডলস ঠিক কবে প্রথম আসে, তার সুনির্দিষ্ট তারিখ বলা কঠিন। তবে স্বাধীনতার পর সত্তর ও আশির দশকে শহরাঞ্চলের চায়নিজ রেস্তোরাঁগুলোর হাত ধরে মূলত সাধারণ মানুষের কাছে এর পরিচয় ঘটে। তখন রেস্তোরাঁর ‘চাউমিন’ ছিল একধরনের আভিজাত্য ও শৌখিনতার প্রতীক; সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে তার পৌঁছানো ছিল কল্পনাতীত। আশির দশকের শেষ ভাগে কোকোলা ফুড প্রোডাক্টস কাঠি বা স্টিক নুডলস বাজারে এনে প্রথম সাধারণ মানুষের কাছে নুডলস সহজলভ্য করে। তবে এ দেশের বাজার সত্যিকারের গতি পায় নব্বইয়ের দশকে বহুজাতিক কোম্পানি নেস্লের ‘ম্যাগি’ নুডলসের আগমনের পর। ‘মাত্র দুই মিনিটে তৈরি’—এই আকর্ষণীয় স্লোগান ও লোভনীয় মাসালা স্বাদের জোরে নুডলস দ্রুতই শহুরের ঘর ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত গ্রামের মুদিদোকানেও জায়গা করে নেয়।
সময়ের পরিক্রমায় নুডলস এখন আর কেবল বিকেলের নাশতা বা শিশুদের টিফিনে সীমাবদ্ধ নেই। কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি ও ব্যস্ত জীবনের কারণে তা এখন প্রতিদিনের দ্রুততম প্রধান খাবারের বিকল্প। এই চাহিদা ধরে বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে বিশাল নুডলসশিল্প। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে দেশে নুডলসের বাজার দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকার, যা প্রতিবছর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। কারখানায় উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান এখন জড়িয়ে রয়েছে এই খাতের সঙ্গে। একসময়ের একচেটিয়া বাজার এখন অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ। বহুজাতিক ব্র্যান্ডের পাশাপাশি প্রাণের ‘মি. নুডলস’, নিউজিল্যান্ড ডেইরির ‘ডুডলস’, স্কয়ারের ‘চপস্টিক’, মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ ও ইফাদ এগির মতো দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো এখন বেশ ভালো অবস্থান তৈরি করেছে। এমনকি দেশের বাজার ছাড়িয়ে বাংলাদেশি নুডলস এখন রপ্তানি হচ্ছে বিদেশেও। দেশীয় রুচি ও ঝালের আকর্ষণের কথা ভেবে ব্র্যান্ডগুলো বাজারে এনেছে ‘নাগা ফ্লেভার’ ও ‘ম্যাজিক মাসালা’।
রামেন এখন বাঙালির পছন্দ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কে-ড্রামা ও কে-পপের প্রভাবে তরুণদের মধ্যে কোরিয়ান ‘স্পাইসি রামেন’-এর জোয়ার এসেছে। সামিয়াং ও নংশিমের মতো চড়া দামের কোরিয়ান রামেন এখন সুপারশপ থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার দোকানেও বিক্রি হচ্ছে। এর আগে থেকেই জনপ্রিয় ছিল থাইল্যান্ডের ‘মামা’ নুডলস। চীন থেকে শুরু হওয়া যাত্রাপথ ঘুরে নুডলস আজ বাঙালির একান্ত নিজস্ব খাবার। পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, ডিম আর ধনেপাতাকুচি দিয়ে ভাজা এক বাটি নুডলস এখন আর ভিনদেশি নয়, এটি আমাদেরই আপন স্বাদ। আড্ডায়, অবসরে কিংবা ঝটপট ক্ষুধা নিবারণে নুডলসের এই রাজত্ব বজায় থাকবে আরও বহুকাল।