চামড়ার ভালো দাম পেতে কী করবেন, কোন এলাকার চামড়া ভালো
চলে এসেছে কোরবানি ঈদের মৌসুম। এ সময় ঈদের আগে পর্যন্ত ব্যস্ততা থাকে কোরবানির পশু কেনা নিয়ে। আর ঈদের নামাজের পর থেকে তৃতীয় দিন পর্যন্ত চলে পশু জবাই–সংক্রান্ত ব্যস্ততা। সঙ্গে থাকে কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে চিন্তা।
পশুর চামড়া ঠিকভাবে কাটা হলো কি না, চামড়ার উপযুক্ত দাম মিলবে কি না, কিংবা বিক্রিতে বেশি দেরি হলে চামড়া নষ্ট হয়ে যাবে কি না—এসব চিন্তা প্রায় সবার মাথাতেই ঘুরপাক খায়। অন্যদিকে চামড়া দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ ও রপ্তানি পণ্য। তাই ভালোভাবে চামড়া সংরক্ষণে সব সময় গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জেনে নেওয়া যাক, কোন পদ্ধতি অনুসরণ করলে চামড়ার সম্ভাব্য ক্ষতি এড়িয়ে উপযুক্ত দামে তা বিক্রি করা যায়।
কোরবানি উপযোগী পশুর সংখ্যা
সরকারি হিসেবে, দেশে গত বছরের তুলনায় এবার কোরবানিযোগ্য পশুর মজুত বেশি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, কোরবানি দেওয়া যায় এ বছর এমন গবাদিপশুর মোট সংখ্যা ১ কোটি ২৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৩৩টি, যা গত বছরের চেয়ে ৪ লাখ ১১ হাজার ৯৪৪টি বেশি। অন্যদিকে এ বছর কোরবানির পশুর সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৭৩৯টি। সেই হিসাবে এ বছর কোরবানি শেষ হওয়ার পরও দেশে ২১ লাখ ৪১ হাজার ৫৯৪টি কোরবানিযোগ্য পশু উদ্বৃত্ত থেকে যেতে পারে।
চামড়া সংরক্ষণ করেন এমন ব্যবসায়ীরা জানান, সারা বছরে যে পরিমাণ চামড়া পাওয়া যায়, তার প্রায় অর্ধেকই আসে কোরবানির ঈদের মৌসুমে। তাই এ সময়ের জন্য বাড়তি প্রস্তুতি রাখতে হয় তাঁদের। প্রাথমিকভাবে কাঁচা চামড়া মূলত লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। এরপর তা প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য চলে যায় ট্যানারিতে।
এ বছর চামড়ার দাম কত
এ বছর ঢাকায় লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ৫০ থেকে ৫৫ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। গত বছর এই দাম ছিল ৪৭ থেকে ৫২ টাকা। আর ঢাকার বাইরে লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা। গতবার ছিল ৪০ থেকে ৪৪ টাকা।
তবে গরুর চামড়ার দাম বাড়লেও খাসি ও বকরির চামড়ার দাম বাড়েনি। খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং বকরির চামড়া ১২ থেকে ১৪ টাকায় বিক্রি হবে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে গত রোববার চামড়ার এ দাম নির্ধারণ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
দাম কেন লবণযুক্ত হিসাবে করা হয়
পশু কোরবানির পরে প্রাথমিকভাবে মূলত কাঁচা চামড়া বিক্রি করেন কোরবানিদাতা বা মৌসুমি চামড়া সংগ্রহকারীরা। কিন্তু কোরবানির পশুর ক্ষেত্রে কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণের পরিবর্তে প্রতিবছর লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়। আড়তদার বা ট্যানারিগুলো লবণের দাম ও শ্রমিকের মজুরি বাদ দিয়ে মৌখিকভাবে কাঁচা চামড়ার দরদাম ঠিক করেন। এ কারণে অনেকে কাঁচা চামড়ার ন্যায্য দাম না পাওয়া নিয়ে অভিযোগ করেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি মো. শাহীন আহমেদ বলেন, পশুর চামড়া ছাড়ানোর পরে দ্রুততম সময়ে তা লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। কিন্তু দেখা গেছে কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হলে মানুষের মধ্যে লবণ দেওয়ার আগ্রহ কমে যায়। তাঁরা বেশি দামে বিক্রির জন্য লবণ না দিয়ে কাঁচা চামড়া বিক্রির জন্য রেখে দেন। এতে চামড়া নষ্ট হয়। মূলত এ কারণেই লবণ দেওয়া চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়।
লবণ দিতে হবে ৪-৯ ঘণ্টার মধ্যে
প্রাথমিকভাবে কোরবানিদাতা ব্যক্তি অথবা মসজিদ-মাদ্রাসা-এতিমখানার চামড়া সংগ্রহকারী কিংবা মৌসুমি ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে কাঁচা চামড়া যায় আড়তদারদের কাছে। ট্যানারি মালিকেরাও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কাঁচা চামড়া সরাসরি কেনেন। এরপর এসব চামড়ায় লবণ মিশ্রিত করে সাময়িকভাবে সংরক্ষণ করা হয়।
তবে দেখা গেছে অনেকেই চামড়া বেশি দামে বিক্রির আশায় দীর্ঘ সময় রেখে দেন। এক বাজার থেকে অন্য বাজারে ঘোরেন। এতে চামড়ার স্থায়িত্ব নষ্ট হয়। পোস্তার কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী ও বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমএ) সভাপতি মো.আফতাব খান জানান, ‘ঠিকভাবে সংরক্ষণ না করায় প্রতিবছর অন্তত ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কোরবানির পশুর চামড়া নষ্ট হয়।’
এ জন্য কোরবানির পশুর চামড়া ছাড়ানোর ৪ থেকে ৯ ঘণ্টার মধ্যে লবণ দিয়ে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলেন, এই সময়ের মধ্যে চামড়ায় লবণ দেওয়া না গেলে ওই চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। যাঁরা কোরবানি দেন, কিংবা প্রাথমিকভাবে চামড়া সংগ্রহ করেন, তাঁরা নিজেরাও চাইলে চামড়ায় লবণ দিতে পারেন। এতে তাঁরা একটু সময় নিয়েও সেই চামড়া বিক্রি করতে পারবেন। চামড়া নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে।
মো.আফতাব খান বলেন, এ বছর লবণের দাম কিছুটা বেশি। তবে চামড়ার চাহিদাও বেড়েছে। তাই ব্যক্তি পর্যায়ে লবণ দিলেও ভালো দাম পাবেন বিক্রেতারা।
কতটা লবণ লাগবে
পোস্তার কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী ও বিএইচএসএমএ সাধারণ সম্পাদক মো. টিপু সুলতান জানান, চামড়ার হিসাব বর্গফুটে করা হয়। ৩৫ থেকে ৫০ বর্গফুটের চামড়াকে বড় আকারের ধরা হয়। এই আকারের একটি চামড়া সংরক্ষণের জন্য ৮ থেকে ৯ কেজি লবণ প্রয়োজন হয়। আর চামড়ার আকার ৫৫ থেকে ৬০ বর্গফুট হলে লবণ লাগে ১০ কেজির মতো।
অন্যদিকে, মাঝারি (২২–২৫ বর্গফুট) আকারের একটি চামড়ার জন্য ৫ থেকে ৬ কেজি লবণ প্রয়োজন হয়। আর ছোট (১৫–১৬ বর্গফুট) আকারের চামড়ার জন্য লবণ লাগে ৩ থেকে ৪ কেজি।
এ ছাড়া এক কেজি লবণ দিয়ে দুইয়ের বেশি ভেড়া, ছাগল বা খাসির চামড়া সংরক্ষণ করা যায়।
ঢাকার বাইরের চামড়া ১০ দিন পরে
পুরান ঢাকার লালবাগের পোস্তার চামড়ার আড়তগুলো কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের বড় জায়গা। কোরবানির ঈদের দিন সকাল থেকেই চামড়া সংগ্রহ করেন পোস্তার আড়তদারেরা। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মূলত চামড়া কেনেন তাঁরা। ঈদের তৃতীয় দিন পর্যন্ত চলে চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কার্যক্রম।
ঢাকার বাইরের জেলাগুলোয় চামড়ার দাম সাধারণত একটু কম থাকে। তাই অনেকে বেশি দামের আশায় চামড়া সরাসরি পোস্তায় নিয়ে আসেন। কিন্তু দূর থেকে ঢাকায় চামড়া এনে বিক্রি করতে লম্বা সময় লাগে। এতে অনেক চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। এ জন্য চামড়া ব্যবসায়ীদের অনুরোধ, কাছাকাছি স্থানে লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করা হোক; তাতে চামড়ার গুণগত মান ঠিক থাকবে, দামও ভালো পাওয়া যাবে।
পরিবহনের দীর্ঘসূত্রতার কারণে কাঁচা চামড়া যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্য কিছু বিধিনিষেধও রয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, ঈদের ১০ দিন পর থেকে ঢাকার বাইরে থেকে চামড়া রাজধানী শহরে প্রবেশ করতে পারবে। এর আগে অন্য জেলার পশুর চামড়া নিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করা যাবে না।
লবণজাত করে চামড়া সংগ্রহের জন্য পোস্তার ব্যবসায়ীরা সাভার, হেমায়েতপুর, আমিনবাজার, বেড়িবাঁধ, কেরানীগঞ্জ, জিঞ্জিরা, টঙ্গী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সোনারগাঁও, মুন্সীগঞ্জসহ ঢাকার আশপাশের বেশ কিছু এলাকায় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা রেখেছেন।
কোন এলাকার পশুর চামড়া ভালো
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) জানায়, দেশে পশু সম্পদ উৎপাদন ও চামড়ার গুণগত মান বিবেচনায় নিয়ে দেশকে এ, বি, সি—এই তিন প্রধান চামড়া অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে।
রংপুর ও রাজশাহী বিভাগ, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও এর আশপাশের এলাকার পশু থেকে পাওয়া চামড়াকে এ শ্রেণির মধ্যে ধরা হয়েছে। যশোর, খুলনার কিছু অংশ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, চাঁদপুর, কুমিল্লা, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ইত্যাদি এলাকার পশুর চামড়াকে ধরা হয়েছে বি-শ্রেণিতে। এ ছাড়া খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রামসহ দেশের দক্ষিণ অংশের পশুর চামড়াকে সি-শ্রেণির বিবেচনা করা হয়েছে।
বিটিএ জানানয়, এ-শ্রেণি অঞ্চলের চামড়ার গুণগত মানের দিক থেকে সবচেয়ে ভালো, দামও বেশি। আর বি-শ্রেণির অঞ্চলের পশুর চামড়া মধ্যম মানের। এ ছাড়া সি-শ্রেণি অঞ্চলে যেসব পশু পাওয়া যায়, সেগুলোর চামড়া তুলনামূলক নিম্নমানের।
বিটিএ চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ জানান, কাঁচা চামড়ার বেশি দাম পেতে অনেক মৌসুমি বিক্রেতা এক অঞ্চলের চামড়া অন্য অঞ্চলে নিয়ে বিক্রি করেন। এটা করা উচিত না। এর ফলে ভালো মানের চামড়া আলাদা করা কঠিন হয়ে যায়। এতে ট্যানারি মালিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।
এদিকে রপ্তানি উপযোগী ভালো চামড়া সংগ্রহের জন্য বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটি বলছে, বিভাগীয় শহরে আধুনিক কসাইখানা ও হিমাগার স্থাপন করা গেলে ভালো মানের চামড়া সংগ্রহের পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পাবে।