বাণিজ্যিক কিচেন মার্কেট
রেস্তোরাঁয় রান্নার সরঞ্জামের বাজার শতকোটি টাকার
বিবিএসের হিসাবে দেশে বর্তমানে ৪ লাখ ৩৬ হাজার হোটেল-রেস্তোরাঁ ও চা-স্টল রয়েছে।
রেস্তোরাঁয় এখন শতাধিক যন্ত্র ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো কেক-মিষ্টি রাখার ডিসপ্লে, বাণিজ্যিক ওভেন, গ্রিল মেশিন, শর্মা মেশিন, ট্রে, বাণিজ্যিক চুলা, মাংসের চিলার, বড় ফ্রিজ, কফি মেশিন, কাবাব স্টেন্ট, পপকর্ন মেশিন, বুফে ডিস্ক ও কেক মিক্সার ইত্যাদি যন্ত্রপাতি।
আকারভেদে গ্রিল মেশিন ২০-২৭ হাজার, মিষ্টির ডিসপ্লে ২৫-৩০ হাজার ও বাণিজ্যিক চুলা ১০-১২ হাজার এবং লাইভ বেকারির মেশিন ৩-১০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়।
নরসিংদী সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার ভেতরে শুকুন্দি বাচ্চু বাজারের রুটির দোকানেও এখন মুরগির গ্রিল মেশিন পৌঁছে গেছে। আর উপজেলা ও জেলা সদরে তো অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে নানা ধরনের খাবার তৈরি হয়। তেমনি এক রেস্তোরাঁ হলো জেলা শহরের রেলস্টেশন-সংলগ্ন আহার রেস্টুরেন্ট। প্রায় ৩৫ লাখ টাকা বিনিয়োগে শুরু করা এই রেস্তোরাঁয় বাণিজ্যিক চুলা, ওভেনসহ যন্ত্রপাতি কিনতেই প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে জানান এর উদ্যোক্তা।
শুধু নরসিংদী নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়ও প্রত্যন্ত গ্রামের বাজারে এত দিনে ফাস্ট ফুড আর নতুন নতুন রেস্তোরাঁ পৌঁছে গেছে, যেখানে নান ও তন্দুর রুটি, গ্রিল, কাবাব, বার্গার, শর্মাসহ বাহারি সব খাবারের সমাহার দেখা যায়।
এভাবে রেস্তোরাঁ ব্যবসা বৃদ্ধি পাওয়ায় এর ওপর ভর করে বড় হচ্ছে বাণিজ্যিক কিচেনের নানা সরঞ্জামের ব্যবসা। বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকার সরঞ্জাম বেচাকেনা হয়। যদিও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে এখন বেচাবিক্রি কম বলে জানান সরঞ্জামের প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতারা।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত রাস্তার দুপাশে গড়ে উঠেছে দেশের বাণিজ্যিক কিচেন যন্ত্রপাতির অন্যতম বড় বাজার। এখানে প্রায় ৭০টির বেশি দোকান রয়েছে। এসব দোকান রেডিমেড বা তৈরি যন্ত্রপাতি যেমন বিক্রি করে তেমনি ফরমাশ অনুযায়ীও যন্ত্রপাতি বানিয়ে দেয়। বড় ও পুরোনো দোকানগুলো নিজস্ব ওয়ার্কশপ বা কারখানায় তৈরি করে যন্ত্রপাতি। তাদের কাছ থেকে নিয়ে অন্যরা বিক্রি করে। আবার চীন থেকে আমদানি করা আধুনিক অটোমেটিক মেশিনও বিক্রি হয় অনেক দোকানে।
সম্প্রতি ফার্মগেটে কিচেন যন্ত্রপাতি কিনতে এসেছিলেন ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার লোকমান হোসেন। তিনি জানান, বেকার থাকা ছোট ভাইকে গ্রামে একটি বেকারি করে দেওয়ার কথা চিন্তাভাবনা করছেন। সে জন্য লাইভ বেকারি মেশিনের দরদাম জানতে এসেছেন।
প্রথম আলোকে লোকমান হোসেন বলেন, ‘মাঝারি মানের একটি মেশিনের দাম হাঁকাচ্ছে ৬-৭ লাখ টাকা। এত পুঁজিতে বেকারি করতে পারব কি না বা করব কি না, সেটা বাসায় কথা বলে সিদ্ধান্ত নেব।’
এ খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন হচ্ছে বাংলাদেশ কমার্শিয়াল কিচেন ইকুইপমেন্ট প্রস্তুতকারক মালিক সমিতি। সংগঠনটির সদস্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫৪। তারা জানায়, চাহিদা বাড়ায় ফার্মগেট ছাড়াও এখন সাভার, মানিকগঞ্জ, সিলেট, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম প্রভৃতি জেলা ও বিভাগীয় শহরে তৈরি হয়েছে কিচেন মেশিন তৈরি ও বিক্রি মার্কেট। মালিক সমিতির দাবি, এসব দেশীয় প্রতিষ্ঠান এখন রাস্তার পাশের ফুডকোর্ট থেকে শুরু করে সাধারণ রেস্তোরাঁ, হাসপাতালের ক্যানটিন, সুপারশপ এবং এমনকি পাঁচ তারকা হোটেলেও স্মার্ট কিচেন যন্ত্রপাতি সরবরাহ করছে।
এই খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, বিভিন্ন ধরনের খাবারদাবারের ব্যবসা এখন শহর ছাড়িয়ে গ্রামেগঞ্জে পৌঁছে গেছে। এটাকে ঘিরে বাণিজ্যিক কিচেনের বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতির ব্যবসা বেড়েছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশ ঘটায় তারকা হোটেলগুলোয় বিদেশি কিচেন যন্ত্রপাতির আমদানি প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। সব মিলিয়ে এই খাতে দেশে প্রায় শতকোটি টাকার বাজার তৈরি হয়েছে বলে জানান যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী উদ্যোক্তারা।
২০০৭ সাল থেকে এ ব্যবসায়ে যুক্ত রয়েছে ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস। প্রতিষ্ঠানটির মালিক কাজী ফারুকুল ইসলাম বাংলাদেশ কমার্শিয়াল কিচেন ইকুইপমেন্ট প্রস্তুতকারক মালিক সমিতির সভাপতি। এ খাত নিয়ে আলাপকালে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন জেলায় জেলায় কিচেন পণ্যের দোকান হচ্ছে। এ খাত আরও প্রসারিত হবে। ৫০ শতাংশ অ্যাডভান্স নিয়ে আমরা পণ্য (যন্ত্র) তৈরি করি। তাই বিনিয়োগ কম হলেও চলে। তবে আমাদের দেশে চীনের কিছু মানহীন পণ্যও প্রবেশ করছে। সরকার নজর না দিলে এই বাজার চীনের দখলে চলে যেতে পারে।’
কিচেন মার্কেটে বর্তমানে শতাধিক যন্ত্রপাতি পাওয়া যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো কেক-মিষ্টি রাখার ডিসপ্লে, বাণিজ্যিক ওভেন, গ্রিল মেশিন, শর্মা মেশিন, ট্রে, বাণিজ্যিক চুলা, মাংসের চিলার, বড় ফ্রিজ, কফি মেশিন, কাবাব স্টেন্ট, পপকর্ন মেশিন, বুফে ডিস্ক, কেক মিক্সার ইত্যাদি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘হোটেল-রেস্টুরেন্ট জরিপ ২০২১’ অনুযায়ী, দেশে মোট ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৭৪টি হোটেল, রেস্তোরাঁ ও চা-স্টল রয়েছে। এর মধ্যে ফাস্ট ফুড রেস্তোরাঁর সংখ্যা ৬৭ হাজার ৯৯১। আর এ খাতের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন প্রায় ২১ লাখ মানুষ।
গ্রাম এলাকায় গড়ে ওঠা রেস্তোরাঁগুলোয় যন্ত্র বিক্রি করে কোনোমতে ব্যবসায় টিকে থাকার কথা বলেছেন কিছু ব্যবসায়ী। তেমনই একজন হলেন মাহবুব খান, যিনি ১৩ বছর ধরে এ খাতে যুক্ত। তিনি খান এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক। মাহবুব খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘উপজেলা শহরে নতুন নতুন রেস্টুরেন্ট হচ্ছে। মফস্সল এলাকায় যন্ত্রপাতি বিক্রি করেই আমরা টিকে আছি। শহরে একটি রেস্টুরেন্ট করতে কয়েক কোটি টাকা লাগে। এখন অনিশ্চয়তায় কেউ বিনিয়োগ করছেন না। তাই বিক্রি নেমেছে চার ভাগের এক ভাগে।’ নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি হয়তো এমনই থাকবে বলে মনে করছেন তিনি।
ওয়ার্কশপগুলোর সূত্রে জানা গেছে, একটি গ্রিল মেশিন বানাতে ১৫ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। আকারভেদে ২০-২৭ হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়। মিষ্টির ডিসপ্লে বিক্রি হয় ২৫-৩০ হাজার টাকায়। বাণিজ্যিক চুলার দাম পড়ে ১০-১২ হাজার টাকা। কফি মেকারের দাম পড়ে ৮ হাজার টাকা। লাইভ বেকারির মেশিন ৩ লাখ থেকে শুরু করে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়। আর বড় ডিফ ফ্রিজ পাওয়া যায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকায়।
এদিকে নতুন করে এ ব্যবসায়ে আসা ছোট উদ্যোক্তারা এখন বিপাকে আছেন। বিক্রি কমায় দোকানভাড়া দিতেও কষ্ট হচ্ছে তাঁদের। এ লাইনে ৯ বছর কাজ করার পর এক বছর হলো নিজে দোকান দিয়েছেন রিপন মিয়া। ইনসাফ ইঞ্জিনিয়ারিং নামের দোকানটিতে প্রায় ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন তিনি। প্রথম কয়েক মাস কিছুটা বিক্রি হলেও আন্দোলনের পর থেকে বিক্রি কম। মাসে চার-পাঁচটি যন্ত্র মিলিয়ে ১ লাখ টাকা বিক্রি হলেও হয়। কিন্তু তা-ও হচ্ছে না।
রিপন মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘দোকানভাড়া ১৮ হাজার ও বিদ্যুৎ বিল ২ হাজার টাকা। এসবও দিতে পারছি না। গত সাত মাসের ভাড়া বাকি আছে। এভাবে আর কত দিন টিকতে পারব, সেটাই ভাবছি।’