হাজার বছরের ঐতিহ্য

রাজশাহী তথা বরেন্দ্র অঞ্চলে হাজার বছর ধরেই রেশম চাষ হচ্ছে। এই ঐতিহ্যের জন্য রাজশাহী সিল্ক জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। আর রাজশাহী জেলাকেও ‘সিল্ক হেভেন’ বা ‘সিল্কের স্বর্গ’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে। রেশমের জন্য তুঁতপাতার চাষ করতে হয়। কারণ, এই পাতা রেশমকীটকে (পলু পোকা) খাওয়াতে হয়। পরে সেগুলোর মুখ থেকে নিঃসৃত লালাই রেশম সুতায় পরিণত হয়।

গবেষণা যা বলছে

রেশম চাষের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে কাজ করেছে বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইনডিজেনাস নলেজ (বারসিক) নামের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও)। ‘রেশম পলু পোকা পালন ও আবহাওয়া পরিবর্তনবিষয়ক অনুসন্ধান’ শীর্ষক এই গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রেশমচাষিরা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন, তা উঠে এসেছে। বারসিকের গবেষণার সময়ে বরেন্দ্র অঞ্চলের চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলার রেশমচাষিদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট প্রশ্নমালার ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত এই গবেষণা করা হয়।

তাপমাত্রার তারতম্যের প্রভাব

গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য বলছে, তাপমাত্রার তারতম্যের কারণেই রেশমকীট বা পলু পোকার চাষ ও সুতা উৎপাদন কমবেশি হয়। বৈশ্বিক বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাবে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চল হিসেবে বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলেও তাপমাত্রা অত্যধিক হারে বাড়ছে। গত ১০০ বছরে এই অঞ্চলের সামগ্রিক গড় তাপমাত্রা পরিবর্তনের হার ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বেশি। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে রাজশাহীতে ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। একই সঙ্গে শীতকালে রাজশাহীর তাপমাত্রা মারাত্মকভাবে নিচে নেমে আসে।

সাধারণত ২১ থেকে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং ৯০ শতাংশ বায়ুর আর্দ্রতা পলু পোকা পালনের জন্য উপযোগী। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা এর চেয়ে কমবেশি হলেই তা সেগুলোর আচরণ, বিকাশ, বেঁচে থাকা, বৃদ্ধি ও প্রজননকে প্রভাবিত করে। এককথায়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পলু পোকা স্বাভাবিকভাবে বাড়ে না, বরং অনেক সময় মরে যায়। ফলে গুটিতে সুতা কম হয়।

রেশম সুতা উৎপাদনের চার ‘বন্দ’

রেশমচাষি মেহেরুন্নেসা জানান, তাঁরা দাদার আমল থেকেই বংশপরম্পরায় রেশম গুটি উৎপাদন করছেন। আগে তাঁদের গ্রামে সব মানুষ রেশম চাষ করলেও এখন মাত্র দু–একটি পরিবার এই কাজ করে। তিনি বললেন, বেশি আর্দ্রতার কারণে ‘জ্যৈষ্ঠা বন্দে’ রেশম উৎপাদন ভালো হয়নি। পোকা নষ্ট হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আফতাব উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, জ্যৈষ্ঠা, ভাদুরী, অগ্রহায়ণী ও চৈতা—এই চার বন্দে রাজশাহীতে রেশম সুতা উৎপাদিত হয়। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ার কারণে চাষি পর্যায়ে জ্যৈষ্ঠা ও ভাদুরী বন্দে উৎপাদন ভালো হয় না। তাপমাত্রা খুব বেশি হলে চাষিরা ঘরের জানালায় ভেজা কাপড় টাঙিয়ে এবং আর্দ্রতা কমানোর জন্য ঘরের ভেতরে চুন রেখে দেন। দেশীয় এই পদ্ধতিতে কিছুটা কাজ হয়।

সমস্যা ও ‘নিস্তারী’ পোকায় ভরসা

বারসিকের পরিচালক ও ‘রেশম পলু পোকা পালন ও আবহাওয়া পরিবর্তনবিষয়ক অনুসন্ধান’ শীর্ষক গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক পাভেল পার্থ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এক গবেষণায় আমরা দেখেছি, বরেন্দ্র অঞ্চলে রেশমশিল্পেও জলবায়ুজনিত পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এতে রেশম পোকার জীবনচক্রে সমস্যা হয়।’

পাভেল পার্থ আরও বলেন, ‘নিস্তারী’ নামে একটি দেশীয় রেশম পোকার জাত আছে। এটি অন্য জাতের পোকার তুলনায় বেশি সহনশীল। তাই আবহাওয়া পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনা করে দেশি জাতের রেশম পোকা চাষে জোর দিয়ে এগোনো দরকার, যাতে রাজশাহীর রেশমশিল্পের উন্নয়ন ঘটে।

শিল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন