কাজ না থাকায় নিটিংশিল্পের মালিকেরা লোকসানে পড়েছেন। যে কারণে তাঁরা ব্যাংকের ঋণ, শ্রমিকের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, কারখানার ভাড়া বহন করতে পারছেন না। অনেকে তো ঋণগ্রস্ত হয়ে নিটিং মেশিন বিক্রি করেছেন।
মাহবুবুর রহমান, সভাপতি, বাংলাদেশ নিটিং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন

বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে নিবন্ধিত নিটিং কারখানার সংখ্যা ৭০০টি। তবে অনিবন্ধিতসহ সারা দেশে নিটিং কারখানার সংখ্যা আড়াই হাজারের বেশি। এর মধ্যে শুধু নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটীর বিসিক শিল্পনগরে তিন শতাধিক নিটিং কারখানা রয়েছে। এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দুই লক্ষাধিক মানুষ। একেকটি নিটিং কারখানায় বিনিয়োগের পরিমাণ দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা। স্পিনিং মিলে উৎপাদিত সুতা থেকে প্রতি কেজি গ্রে কাপড় বুনন করে নিটিং কারখানার মালিকেরা পান ১৮ থেকে ২০ টাকা। বাংলাদেশ নিটিং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেওএ) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এটি নিটিং কারখানার মালিকদের জাতীয় সংগঠন।

উদ্যোক্তারা জানান, ১০টি নিটিং মেশিনের একটি কারখানায় জনবল লাগে ২০ জন। এর মধ্যে মেশিন অপারেটর ৯ জন, লোডার ৫ জন এবং মাস্টার, ফিডারম্যান, সুপারভাইজার, চেকম্যান, মার্কেটিং ম্যানেজার ও নিরাপত্তা প্রহরী একজন করে। কাজ কমে যাওয়ায় কারখানাগুলোতে এখন ৪০–৫০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে।

জানতে চাইলে বিকেওএর সহসভাপতি রাকিবুল হাসান বলেন, ‘নিটিংশিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ ও অ্যাকসেসরিজের দাম অনেক বেড়েছে। বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন কমেছে। আবার উৎপাদন কমলেও খরচ কমেনি। বিদ্যুত ও গ্যাসের মূল্যের সঙ্গে মিলিয়ে চলতে পারছে না কারখানাগুলো। ফলে নিটিং কারখানার মালিকেরা লোকসানের মুখে পড়েছেন।’

বিসিক শিল্পনগরের লতিফ নিটিং মিলসে ছয় মাস আগেও প্রতিদিন তিন টন কাপড় বুনন হতো। তা কমে দেড় টনে নেমে এসেছে। কারখানাটির ব্যবস্থাপক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘কাজ কম থাকায় ১০টি নিটিং মেশিনের মধ্যে চারটি চলছে। উৎপাদন কমেছে ৪৫ শতাংশ। ছয়টি মেশিন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করতে হচ্ছে মালিককে।’ তিনি আরও বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে জেনারেটরে উৎপাদন কাজ চালাতে হচ্ছে। কিন্তু জ্বালানি তেলের দাম বেশি বলে জেনারেটরের খরচ বেড়েছে। এতে মালিককে লোকসান গুনতে হচ্ছে।’

একই এলাকার শিমু নিটওয়্যারসে সুতা থেকে কাপড় বুননের ১৪টি নিটিং মেশিনের মধ্যে বর্তমানে চালু আছে ৫টি। এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘অর্ডার না থাকায় উৎপাদন ৫৫ শতাংশ কমেছে। ফলে মাসে এক থেকে দেড় লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে।’

শাহ্ আলম নামে একটি বন্ধ কারখানার মালিক বলেন, ‘২০ বছর আগে বিদেশ থেকে এসে নিটিং কারখানা করেছিলাম। প্রতিবছর বিদ্যুৎ বিল ও শ্রমিকের মজুরিসহ অন্যান্য খরচ বেড়েছে। টানা লোকসানের কারণে চার মাস আগে মেশিন বিক্রি করে কারখানা বন্ধ করে দিয়েছি।’

প্রিন্স নিটিংয়ের মালিক মজিবর রহমানও তাঁর কারখানা বন্ধ করার কারণ হিসেবে অব্যাহত লোকসানের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘লোকসান দিয়ে তো আর কারখানা সচল রাখা যায় না।’

উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, নিটিং কারখানাগুলো গার্মেন্টসের মালিকদের সরবরাহ করা সুতা থেকে কাপড় বুনন করে। সেই গ্রে কাপড় আবার গার্মেন্টসে পাঠানো হয়। নিটিং মালিকদের কাপড় উৎপাদনের বিল নিয়মিত পরিশোধ করা হয় না। গার্মেন্টসের মালিকদের কাছে অধিকাংশ টাকা বকেয়া পড়ে থাকে। এটিও নিটিং কারখানার সংকটের আরেক কারণ।

মারিয়া নিটওয়্যারসের মালিক মজিবুর রহমান বলেন, ‘ব্যবসার অবস্থা খুবই খারাপ। গার্মেন্টস মালিকেরা ঠিকমতো বিল পরিশোধ করেন না।’ তিনি জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানের চার কোটি টাকার ব্যাংকঋণ রয়েছে। সংকটের কারণে নিয়মিত ব্যাংকের কিস্তি দিতে পারছেন না।

বাংলাদেশ নিটিং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘কাজ না থাকায় নিটিংশিল্পের মালিকেরা লোকসানে পড়েছেন। যে কারণে তাঁরা ব্যাংকের ঋণ, শ্রমিকের বেতন, বিদ্যুৎ বিল ও কারখানার ভাড়া বহন করতে পারছেন না। অনেকে তো ঋণগ্রস্ত হয়ে নিটিং মেশিন বিক্রি করেছেন।’ তিনি জানান, গত ছয় মাসে ৩০–৩৫টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে প্রায় ৭০০ শ্রমিক বেকার হয়ে গেছেন।

মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘অর্ডার স্বাভাবিক না হলে সংকট থেকে উত্তরণের কোনো উপায় নেই। এ ছাড়া শিল্পটিকে বাঁচাতে ব্যাংকঋণের সুদের হার কমাতে হবে। সংকটের পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দেওয়া উচিত সরকারের।’

এ ব্যাপারে বিকেএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মনসুর আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে সারা ইউরোপে তৈরির পোশাকের অর্ডার কমেছে। অর্থনৈতিকভাবে ইউরোপের লোকজনও রেশনিংয়ে চলছেন। তাই বায়াররা আগের দাম দিয়ে পণ্য নিতে চান না। তাঁরা দাম কমাতে গার্মেন্টসের মালিকদের সঙ্গে দর–কষাকষি করেন।

শিল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন