পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকলেও শঙ্কা শর্তের বেড়াজাল নিয়ে

এক শতাংশ পাল্টা শুল্ক হ্রাস পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সামগ্রিক পণ্য রপ্তানিতে বিশেষ কোনো সুবিধা পাবে না বাংলাদেশ। তবে মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহারে তৈরি করা পোশাক রপ্তানি করলে দেশটিতে শূন্য পাল্টা শুল্কের সুবিধা পাবে বাংলাদেশ। তাতে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় মোট শুল্ক ভার কমবে পোশাকে। তাতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়বে বলে মনে করছেন রপ্তানিকারকেরা।

তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাঁরা আশা করেছিলেন, পাল্টা শুল্ক উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমবে। সেটি না হওয়ায় তাঁরা হতাশ। আবার শূন্য পাল্টা শুল্ক সুবিধার জন্য রপ্তানি হওয়া তৈরি পোশাকে মার্কিন তুলা ব্যবহারের সত্যতা যাচাইয়ের পদ্ধতি কী হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে কঠিন শর্ত আরোপ করা হলে তাতে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। তা ছাড়া মার্কিন তুলার দাম সামান্য বেশি। আমদানিতেও সময় লাগে বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গত সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় বাণিজ্যচুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। এই চুক্তির পর বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে দেশটির আরোপিত পাল্টা শুল্কহার ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমানো হয়েছে। তাতে বাংলাদেশের পণ্যের শুল্কহার ২০ থেকে কমে হয়েছে ১৯ শতাংশ।

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের শুল্ক কিছুটা কমেছে, এতে অনেকে স্বস্তি প্রকাশ করছেন। তবে এই চুক্তির জন্য যেসব অঙ্গীকার আমাদের করতে হয়েছে, তা নিয়ে আমার উদ্বেগ। সেই সঙ্গে চুক্তির সব বিষয় আমরা এখনো জানি না।’ তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ প্রায় শেষ। এখন এই চুক্তির ভার বহন করতে হবে পরবর্তী সরকারকে। বিষয়টি তাদের জন্য যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং হবে।

প্রতিযোগীদেরও শুল্ক কমছে

বাংলাদেশি পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলারের। তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছে ৮৬৯ কোটি ডলার। এই বাজারে তৈরি পোশাকই রপ্তানি হয়েছে ৭৫৫ কোটি ডলারের। তার বাইরে হোম টেক্সটাইল, টুপি বা ক্যাপ, জুতা, প্লাস্টিক পণ্য ইত্যাদিও রপ্তানি হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছরের ২ এপ্রিল দেশটিতে পণ্য রপ্তানিকারক ১০০টি দেশের ওপর বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। শুরুতে বাংলাদেশের জন্য এ হারটি ছিল ৩৭ শতাংশ। পরে শুল্ক আরোপ তিন মাসের জন্য পিছিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ঠিক তিন মাসের মাথায় ২০২৫ সালের ৭ জুলাই বাংলাদেশের ওপর আরোপিত শুল্ক ৩৭ থেকে ৩৫ শতাংশে নামানোর ঘোষণা দেন ট্রাম্প। আরও দর-কষাকষির পর ২ আগস্ট এ হার কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। ৭ আগস্ট থেকে এই পাল্টা শুল্কহার কার্যকর হয়। বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে দেশটিতে গড় শুল্ক ১৫ শতাংশ। তার সঙ্গে বাড়তি হিসেবে যুক্ত হয় পাল্টা শুল্ক।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশের মধ্যে ভিয়েতনামের পণ্যে ২০, ভারতের ৫০, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়ার ১৯, শ্রীলঙ্কার ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ হয়েছিল। সম্প্রতি ভারতের শুল্ক কমে ১৮ শতাংশ হয়েছে। তার আগে চীনের শুল্ক কিছুটা কমেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক ছাড়া অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা সীমিত হয়ে আসছে।

জানতে চাইলে এনপলি ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, পাল্টা শুল্ক আরোপ হওয়ার পর চীন থেকে জুতার ক্রয়াদেশ সরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছিল অনেক মার্কিন ক্রেতা। কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই জোয়ার অনেকটাই কমে গেছে। তার কারণ, চীনসহ প্রতিযোগী দেশের পাল্টা শুল্ক প্রায় কাছাকাছি। সাধারণত শুল্ক হ্রাস বা বৃদ্ধি হলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। ১ শতাংশ পাল্টা শুল্ক কমার পর তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তার মানে, ১ শতাংশ পাল্টা শুল্ক কমানোয় তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না জুতা রপ্তানিতে।

মার্কিন তুলায় সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ

গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্টা শুল্ক কমানোর দর–কষাকষিতে দেশটি থেকে পণ্য আমদানি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয় বাংলাদেশ সরকার। তারপর দেশটি থেকে তুলা ও খাদ্যশস্যের আমদানি শুরু করে বেসরকারি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৭৫ কোটি কেজি তুলা আমদানি হয়। তার মধ্যে ব্রাজিল থেকে ৪২ কোটি, ২৬ কোটি কেজি ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১১ কোটি ৯৩ লাখ কেজি তুলা আমদানি হয়েছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে ব্রাজিলের প্রতি পাউন্ড তুলার দাম ৭৭-৭৮ সেন্ট। আরও মার্কিন তুলার দাম ৮৫-৮৭ সেন্ট। ঋণপত্র খোলার পর ব্রাজিল থেকে আড়াই মাসে তুলা আনা যায়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আনতে সময় লাগে ৪ মাস। তাতে ব্যবসায়ীদের মূলধন আটকে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পাল্টা শুল্ক কার্যকরের পর থেকে এখন পর্যন্ত ৫ হাজার টন তুলা আমদানি করেছে বস্ত্র খাতের অন্যতম শীর্ষস্থান প্রতিষ্ঠান মোশাররফ গ্রুপ। জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, দেশীয় বস্ত্রকলগুলো বর্তমানে ভারতীয় সুতার সঙ্গে দামের প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন তুলা আমদানি করে সুতা তৈরি করলে তাতে বস্ত্রকলের লোকসান আরও বাড়বে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, গত অর্থবছর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৪৯৪ কোটি ডলারের ওভেন কাপড় এবং ২৬০ কোটি ডলারের নিট পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। নিট পোশাকের ৯০-৯৫ শতাংশ কাপড় দেশে তৈরি হলেও ওভেন কাপড়ের ৬৫-৭০ শতাংশ আমদানি করতে হয়। ফলে নিট পোশাক উৎপাদনে মার্কিন তুলার ব্যবহার বাড়ানো গেলেও ওভেন পোশাকে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, তৈরি পোশাকে মার্কিন তুলা ব্যবহারের বিষয়টি কীভাবে যাচাই হবে, সেটি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। প্রক্রিয়াটি জটিল হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সবাই সুফল না–ও পেতে পারে। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আজকে এক শুল্ক, কালকে আরেক। প্রতিযোগী দেশগুলো শুল্ক কমানোর চেষ্টা করছে। ফলে বর্তমান ব্যবস্থা কত দিন বজায় থাকে, তার ওপর প্রকৃত সুবিধা নির্ভর করবে।