প্রচণ্ড গরমে স্বস্তির খোঁজে ফ্যান
প্রচণ্ড তাপপ্রবাহে জনজীবন যখন ওষ্ঠাগত, তখন একটু বাতাসের খোঁজে সাধারণ মানুষের প্রথম ভরসা হয়ে দাঁড়ায় বৈদ্যুতিক পাখা বা ফ্যান। একসময় বিদেশি ব্র্যান্ডের ওপর নির্ভরশীলতা থাকলেও বর্তমানে বাংলাদেশের ফ্যানের বাজার এখন পুরোপুরি দেশি উদ্যোক্তাদের দখলে। প্রযুক্তির ছোঁয়া আর নান্দনিক নকশায় ঘরের শোভা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ–সাশ্রয়ী স্মার্ট ফ্যান এখন ক্রেতাদের পছন্দের শীর্ষে। তবে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা আর কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিতে এবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ফ্যানের বাজারও।
চাহিদা ও বাজারের হালচাল
বর্তমানে বাংলাদেশে সিলিং ফ্যানের বার্ষিক চাহিদা ৫০ থেকে ৬০ লাখ। দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৮০–৯০ শতাংশই এখন মেটাচ্ছে দেশীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। ফ্যানের গড় মূল্য আড়াই হাজার টাকা ধরলে শুধু সিলিং ফ্যানের বাজারই বর্তমানে ১ হাজার ২৫০ কোটি থেকে দেড় হাজার কোটি টাকার। তবে টেবিল ফ্যান, স্ট্যান্ড ফ্যান, এগজোস্ট ফ্যানসহ সামগ্রিক বাজার প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে মোট বাজারের প্রায় ৭৫ শতাংশ হিস্যা রয়েছে যমুনা ইলেকট্রনিকস, আরএফএল গ্রুপের (ভিশন ও ক্লিক), বিআরবি, ওয়ালটন, কনকা, সুপারস্টার, এমইপি ও এনার্জিপ্যাকের মতো বড় কোম্পানিগুলোর হাতে।
ইলেকট্রোমার্ট লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল আফসার প্রথম আলোকে বলেন, দেশের ফ্যানের চাহিদা বৃদ্ধিতে বাজার যেমন বাড়ছে, তেমনি স্মার্ট প্রযুক্তির আধুনিক নকশার প্রতি ক্রেতাদের ঝোঁক আছে। দেশের বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কনকা ব্র্যান্ডের ১২ থেকে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ফ্যানের বাজার বৃদ্ধির পেছনে প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রেখেছে। সাধারণ ফ্যানে ৯০ থেকে ১০০ ওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার হলেও স্মার্ট প্রযুক্তির ফ্যানে ৬০ থেকে ৭০ ওয়াট লাগছে। নতুন বিএলডিসি প্রযুক্তিতে ফ্যান তৈরির কাজ চলছে। মাত্র ৩০ ওয়াট বিদ্যুতে চলা এই ফ্যান আগামী বছরে বাজারে ছাড়া হবে।
দাম বাড়ার নেপথ্যে কাঁচামাল ও ডলার
এ বছর বাজারে প্রতিটি ফ্যানের দাম গত বছরের তুলনায় ৪০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আগে প্রতিবছর গ্রীষ্মের শুরুতে ফ্যানের দাম সাধারণত ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বাড়ত, কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, কোম্পানি পর্যায়ে দাম ২০০ টাকার মতো বাড়লেও খুচরা পর্যায়ে তা ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত ঠেকেছে। এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ হিসেবে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা জানান—
ফ্যানে ব্যবহৃত কেবল বা তারের দাম বেড়েছে ২৫ শতাংশ।
মোটরের মূল উপাদান তামা বা কপারের দাম বেড়েছে ১৫ শতাংশ।
অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের দাম বেড়েছে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ।
এ ছাড়া ডলারের বাজার অস্থিরতা এবং আমদানি শুল্ক উৎপাদন খরচ বাড়িয়েছে। মিরপুরের খুচরা ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন বলেন, ‘গরমের তীব্রতা বাড়লে চাহিদা আরও বাড়বে, তখন সরবরাহ সংকটে দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
স্মার্ট ঘর সাজাতে আধুনিক প্রযুক্তির ফ্যান
বর্তমান সময়ে ফ্যান শুধু বাতাস দেওয়ার যন্ত্র নয়, বরং ঘরের ইন্টেরিয়র বা অভ্যন্তরীণ সজ্জার একটি বড় অংশ। আধুনিক গ্রাহকেরা এখন সাধারণ ফ্যানের বদলে বিএলডিসি মোটরচালিত ফ্যান এবং স্মার্ট ফ্যানের দিকে ঝুঁকছেন।
স্মার্ট ফ্যানের বিশেষত্ব
বিদ্যুৎ সাশ্রয়: সাধারণ ফ্যান যেখানে ৭০-৮০ ওয়াট বিদ্যুৎ খরচ করে, বিএলডিসি ফ্যান মাত্র ২৮-৩৫ ওয়াটে একই বাতাস দেয়। এতে বিদ্যুৎ বিল প্রায় ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসে।
রিমোট ও আইওটি নিয়ন্ত্রণ: এখনকার স্মার্ট ফ্যানগুলো রিমোট কন্ট্রোল তো বটেই, মোবাইল অ্যাপ বা ভয়েস কমান্ডের (যেমন অ্যালেক্সা বা গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট) মাধ্যমেও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
নান্দনিক নকশা: মেটালিক ফিনিশ, এডি ল্যাম্পযুক্ত ফ্যান এবং কাঠের টেক্সচারের ব্লেড আধুনিক ঘরকে দিচ্ছে আভিজাত্যের ছোঁয়া।
ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজের ইলেকট্রিক্যাল অ্যাপ্লায়েন্সেসের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর অ্যান্ড সিবিও সোহেল রানা বলেন, ওয়ালটন সাশ্রয়ী ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্রাহকসন্তুষ্টি নিশ্চিত করছে। আমাদের বিএলডিসি প্রযুক্তির ফ্যান প্রচলিত ফ্যানের তুলনায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে, যা একজন গ্রাহকের বার্ষিক খরচ প্রায় ১ হাজার ৬২০ টাকা পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। দেশব্যাপী এ প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব, যা লোডশেডিং কমাতে বড় ভূমিকা রাখবে।
ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস
বাজারে দাম বাড়লেও ফ্যান বিক্রিতে খুব একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে মনে করছেন কোম্পানির কর্মকর্তারা। প্রচণ্ড গরম এবং ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে রিচার্জেবল বা ডিসি ফ্যানের চাহিদাও এবার তুঙ্গে।
আভিজাত্য ও সুস্থতার সঙ্গী
আধুনিক নগরায়ণে ঘর এখন কেবল থাকার জায়গা নয়, বরং আমাদের রুচি ও সুস্থতার প্রতিফলন। ফলে ফ্যান এখন কেবল বাতাস দেওয়ার যন্ত্র নয়, এটি লাইফস্টাইল ও স্মার্ট লিভিংয়ের প্রতীক।
অন্দরসজ্জায় আভিজাত্য আনতে সুপার স্টারের ‘গোল্ডেন আর্ট’ বা ‘ডায়মন্ড’ সিরিজের প্রিমিয়াম ফ্যানগুলোতে রুচিশীল গ্রাহকদের বেশ কদর রয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত জীবনের জন্য ঘরে নিরবচ্ছিন্ন বায়ু চলাচলে এগজোস্ট ফ্যানের চাহিদা আছে। পরিবারের সুরক্ষায় সুপার স্টারের ‘হিউম্যান সেফটি স্ট্রিং’ প্রযুক্তি যান্ত্রিক ত্রুটিতে ফ্যান পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি দূর করে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে।
সাশ্রয়ী জীবনের জন্য শতভাগ কপার কয়েল ও সিলিকন স্টিলসমৃদ্ধ মোটর যেমন বিদ্যুৎ বিল কমায়, তেমনি ডাবল ‘জেড’ বল বিয়ারিং প্রযুক্তি নিশ্চিত করে শব্দহীন প্রশান্তি। তাই ফ্যান নির্বাচনে সঠিক সিদ্ধান্তই নিশ্চিত করবে নিরাপদ ও আভিজাত্যপূর্ণ আগামী।
লেখক: আবদুল্লাহ আল মামুন, প্রধান, মার্কেটিং ও বিজনেস ডেভেলপমেন্ট, সুপার স্টার গ্রুপ (এসএসজি)
স্মার্ট জীবনযাত্রায় পাখার প্রযুক্তি
দেশে বর্তমানে বছরে ৫০ থেকে ৬০ লাখ সিলিং ফ্যানের চাহিদা রয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য ফ্যানের কদরও বেশ বেড়েছে। এখন ফ্যানের সামগ্রিক বাজারমূল্য প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। প্রযুক্তির উৎকর্ষে ফ্যান এখন কেবল বাতাস দেওয়ার যন্ত্র নয়, বরং স্মার্ট জীবনযাত্রার অপরিহার্য অংশ।
আধুনিক গ্রাহকেরা এখন ঘরের ইন্টেরিয়রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ডিজাইন এবং বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী পণ্য খুঁজছেন। এমইপি ফ্যান শতভাগ কপার কয়েল ও উন্নত মোটর প্রযুক্তির মাধ্যমে সর্বোচ্চ বাতাস সরবরাহ ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় নিশ্চিত করে। এ ছাড়া এর উন্নত বিয়ারিং প্রযুক্তি নিশ্চিত করে শব্দহীন ও আরামদায়ক পরিবেশ।
নিরাপত্তা ও টেকসই নির্মাণকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাজারে এমইপি ফ্যান শৈল্পিক নকশা, সাশ্রয় এবং নিরাপত্তার এক অনন্য সমন্বয় নিয়ে এসেছে।
লেখক: শাকিল রাইহান, সহকারী মহাব্যবস্থাপক (মার্কেটিং ও বিজনেস ডেভেলপমেন্ট), এমইপি গ্রুপ