রাজধানীর রেডিসন ব্লু হোটেলে গতকাল সোমবার ইন্টারন্যাশনাল অ্যাপারেল ফেডারেশনের (আইএএফ) আয়োজনে ৩৭তম আইএএফ বিশ্ব ফ্যাশন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেই এসব কথা বলেন বক্তারা। উৎপাদক, সরবরাহকারী ও গ্রাহকের সম্মিলনে ফ্যাশন খাতের টেকসই রূপান্তর এবারের সম্মেলনের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন আইএএফ সভাপতি জেম অলটান, তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান ও নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান।

সম্মেলনে বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ‘অনেক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আমরা রপ্তানির ধারা অব্যাহত রাখতে পেরেছি। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বা সবুজ কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে টেকসই পণ্য উৎপাদনের দিকে যাচ্ছি। তারপরও বেশ কিছু জায়গায় উন্নতির সুযোগ আছে। যেমন পণ্য তৈরিতে পানির ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, বর্জ্য উৎপাদন কমানো, পেশাগত স্বাস্থ্যনিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি।’

দেশে বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের উপযোগী করার বিপুল সম্ভাবনা আছে বলে জানান বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান। তিনি বলেন, দেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতে প্রতিবছর প্রায় চার লাখ টন পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশের কম বর্জ্য স্থানীয়ভাবে রিসাইকেল বা পুনর্ব্যবহার হয় আর ৩৫ শতাংশের বেশি বয়লার বা ভাগাড়ে পোড়ানো হয়। অন্যদিকে প্রায় ৬০ শতাংশ বর্জ্য ভারত, সুইডেনসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। সেখানে এসব বর্জ্য সুতা হিসেবে পুনর্ব্যবহারের উপযোগী হয়ে আমাদের কাছেই উচ্চ মূল্যে বিক্রি করা হয়। বর্জ্যের এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পৃথক নীতিমালা করার পরামর্শ দেন তিনি।

বিকেএমইএর সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘পরিবেশদূষণ হ্রাস করার বিষয়ে আমাদের কারখানাগুলো জোর দিচ্ছে। এর মাধ্যমে একটি টেকসই পোশাক খাত তৈরিতে কাজ করছি আমরা। তবে এ জন্য উৎপাদকের পাশাপাশি পণ্যের সরবরাহকারী থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সবাইকে নিয়ে কাজ করতে হবে।’

ইন্টারন্যাশনাল অ্যাপারেল ফেডারেশনের (আইএএফ) সভাপতি জেম অলটান বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন এখন বৈশ্বিক সমস্যা। সেখানে পরিবেশদূষণ কমাতে অন্যতম বৃহৎ খাত হিসেবে পোশাকশিল্পের দায়িত্ব আছে। পরিবেশ সুরক্ষায় প্রাধান্য দিয়ে ইউরোপের পোশাকের বাজার বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করেছে। সুতরাং, বৈশ্বিক বাজার ধরে রাখতে হলে আমাদের জলবায়ু পরিবর্তনের রাশ টানতে উদ্যোগী হতে হবে।’

জেম অলটান আরও বলেন, শুধু পরিবেশগত বিষয়ই নয়, ব্যবসায়িক দিক থেকেও চ্যালেঞ্জ আছে। বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তাদের চাহিদা, ক্রয়াদেশ ও পণ্য উৎপাদন কমেছে। ফলে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত না করলে বাজার ধরে রাখা কঠিন হবে।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউরোপিয়ান অ্যাপারেল অ্যান্ড টেক্সটাইল অর্গানাইজেশনের (ইউরাটেক্স) মহাপরিচালক ডাক ভেন্টিংহাম। ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু নিরপেক্ষ পরিবেশ তৈরি করতে গ্রিন ডিল বা পরিবেশবান্ধব চুক্তি অনুমোদন করেছে ইউরোপীয় কমিশন।

তৈরি পোশাক খাতে এর প্রভাব কেমন হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করেন ডাক ভেন্টিংহাম। তিনি বলেন, ইউরোপের দেশগুলো এখন টেকসই পণ্য কিনতে চায়; অর্থাৎ যেসব পণ্যের স্থায়িত্ব আছে, মেরামতযোগ্য ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য, সেগুলোই ইউরোপের বাজারে প্রাধান্য পাবে।

ডাক ভেন্টিংহাম বলেন, পরিবেশবান্ধব চুক্তি অনুসারে, উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারীদের পণ্যের দায়িত্ব নিতে হবে। প্রতিটি পণ্যের সঙ্গে ডিজিটাল পাসপোর্ট বা পরিচিতি থাকবে। এটি দেখে ক্রেতা ধারণা পাবেন, পণ্যটি টেকসই প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত কি না। পাশাপাশি উৎপাদকদের অবশ্যই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে হবে। ইউরোপে পোশাকের বাজার ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশকেও এসব বিষয় মেনে পণ্য তৈরি করতে হবে।

তৈরি পোশাকশিল্পে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং বা ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে সাত দিনব্যাপী মেড ইন বাংলাদেশ উইক-২০২২ আয়োজন করেছে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। এতে সহায়তা করছে বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ (বিএই)। এর অংশ হিসেবে ঢাকায় আইএএফ বিশ্ব ফ্যাশন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। এ ছাড়া সোমবার দুপুরে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) অ্যাপারেল এক্সপো উদ্বোধন করা হয়।