পোশাকশিল্পে শ্রমিকের ৯% বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধি, কেউ পাচ্ছেন, কেউ পাচ্ছেন না
গণ-অভ্যুত্থানের পর শ্রম আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের নিয়মিত ৫ শতাংশের সঙ্গে অতিরিক্ত ৪ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট বা বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সেই অনুযায়ী, গত বছর বড় তৈরি পোশাক কারখানাগুলো শ্রমিকদের ৯ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি করে। তবে ছোট-মাঝারি ও ঠিকায় কাজ করা (সাবকন্ট্রাকটিং) কারখানাগুলো এই মজুরি বৃদ্ধি করেনি। এবারও সেই পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, ফলে সব কারখানার শ্রমিকেরা বাড়তি ইনক্রিমেন্ট পাচ্ছেন না।
শ্রমিকনেতারা বলছেন, উন্নত কর্মপরিবেশ বা কমপ্লায়েন্ট কারখানাগুলো শ্রমিকদের ৯ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দিচ্ছে। ছোট-মাঝারি ও ঠিকায় কাজ করা কারখানাগুলো নানা অজুহাতে তা দিচ্ছে না। মূলত তদারকি না থাকার কারণেই এমনটি হচ্ছে। অন্যদিকে মালিকেরা বলছেন, চলতি বছর বাড়তি ইনক্রিমেন্ট দিতে হবে কি না, সেটি নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। সরকার থেকেও কোনো ব্যাখ্যা নেই। সে জন্য যারা পারছে, তারা দিচ্ছে; যারা পারছে না, তারা দিচ্ছে না।
জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কিছুদিন পর গাজীপুর ও সাভারের আশুলিয়ায় তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকেরা বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনে নামেন। সেই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৮টি বিষয়ে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিক ও শ্রমিকনেতারা সমঝোতায় পৌঁছান।
সমঝোতা অনুযায়ী, ন্যূনতম মজুরি পুনর্মূল্যায়ন ও বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে সক্ষমতা ও করণীয় নির্ধারণে একটি কমিটি গঠন করে শ্রম মন্ত্রণালয়। ওই কমিটি পাঁচ দফা বৈঠক করে শ্রমিকদের জন্য বিদ্যমান ৫ শতাংশের অতিরিক্ত ৪ শতাংশ বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের সিদ্ধান্ত নেয়। এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, মজুরি পুনর্মূল্যায়ন না হওয়া পর্যন্ত বাড়তি এই ইনক্রিমেন্ট বলবৎ থাকবে।
শ্রম আইন সংশোধন করে গত মাসে অধ্যাদেশ জারি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সংশোধনী অনুযায়ী, পাঁচ বছরের পরিবর্তে এখন থেকে তিন বছর পরপর মজুরি পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য নতুন মজুরিকাঠামো কার্যকর হয়। তাতে ন্যূনতম মজুরি দাঁড়ায় ১২ হাজার ৫০০ টাকা। সেই হিসেবে চলতি বছরের প্রথমার্ধেই তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের কথা। আইন অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরে নতুন মজুরিকাঠামো কার্যকর করতে হবে।
শ্রমিকনেতারা বলছেন, বিদ্যমান ৫ শতাংশের অতিরিক্ত ৪ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট হলে সাধারণ শ্রমিকদের মূল মজুরি ও বাড়িভাড়া একটু বেশি হারে বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে ওভারটাইমের মজুরি, উৎসব ভাতা ও মাতৃত্বকালীন সুবিধাও কিছুটা বাড়ে।
চলতি বছর বিদ্যমান ৫ শতাংশের অতিরিক্ত ৪ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দিতে হবে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। সরকার থেকে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। এ-সংক্রান্ত কোনো বৈঠক হয়নি।ফজলে শামীম এহসান, নির্বাহী সভাপতি, বিকেএমইএ
জানতে চাইলে শ্রমিকনেতা বাবুল আখতার প্রথম আলোকে বলেন, ‘তৈরি পোশাক খাতের বড় কারখানাগুলো গতবার অতিরিক্ত ৪ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দিয়েছিল। তারা এবারও দিচ্ছে, তবে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো দিচ্ছে না। এটি আইনের লঙ্ঘন। যেসব কারখানামালিক শ্রমিকদের ৯ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দিচ্ছেন না, তাঁদের বিরুদ্ধে অতিসত্বর আইনি ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আমরা অনুরোধ করছি।’
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্রের (সিইডি) ম্যাপড ইন বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩ হাজার ৩২০টি রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে কতটি কারখানা বাড়তি ইনক্রিমেন্ট দিয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যান কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই), বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএর কাছে নেই।
শিল্প পুলিশ জানিয়েছে, গত বছর আশুলিয়া, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, খুলনা, কুমিল্লা ও সিলেটের ২ হাজার ৯৩২টি তৈরি পোশাক কারখানার মধ্যে ৭৩ শতাংশ ৯ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দিয়েছে। বাড়তি ইনক্রিমেন্ট দেয়নি ৭৮৪ কারখানা। আশুলিয়ার ৭১৭ কারখানার মধ্যে ৯১ শতাংশ, গাজীপুরের ১ হাজার ১২৭ কারখানার মধ্যে ৬১ শতাংশ, চট্টগ্রামের ৫৭০ কারখানার মধ্যে ৫৪ শতাংশ, নারায়ণগঞ্জের ৪২৪ কারখানার শতভাগই বাড়তি ইনক্রিমেন্ট দেয়। যদিও চলতি বছরের পরিস্থিতি কেমন জানা যায়নি।
তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ব্যবসায় এখন কঠিন সময় যাচ্ছে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট প্রকট। চট্টগ্রাম বন্দরের খরচও বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের ৯ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দেওয়া কারখানাগুলোর নিজস্ব সক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে। অনেক মাঝারি কারখানার মালিক আমাদের জানিয়েছেন, তাঁরা এই ইনক্রিমেন্ট দিতে পারছেন না। যাঁরা পারছেন, তাঁরা দিচ্ছেন। আমরা কোনো চাপ দিচ্ছি না।’
চলতি সপ্তাহ গেলে বোঝা যাবে, কত কারখানা বাড়তি ইনক্রিমেন্ট দিল। নতুন মজুরিকাঠামো না হওয়া পর্যন্ত প্রতিবছর ৯ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দিতে হবে। এ নিয়ে ভুল-বোঝাবুঝির সুযোগ নেই।সালাউদ্দিন স্বপন, সাবেক মহাসচিব, আইবিসি
পোশাকশিল্পের একাধিক উদ্যোক্তা জানান, যেসব বড় পোশাক কারখানা ইউরোপ ও আমেরিকার বিখ্যাত ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক উৎপাদন করে, তারা ইতিমধ্যে শ্রমিকদের ৯ শতাংশ ইনক্রিমেন্টসহ মজুরি পরিশোধ করে দিয়েছে। অন্যথায় তারা বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর চাপে পড়বে। আবার কিছু মাঝারি পোশাক কারখানা ৯ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট ধরে হিসাব-নিকাশ করলেও এখনো দেয়নি। চাপ এলে দেবে, এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে কারখানাগুলো। অবশ্য বিষয়টি নিয়ে সরকারের কোনো সংস্থা কিংবা বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো কিছু বলা হয়নি।
জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান প্রথম আলোকে বলেন, চলতি বছর বিদ্যমান ৫ শতাংশের অতিরিক্ত ৪ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দিতে হবে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। সরকার থেকে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। এ-সংক্রান্ত কোনো বৈঠকও হয়নি, তবে মালিকদের মধ্যে যাঁদের সামর্থ্য আছে, তাঁরা দিচ্ছেন। বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর কঠোর নিরীক্ষা কার্যক্রমের কারণে প্রায় ৭০ শতাংশ কমপ্লায়েন্ট কারখানা এই বাড়তি ইনক্রিমেন্ট দিয়েছে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের (আইবিসি) সাবেক মহাসচিব সালাউদ্দিন স্বপন বলেন, ছোট-মাঝারি কারখানাগুলো এখনো বেতন দেয়নি। চলতি সপ্তাহ গেলে বোঝা যাবে, কত কারখানা বাড়তি ইনক্রিমেন্ট দিল। নতুন মজুরিকাঠামো না হওয়া পর্যন্ত প্রতিবছর ৯ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দিতে হবে। চলতি বছরের শেষে নতুন মজুরিকাঠামো চূড়ান্ত হলে হয়তো সামনের বছর অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট না-ও থাকতে পারে। বিষয়টি নিয়ে ভুল-বোঝাবুঝির সুযোগ নেই।