মোস্তাফিজ উদ্দিন, প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ (বিএই)
ছবি: সংগৃহীত

প্রথম আলো: নেদারল্যান্ডসে বেস্ট অব বাংলাদেশ ইন ইউরোপ শীর্ষক সম্মেলন ও প্রদর্শনীতে আপনারা আসলে কী করতে চান?

মোস্তাফিজ উদ্দিন: ইউরোপ হচ্ছে আমাদের পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার। তবে অবাক হলেও সত্য, সেখানকার অধিকাংশ ব্যবসায়ী বাংলাদেশ সম্পর্কে জানেন না। যাঁরা জানেন, তাঁরাও কিন্তু সবটা জানেন না। আমরা মূলত তাঁদের কাছে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ পণ্যগুলো একসঙ্গে তুলে ধরতে চাই। তার পাশাপাশি আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অন্য বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হবে। সব মিলিয়ে আমরা আমাদের দেশটাকে ব্র্যান্ডিং করতে চাই। এই আয়োজনের মাধ্যমে ইউরোপের ব্যবসায়ীদের সামনে আমরা এক টুকরা বাংলাদেশকে তুলে ধরব।  

প্রথম আলো: বিদেশের বাজারে বাংলাদেশকে এভাবে তুলে ধরাটা সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখিনি। এই পরিকল্পনার পেছনের গল্পটা কী?

মোস্তাফিজ উদ্দিন: ব্যক্তিগতভাবে আমি দুই যুগ ধরে তৈরি পোশাক রপ্তানির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশের প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছি। সে সময় যখনই সুযোগ হতো, তখনই বিদেশি ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশের গল্প বলতাম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁরা আমার কথা বিশ্বাস করতেন না। রানা প্লাজা ধসের পর তো বাংলাদেশের কথা বললেই বিদেশি ক্রেতারা একটি কথাই বলতেন, ও বাংলাদেশ; তোমাদের দেশে তো রানা প্লাজা ধস হয়েছে। এই দুর্ঘটনার পর তৈরি পোশাক কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নে ব্যাপক কাজ হয়েছে। ফলে ধীরে ধীরে ক্রেতাদের মধ্যে আস্থা ফিরেছে। তারপরও রানা প্লাজা ধসের আগে কিংবা পরে, বিদেশি বড় প্রতিষ্ঠানের বড় কর্তাদের একটি অংশ কখনো বাংলাদেশে আসেননি। তাঁদের আমন্ত্রণ জানালে হেসে উড়িয়ে দিতেন। তাঁদের কাছে বাংলাদেশ মানেই যানজট, এটা-সেটা...। তো একটা সময় আমি বুঝে গেলাম, তাঁরা বাংলাদেশে আসবেন না। ব্যবসার জন্য বরাবরের মতো তাঁরা তাঁদের প্রতিনিধিদেরই পাঠাবেন। কিন্তু আমাদের দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য আরেক দফা উঁচুতে নিতে হলে বড় কর্তাদের সামনেই বাংলাদেশকে মেলে ধরতে হবে। একপর্যায়ে ভেতরে জেদ চেপে গেল। মনে মনে পরিকল্পনা করলাম, ইউরোপের ব্যবসায়ীদের সামনে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ জিনিসগুলো তুলে ধরব। তারপর ছয়-সাত বছর ধরে স্বপ্ন দেখেছি; একটু একটু করে পরিকল্পনা করেছি।

প্রথম আলো: ইউরোপের একটি দেশে এত বড় আয়োজন তো খুবই চ্যালেঞ্জের। আপনার সাহসের জায়গাটা কী? কারা সহযোগিতা করছে?

মোস্তাফিজ উদ্দিন: ব্যবসার পাশাপাশি বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের ভাবমূর্তি উন্নয়নে ২০১৪ সালে আমি বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ (বিএই) নামের অলাভজনক প্রতিষ্ঠান চালু করি। ওই বছর থেকেই আমরা ঢাকায় ‘বাংলাদেশ ডেনিম এক্সপো’ নামের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী শুরু করলাম। তা ছাড়া সাসটেইনেবল অ্যাপারেল ফোরাম আয়োজন করেছি আমরা। আমাদের দুটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীও এসেছেন। ফলে আমাদের আত্মবিশ্বাসের জায়গায় কোনো ঘাটতি ছিল না। দেড় বছর ধরে আমরা এই আয়োজন নিয়ে কাজ করছি। প্রথম দিকে আমরা একা থাকলেও পরে সহযোগী হিসেবে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং নেদারল্যান্ডসে বাংলাদেশ দূতাবাস।

নেদারল্যান্ডসে আমস্টারডামের গ্যাশউডার ওয়েস্টারগাস মিলনায়তনে বিএইর প্রতিষ্ঠাতা মোস্তাফিজ উদ্দিন। ৩ সেপ্টেম্বর
ছবি: সংগৃহীত

প্রথম আলো: দুই দিনের এই আয়োজনে কী কী থাকবে? আর ইউরোপের কোন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা তাতে অংশ নেবেন?

মোস্তাফিজ উদ্দিন: আমরা এই আয়োজনে বাংলাদেশের সামগ্রিক গল্প তুলে ধরতে চাই। একটি বা দুটি পণ্য নয়; আমরা তৈরি পোশাক, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হস্তশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি এবং নিত্যব্যবহার্য পণ্য বা এফএমসিজি—এই পাঁচ খাতের সেরা ৩২ কোম্পানিকে নিয়ে যাচ্ছি। প্রদর্শনীতে আগতদের ভিআর প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা সুন্দরবন ও কক্সবাজারের সৌন্দর্য দেখাব। পাশাপাশি আমাদের দেশের উন্নয়ন ও শিল্পের বিবর্তন ইত্যাদি তুলে ধরা হবে। বাংলাদেশের ওপর একটি চিত্রপ্রদর্শনী থাকবে। নাচ-গান পরিবেশন করবেন আমাদের দেশের শিল্পীরা। অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য গরম-গরম জিলাপি, কাচ্চি বিরিয়ানি, মিষ্টি, পায়েস ইত্যাদি থাকবে। তবে বেস্ট অব বাংলাদেশ আয়োজনটি সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। কারণ, এটি পুরোপুরি ব্যবসায়িক আয়োজন। অবশ্যই আয়োজনটির মাধ্যমে বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করা হবে। মূলত চার ধরনের ব্যবসায়ীরা এখানে আসবেন। ১. যাঁরা নতুন বিনিয়োগকারী, কিন্তু বাংলাদেশ সম্পর্কে জানেন না। ২. বাংলাদেশে প্রযুক্তি স্থানান্তরে আগ্রহী ব্যবসায়ীরা। ৩. অনিশ্চয়তার কারণে যেসব ব্যবসায়ী চীন থেকে তাঁদের ব্যবসা স্থানান্তর করতে চান। ৪. বর্তমানে যাঁরা বাংলাদেশে ব্যবসা করেন, তাঁরা। সব মিলিয়ে দুই দিনে ৬৫০ থেকে ৭০০ কোম্পানির প্রায় এক হাজার প্রতিনিধি আসবেন। নেদারল্যান্ডসে আয়োজনটি হলেও ইউরোপের সব দেশ থেকে ব্যবসায়ীরা আসবেন।

প্রথম আলো: রানা প্লাজা ধসের পর এক দশক ধরে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিংয়ের কথা জোরেশোরে আলোচনা হচ্ছে। তবে ব্র্যান্ডিং নিয়ে কাজ হয়েছে সামান্য। বেস্ট অব বাংলাদেশের মাধ্যমে আপনি ব্র্যান্ডিংয়ের কথা বলছেন। আসলে কাজটি কতটা চ্যালেঞ্জিং বলে মনে হয় আপনার কাছে?

মোস্তাফিজ উদ্দিন: খুবই চ্যালেঞ্জিং কাজ। প্রতিমুহূর্তে মানসিক চাপের মধ্যে থাকতে হয়। কারণ, একটি প্রদর্শনী যেনতেনভাবে যে কেউ করতে পারে। কিন্তু দেশের ব্র্যান্ডিং কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয়। দেশের ব্র্যান্ডিংয়ের কথা গত এক দশকে অনেকবার শুনেছি। যদিও কেউ একটা কাগজ ধরিয়ে বলেনি, এভাবে ব্র্যান্ডিংয়ের কাজ করো। আসলে আমাদের দেশে ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য ধৈর্য ও সময় ব্যয় করার ক্ষেত্রে ঘাটতি আছে। তবে আমি আমার কাজ চালিয়ে যাব। আগামী বছরও আমরা নেদারল্যান্ডসে বেস্ট অব বাংলাদেশ আয়োজন করব। পরে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি ভালো হলে যুক্তরাষ্ট্র, না হলে জাপানে আমরা এই আয়োজন করব। তবে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং নিয়ে আমরা যে উদ্যোগ নিয়েছি, সেটি প্রয়োজনের তুলনায় ১ শতাংশও নয়। এ জন্য সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। যারা যোঁগ্য, তাঁদের নিয়ে পরিকল্পিতভাবে ব্র্যান্ডিংয়ের কাজ করতে হবে। পাশাপাশি দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত করার মনোযোগ দেওয়ার উদ্যোগ লাগবে।