গ্যাস–বিদ্যুতের সংকটে কমছে নির্মাণসামগ্রীর উৎপাদন
দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে নির্মাণ খাত। বর্তমানে বিনিয়োগ ও চাহিদার টানাপোড়েন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট— এসব কারণে সংকটে পড়েছে এই খাত। নির্মাণে খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রথম আলোর এই বিশেষ আয়োজন।
এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা গ্যাস–বিদ্যুতের সংকটের কারণে রড, সিমেন্ট, সিরামিক টাইলস ও ইট, কাচসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে কিছু কোম্পানি বাজারে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না।
নির্মাণ খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত দুই বছরে নির্মাণ খাতের ব্যবসায় একধরনের মন্দা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে এক মাসের বেশি সময় ধরে গ্যাস–বিদ্যুতের তীব্র সংকট। এতে অনেক কারখানার উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমে গেছে। কিছু কারখানার উৎপাদন বন্ধও রাখতে হয়েছে। সংকট দীর্ঘ হওয়ার কারণে কোম্পানিগুলো আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
গত ২১ জুলাই তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে নিয়োজিত এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল অগ্নিদুর্ঘটনায় বন্ধ হয়ে যায়। তার পর থেকে দেশের শিল্পকারখানা তীব্র গ্যাস-সংকটে ভুগছে। মাঝে গ্যাস–সংকটে সামিটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়। ১৫ আগস্ট এক্সিলারেট আংশিকভাবে ও সামিট পুরোদমে চালু হয়। তবে সংকট পুরোপুরি কাটার আগেই আবার পরিস্থিতি খারাপ হয়। কার্গো সংকটের কারণে এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ আবার বন্ধ হয়। তিন দিন বন্ধ থাকার পর ২২ আগস্ট টার্মিনালটি চালু হয়। তার পর থেকে কিছু এলাকার শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে।
জানা যায়, গ্যাস–সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে টাইলস ও কাচশিল্প। তারপরেই রয়েছে রড ও সিমেন্ট। অন্যান্য নির্মাণ খাতেও কমবেশি প্রভাব পড়েছে মূলত লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ার কারণে।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) হিসাবে, দেশে ইস্পাত খাতে স্বয়ংক্রিয় কারখানা প্রায় ৪০টি। তার মধ্যে বড় ৪-৫টি। কারখানাগুলোয় বছরে এক কোটি টনের বেশি রড উৎপাদনের সক্ষমতা আছে। যদিও বার্ষিক চাহিদা ৬৫ থেকে ৭৫ লাখ টন। ফলে কারখানাগুলোর সক্ষমতার একটা অংশই এখনো অব্যবহৃত।
ঢাকার কোনাপাড়া এলাকার শাহরিয়ার স্টিল মিলসে দৈনিক ৩০০ থেকে ৪০০ টন রড উৎপাদনের সক্ষমতা আছে। তবে গ্যাস–সংকট ও লোডশেডিংয়ের কারণে তাদের উৎপাদন ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ নেমে গেছে।
জানতে চাইলে শাহরিয়ার স্টিল মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মাসাদুল আলম গত শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই বছর ধরে সরকারি উন্নয়ন কাজ থেমে যাওয়ায় রডের চাহিদা অর্ধেকে নেমেছিল। পরে সেটি আরও কমে যায়। চলতি অর্থবছরের বাজেটের পর শুল্ক–কর পরিবর্তন করায় রডের দাম বাড়ার আশঙ্কা ছিল। তবে বিক্রি কমে যাওয়ায় মালিকেরা দাম বাড়াননি। সামনে নির্মাণের মৌসুম আসছে। তখন চাহিদা কিছুটা বাড়বে। তার আগে কারখানাগুলোর উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব না হলে দাম বাড়তে পারে।
দেশের সিরামিক কারখানাগুলো গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও ভোলায় গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে ভোলা ও হবিগঞ্জের ৭–৮টি ছাড়া অন্য এলাকার কমবেশি সব সিরামিক কারখানা গ্যাস–সংকটে ভুগছে।
আকিজ সিরামিকস লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার (সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং) মোহাম্মদ আশরাফুল হক প্রথম আলোকে বলেন, জ্বালানিসংকটে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জ্বালানির চাপ কমে গেলে তখন পণ্যের মান ধরে রাখা কঠিন হয়। উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় থাকা পণ্য নষ্ট হচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় সক্ষমতার মাত্র ৩০ শতাংশ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে।
গাজীপুরের শ্রীপুরে অবস্থিত মীর সিরামিকসের কারখানার ৪টির মধ্যে ৩টি ইউনিটের উৎপাদন ১৭ দিন বন্ধ ছিল। গত সপ্তাহে একটি ইউনিট চালু হয়েছে। কারখানাটিতে দিনে তিন লাখ বর্গফুট টাইলস উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।
জানতে চাইলে মীর সিরামিকসের কারখানার কর্মকর্তা শহীদুজ্জামান গত রোববার প্রথম আলোকে বলেন, গ্যাসের যে চাপ পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে একটির বেশি ইউনিট চালানো যাচ্ছে না। এতে বাজারে চাহিদা অনুযায়ী টাইলস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। গত শুক্রবার রাতে তিনি জানালেন, ‘গ্যাসের চাপ কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় আমরা আরেকটি ইউনিট চালু করেছি। এতে উৎপাদন বেড়েছে।’
সিরামিক খাতের কয়েকজন উদ্যোক্তা জানালেন, চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় কারখানার সব ইউনিট চালানো যাচ্ছে না। ফলে বাজারে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে কারখানাগুলো ভয়াবহ আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়ে যাবে। আমদানিও বাড়তে পারে। তখন বাড়তি দামে টাইলস কিনতে হবে। সেটি হলে বাড়ি নির্মাণে খরচ বাড়বে।
রড ও সিরামিকের মতো সিমেন্ট উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে গ্যাস–বিদ্যুতের সংকট। বর্তমানে দেশে সিমেন্ট উৎপাদনে রয়েছে ৩৫ থেকে ৪০টি কোম্পানি। বছরে সিমেন্টের চাহিদা রয়েছে চার কোটি টনের। তবে উৎপাদনে থাকা সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে আট কোটি টনের, অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় দেশে সিমেন্টের উৎপাদন সক্ষমতা দ্বিগুণের বেশি। দেশে সিমেন্টের বাজার ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, সিমেন্ট কারখানার উৎপাদন এখন বেশ ব্যাহত হচ্ছে। কারখানা চালু রাখতে বিকল্প উপায়ে বাড়তি ব্যয়ে জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। সিমেন্ট কারখানায় গ্যাসের চাপ হঠাৎ কমায় যন্ত্রপাতি ক্ষতি হচ্ছে। বারবার জেনারেটর ব্যবহারের বিরূপ প্রভাব উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গণ–অভ্যুত্থানের পর থেকে সরকারের উন্নয়নকাজ কম হওয়ায় আগের চেয়ে সিমেন্ট, রড, সিরামিক গ্লাসসহ নির্মাণ উপকরণের চাহিদা কমেছে। এ কারণে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ায়নি কোম্পানিগুলো। কেবল প্রবাসী আয় ও গ্রামীণ অর্থনীতির ইতিবাচক অবস্থার কারণে বেচাকেনা কিছুটা হওয়ায় টিকে আছে নির্মাণ খাত—এমন তথ্য দিয়ে আমিরুল হক বলেন, বেসরকারি খাতের সঙ্গে সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রী সময় দিয়ে আলোচনা করছেন। অথচ প্রশাসনের দায়িত্বে যাঁরা, তাঁরা কথা বলছেন না। গ্যাস–বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে শিল্পমালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে রেশনিং পদ্ধিতে দিলে সব পর্যায়ে উৎপাদন সম্ভব হবে।