খাতুনগঞ্জে ব্যবসার সুবিধা বাড়াতে গুরুত্ব দেওয়া উচিত

জৌলুশ হারাতে বসেছে দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ। কেন খাতুনগঞ্জের ব্যবসা কমে গেল, বর্তমানে যাঁরা এ বাজারে টিকে আছেন, তাঁদেরই সমস্যা কী—এসব বিষয়ে কথা বলেছেন খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী।

আবুল বশর চৌধুরী, চেয়ারম্যান,বিএসএম গ্রুপ
ফাইল ছবি

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: খাতুনগঞ্জের ব্যবসার পরিস্থিতি এখন কেমন?

আবুল বশর চৌধুরী: খাতুনগঞ্জের ব্যবসার সোনালি দিন এখন আর সেই অর্থে নেই। একসময় আমদানিনির্ভর নিত্যপণ্যের ৭০-৮০ শতাংশ খাতুনগঞ্জ থেকে সরবরাহ হতো। এখন খাতুনগঞ্জে দেশের আমদানি করা নিত্যপণ্যের লেনদেন এক–চতুর্থাংশে নেমে এসেছে। এর মূল কারণ হলো দেশের অন্য এলাকায় যেভাবে বাণিজ্যের সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে, সেভাবে খাতুনগঞ্জে সুযোগ-সুবিধা বাড়েনি। আবার ব্যবসার ধরন পরিবর্তনের কারণেও খাতুনগঞ্জের চেয়ে দেশের অন্য এলাকায় বাণিজ্য বেড়েছে।

 নব্বইয়ের দশকের শুরুতে নদীপথে লাইটার জাহাজে পণ্য নেওয়া শুরু হয়। বন্দর থেকে সরাসরি সাগর-নদীপথ হয়ে দেশের নানা এলাকায় সহজে নেওয়া যেত নিত্যপণ্য। এতে ঢাকার নারায়ণগঞ্জ, যশোরের নোয়াপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় কম খরচে ও সহজে পণ্য নেওয়া যায়। ফলে ওই সব এলাকায় গড়ে উঠেছে বাণিজ্যকেন্দ্র। আবার একই সময়ে স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি বাড়তে থাকে। সীমান্ত এলাকার লোকজনও এ ব্যবসায় যুক্ত হয়। তাতে ব্যবসা দেশের অন্য এলাকায় বিস্তৃত হয়েছে।

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: খাতুনগঞ্জে কেন ব্যবসার প্রসার হয়নি?

আবুল বশর চৌধুরী: খাতুনগঞ্জে ব্যবসা প্রসার না হওয়ার অনেকগুলো কারণ আছে। সর্বশেষ যদি বলা হয়, তাহলে সড়কপথে পণ্য পরিবহনে ওজন নিয়ন্ত্রণের কথা বলতে হয়। চট্টগ্রাম থেকে ছয় চাকার গাড়িতে ১৩ টনের বেশি পণ্য নেওয়া যায় না। দেশের অন্য এলাকায় সেভাবে কড়াকড়ি নেই। এতে চট্টগ্রাম থেকে পণ্য নেওয়া হলে খরচ পড়ে বেশি। আবার দেশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে ভোগ্যপণ্যের বাজার। সেই তুলনায় খাতুনগঞ্জের সুযোগ-সুবিধা খুব বেশি বাড়েনি। সরু সড়ক, জলাবদ্ধতার কারণে এখানকার ব্যবসায়ীরা প্রায়ই ক্ষতির মুখে পড়ছে। পণ্য রাখার গুদাম বাড়ানোর জন্যও জায়গা নেই এখানে। আবার বাণিজ্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে অনেকে। এতে এই বাজার থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে অনেকে। ঢাকা-চট্টগ্রাম শহর ছাড়াও বিভাগীয় শহরে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভোগও বেড়েছে। দেশের নতুন নতুন এলাকায় বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এসব কারণে খাতুনগঞ্জের গুরুত্ব কমেছে। 

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: একসময় খাতুনগঞ্জে বড় বড় শিল্পগ্রুপের প্রধান কার্যালয় ছিল। এখন বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় নেই। খাতুনগঞ্জের ‘শেষ নবাব’ বলা হয় আপনাকে। আপনার অভিমত কী?

আবুল বশর চৌধুরী: তিন দশক আগেও ঢাকার মৌলভীবাজার, খুলনা ও রাজশাহীর ব্যবসায়ীরা খাতুনগঞ্জে কার্যালয় খুলে ব্যবসা করেছেন। বিদেশি সরবরাহকারীরাও একনামে চেনে খাতুনগঞ্জকে। চট্টগ্রামের বড় গ্রুপগুলোর প্রধান বা গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ও ছিল খাতুনগঞ্জে। তবে সম্প্রসারণের সুযোগ না থাকায় ও দেশের অন্য এলাকায় ব্যবসা বিস্তৃত হওয়ায় অনেকেই প্রধান কার্যালয় সরিয়ে নিয়েছে। কেউ কেউ ঢাকামুখী হয়েছে। সময়ের সঙ্গে খাতুনগঞ্জের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা যদি বাড়ত, তাহলে এ অবস্থা হতো না। প্রাচীন এই বাণিজ্যকেন্দ্রের নানা অসুবিধার পরও বিএসএম গ্রুপের প্রধান কার্যালয় স্থানান্তর করিনি। এ রকম বিকল্প বাণিজ্যকেন্দ্র নতুন করে গড়ে তোলা কঠিন। ঐতিহ্যের কথা বিবেচনা করে খাতুনগঞ্জের ব্যবসার জন্য অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়ানো দরকার।