ভোগ্যপণ্যে স্মাইল ফুডস ও নাবিল গ্রুপের উত্থান, জায়গা করে নিয়েছে শীর্ষ পাঁচে

আমদানিনির্ভর ভোগ্যপণ্যের বাজারে গত এক–দেড় বছরের ব্যবধানে বড় ধরনের উত্থান-পতন ঘটেছে। তাতে প্রথমবারের মতো শীর্ষ চারে উঠে এসেছে চট্টগ্রামের স্মাইল ফুড প্রোডাক্টস। আর রাজশাহীর নাবিল গ্রুপ টানা দুই বছর ধরে শীর্ষ পাঁচে জায়গা ধরে রেখেছে।

ভোগ্যপণ্য আমদানির শীর্ষ তিনে অবশ্য তিনটি শিল্প গ্রুপ নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। এই তালিকায় শীর্ষস্থানে রয়েছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ বা এমজিআই। তালিকায় এক ধাপ এগিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে টি কে গ্রুপ। আর সিটি গ্রুপ এক ধাপ নেমে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।

২০২৫ সালের ভোগ্যপণ্য আমদানির হিসাব থেকে এই চিত্র পাওয়া গেছে। আমদানিনির্ভর ভোগ্যপণ্য হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে ছোলা, মোটর ডাল, মসুর ডাল, চিনি, গম, সয়াবিন ও পাম তেল এবং সয়াবিন তেল তৈরির কাঁচামাল সয়াবিন বীজ। আমদানির তথ্য নেওয়া হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের পরিসংখ্যান থেকে।

এনবিআরের হিসাবে, ২০২৫ সালে ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়েছে ১ কোটি ৪১ লাখ টন। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭০৫ কোটি মার্কিন ডলার। এসব পণ্য আমদানি করেছে ৪১৮টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে শীর্ষ ১০টি গ্রুপ আমদানি করেছে ৫৩৮ কোটি ডলারের পণ্য, যা মোট আমদানির ৭৬ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২৪ সালের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ১ কোটি ৪১ লাখ টন পণ্য। এতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় প্রায় ৬৮১ কোটি ডলার। পণ্য আমদানি করেছিল ৪৪০টি প্রতিষ্ঠান। সেই হিসাবে পরিমাণে আমদানি একই থাকলেও আমদানি মূল্য কিছুটা বেড়েছে।

সরকার বদলে পাল্টেছে ব্যবসার চিত্রও

২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ অনেক ব্যবসায়ী আত্মগোপন চলে যান। ঋণখেলাপির অভিযোগে মামলা হয় ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক অনেকের বিরুদ্ধে। তাতে অনেক আমদানিকারক যেমন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, তেমনি নতুন ও পুরোনো আমদানিকারকেরাও সক্রিয় হয়। তাদেরই কয়েকটি এখন শীর্ষে।

এনবিআরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভোগ্যপণ্য আমদানিতে শীর্ষ দশে প্রথমবার জায়গা করে নিয়েছে আকিজ রিসোর্সেস গ্রুপ এবং জহির গ্রুপ। অন্যদিকে এই তালিকা থেকে ছিটকে পড়েছে এস আলম গ্রুপ ও বসুন্ধরা গ্রুপ। চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপ গত বছর কোনো পণ্য আমদানি করেনি। তবে গত বছর গ্রুপটি ২০২৪ সালের আমদানি করা চিনির শুল্ককর পরিশোধ করেছে। ভোগ্যপণ্য আমদানিতে গ্রুপটি ২০২৪ সালে ষষ্ঠ অবস্থানে ছিল।

মোস্তফা কামাল, চেয়ারম্যান, এমজিআই
বর্তমানে ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ডলার–সংকট না থাকায় এমজিআইয়ের আমদানি বেড়েছে। চাহিদা অনুযায়ী আমদানি হওয়ায় দেশে পণ্যের সরবরাহেও কোনো ঘাটতি হয়নি।
মোস্তফা কামাল, চেয়ারম্যান, এমজিআই

স্মাইল ও নাবিল গ্রুপের উত্থান

ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ২০২৪ সাল থেকে সক্রিয় হয়ে উঠে চট্টগ্রামের স্মাইল ফুড প্রোডাক্টস। আবুল খায়ের গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল কাশেমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটি এ খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি একটি চিনি পরিশোধন কারখানা এবং একটি তেল কারখানা কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে।

গত বছরের স্মাইল ফুড প্রোডাক্টস ৬৯ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় তাদের আমদানি বেড়েছে ৬৫ শতাংশ। তাতে প্রথমবারের মতো ভোগ্যপণ্য আমদানিতে চতুর্থ অবস্থানে উঠেছে গ্রুপটি। ২০২৪ সালে গ্রুপটি নিত্যপণ্য আমদানিতে পঞ্চম অবস্থানে ছিল।

রাজশাহীকেন্দ্রিক নাবিল গ্রুপও পরপর দুই বছর শীর্ষ পাঁচে জায়গা করে নিয়েছে। ২০২৫ সালে আমদানির বিবেচনায় গ্রুপটি রয়েছে পঞ্চম অবস্থানে। এ সময়ে গ্রুপটি ৪১ কোটি ২১ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। গ্রুপটি মূলত ছোলা, মসুর, মোটর ডাল ও গম আমদানি করে। ২০২৪ সালে ছিল চতুর্থ অবস্থানে। এক ধাপ পিছিয়ে গেলেও গ্রুপটি গম ও মোটর ডাল আমদানিতে শীর্ষে রয়েছে।

জানতে চাইলে নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশে ভোগ্যপণ্যের যাতে কোনো সংকট তৈরি না হয়, সে জন্য আমরা ধারাবাহিকভাবে আমদানি অব্যাহত রেখেছি। মাঝখানে ডলার–সংকটসহ ঋণপত্র খোলার জটিলতার কারণে আমদানি কিছুটা শ্লথ হলেও সে সমস্যা এখন অনেকাংশে কেটে গেছে। এ কারণে চাহিদার বিপরীতে আমরা পর্যাপ্ত আমদানি করে যাচ্ছি। আশা করছি, ভোগ্যপণ্যে আমদানির ক্ষেত্রে আমরা আরও ভালো অবস্থান তৈরি করতে পারব। রমজানকে সামনে রেখে এরই মধ্যে আমরা কিছু ভোগ্যপণ্যের আমদানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়িয়েছি। তাতে অচিরেই শীর্ষ তিনে জায়গা করে নিতে পারব বলে আশা রাখছি। অর্থনীতি ও বাজারে বড় ধরনের কোনো সংকট দেখা না দিলে আমরা আমাদের আমদানির এই ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখব। এরই মধ্যে আমরা ভোগ্যপণ্যনির্ভর কারখানায় বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছি।’

শীর্ষ তিনে পুরোনোরাই

ভোগ্যপণ্য আমদানিতে শীর্ষ তালিকায় দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে এমজিআই। সরাসরি আমদানির পাশাপাশি মৌলিক কারখানাও গড়ে তুলেছে গ্রুপটি। গ্রুপটি গম, অপরিশোধিত চিনি, অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেল এবং সয়াবিন তৈরির কাঁচামাল সয়াবিন বীজ আমদানি করে। চিনি ও সয়াবিন বীজ আমদানিতে গ্রুপটি শীর্ষে রয়েছে।

গ্রুপটি ২০২৫ সালে ১৪৭ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। আমদানি করা পণ্যের পরিমাণ ২৯ লাখ ৪২ হাজার টন। দেশে মোট ভোগ্যপণ্য আমদানির ২১ শতাংশ অংশীদারি গ্রুপটির। এমজিআই ২০২৪ সালের একই সময়ে আমদানি করেছিল ১১৪ কোটি ৬৩ লাখ ডলারের পণ্য। সেই হিসাবে গ্রুপটির আমদানিতে প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৯ শতাংশ।

জানতে চাইলে এমজিআইয়ের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ডলার–সংকট না থাকায় এমজিআইয়ের আমদানি বেড়েছে। চাহিদা অনুযায়ী আমদানি হওয়ায় গত বছর পণ্য সরবরাহে কোনো ঘাটতি হয়নি।

মোহাম্মাদ মুস্তাফা হায়দায়, পরিচালক, টি কে গ্রুপ
ডলারের দাম স্থিতিশীল হওয়ায় পরিকল্পনা অনুযায়ী পণ্য আমদানি করা সম্ভব হয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে বাজারে চাহিদা বাড়েনি।
মোহাম্মাদ মুস্তাফা হায়দায়, পরিচালক, টি কে গ্রুপ  

ভোগ্যপণ্য আমদানির দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে টি কে গ্রুপ। ২০২৪ সালে গ্রুপটি ছিল তৃতীয় অবস্থানে। ২০২৫ সালে গ্রুপটি ৯৪ কোটি ২৮ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। গ্রুপটির আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৫ শতাংশ। গ্রুপটি মূলত অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেল আমদানি করে। এই দুটো পণ্যের শীর্ষ আমদানিকারকও টি কে গ্রুপ। পাশাপাশি গম ও ডাল–জাতীয় পণ্যও আমদানি করছে তারা।

জানতে চাইলে টি কে গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মাদ মুস্তাফা হায়দায় প্রথম আলোকে বলেন, ডলারের দাম স্থিতিশীল হওয়ায় পরিকল্পনা অনুযায়ী পণ্য আমদানি করা সম্ভব হয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে বাজারে চাহিদা বাড়েনি।

ভোগ্যপণ্য আমদানিতে এক বছরের ব্যবধানে এক ধাপ অবনতি হয়ে তৃতীয় অবস্থানে নেমেছে সিটি গ্রুপ। সদ্যবিদায়ী বছরে সিটি গ্রুপ ৮৯ কোটি ৯৮ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। তার আগের বছরের একই সময়ে আমদানি করেছিল ১০০ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য। চিনি, সয়াবিন তেল ও সয়াবিন বীজ আমদানিতে গ্রুপটি দ্বিতীয় অবস্থানে। আর ছোলা আমদানিতে প্রথম অবস্থানে রয়েছে।

শীর্ষ দশে নতুন দুই গ্রুপ

ভোগ্যপণ্য আমদানিতে শীর্ষ দশে থাকা অন্য পাঁচটি গ্রুপ হলো বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেড, মাহবুব গ্রুপ, আকিজ রিসোর্সেস গ্রুপ, এসবি গ্রুপ ও জহির গ্রুপ। এর মধ্যে আকিজ রিসোর্সেস ও জহির গ্রুপ প্রথমবার ভোগ্যপণ্য আমদানির শীর্ষ দশে জায়গা করে নিয়েছে। গ্রুপ দুটির নিত্যপণ্য আমদানিতে প্রবৃদ্ধিও সবচেয়ে বেশি।

শীর্ষ দশে জায়গা করে নেওয়া আকিজ রিসোর্সেস গ্রুপ ২০২৫ সালে ভোগ্যপণ্য আমদানি করেছে ১৮ কোটি ৪০ লাখ ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ের (৫ কোটি ৯৩ লাখ ডলার) তুলনায় ২১০ শতাংশ বেশি। গ্রুপটি গম ও ডাল–জাতীয় পণ্য বেশি আমদানি করে। ঢাকার জহির গ্রুপ ভোগ্যপণ্যে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালে গ্রুপটি আমদানি করেছে ১৫ কোটি ৩৬ লাখ ডলারের ভোগ্যপণ্য। ২০২৪ সালের তুলনায় গ্রুপটির আমদানিতে প্রবৃদ্ধি ৬২৪ শতাংশ। গ্রুপটির আমদানির তালিকায় রয়েছে ডাল ও গম।

আমিনুল ইসলাম, এমডি, নাবিল গ্ৰুপ
ভোগ্যপণ্যে আমদানির ক্ষেত্রে আমরা আরও ভালো অবস্থান তৈরি করতে পারব। পবিত্র রমজানকে সামনে রেখে এরই মধ্যে আমরা কিছু ভোগ্যপণ্যের আমদানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়িয়েছি।
আমিনুল ইসলাম, এমডি, নাবিল গ্রুপ

বড় বিনিয়োগকারীরাই টিকে আছে

ভোগ্যপণ্য আমদানির তালিকায় এখন বড় শিল্প গ্রুপের আধিপত্য। আমদানি করা ভোগ্যপণ্য কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করছে এসব প্রতিষ্ঠান। এ জন্য এসব প্রতিষ্ঠান বড় বড় কারখানা গড়ে তুলেছে।

ভোগ্যপণ্য বাজারজাতকারী ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভোগ্যপণ্যের বাজারে উত্থান-পতন স্বাভাবিক ঘটনা। এস আলম গ্রুপসহ কয়েকটি শিল্প গ্রুপ আমদানি না করায় বাজারে যে ঘাটতি হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। কারণ, এটিকে সুযোগ হিসেবে নিয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠান। অনেকে নতুন করে এই বাজার ধরতে আমদানি বাড়িয়েছে। শীর্ষ দশে প্রথমবার জায়গা করে নেওয়া গ্রুপগুলো তারই প্রমাণ। এসব প্রতিষ্ঠানের আমদানি বেড়ে যাওয়ায় কয়েকটি গ্রুপ ঝরে যাওয়ার পরও বাজারে সরবরাহে কোনো ঘাটতি হয়নি।