দুই যুগে আকিজ সিমেন্টের অগ্রযাত্রা
নির্মাণ প্রতিবেদক
বাংলাদেশের আকাশচুম্বী অট্টালিকা থেকে শুরু করে প্রমত্ত নদীর ওপর নির্মিত মেগা প্রকল্প—সবখানেই আস্থার সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘আকিজ সিমেন্ট’। ২০০২ সালে একবুক স্বপ্ন নিয়ে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজ ২০২৬ সালে পদার্পণ করল সাফল্যের ২৪ বছর বা দুই যুগে। গুণগত মানে আপসহীন থেকে আকিজ সিমেন্ট কেবল একটি ব্র্যান্ড নয়, বরং দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের এক অপরিহার্য অংশীদারে পরিণত হয়েছে।
স্বপ্নের শুরু ও প্রতিষ্ঠাতা–দর্শন
আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সেখ আকিজ উদ্দিনের ‘গুণগত মানই অগ্রাধিকার’—কালজয়ী এই নীতিকে ধারণ করেই আকিজ সিমেন্টের পথচলা শুরু। শুরুতে ২৪ একর জমির ওপর মাত্র ২০০ জন শ্রমিক নিয়ে যে কারখানার যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ সেখানে কাজ করছেন ৮৫০ জন নিয়মিত শ্রমিক। শ্রম আইন ও প্রবিধানের সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে শেখ জসিম উদ্দিনের নেতৃত্বে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সিমেন্ট ব্র্যান্ডে রূপ নিয়েছে।
প্রযুক্তির বিবর্তন: বল মিল থেকে সর্বাধুনিক ভিআরএম
আকিজ সিমেন্টের সাফল্যের মূলে রয়েছে প্রযুক্তির নিরন্তর আধুনিকায়ন। শুরুতে দুটি চায়নিজ বল মিল দিয়ে দৈনিক ৬০০ টন সিমেন্ট উৎপাদন শুরু হলেও ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো জার্মানির লোয়েশে কোম্পানির অত্যাধুনিক ভিআরএম (ভার্টিক্যাল রোলার মিল) প্রযুক্তি স্থাপন করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে ডেনমার্কের এফএলস্মিথ কোম্পানির আরও উন্নত ভিআরএম প্রযুক্তি যুক্ত হয়, যার উৎপাদনক্ষমতা ঘণ্টায় ২২০ টন। বর্তমানে বেলজিয়াম, ইতালি, জার্মানি ও চীনের উন্নত যন্ত্রপাতির সমন্বয়ে গঠিত দুটি প্রোডাকশন লাইন আকিজ সিমেন্টকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়।
প্রিমিয়াম মান ও বাজার অবস্থান
দেশের প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার সিমেন্ট বাজারে আকিজ সিমেন্ট নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে একটি ‘প্রিমিয়াম’ ব্র্যান্ড হিসেবে। সাধারণ ফ্লাই অ্যাশের পরিবর্তে আয়রন স্ল্যাগ ব্যবহারের ফলে এই সিমেন্টের স্থায়িত্ব ও গুণগত মান অনেক বেশি। আকিজ সিমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান বলেন, ‘আমরা শুধু পণ্য বিক্রি করি না, আমাদের নিজস্ব প্রোডাক্ট সার্ভিস টিম গ্রাহকদের বাড়ি নির্মাণের সঠিক পদ্ধতি ও উপকরণের মান যাচাইয়ে সহায়তা করে। বুয়েটের টেস্টিং ল্যাব ও আমাদের নিজস্ব ল্যাবে প্রতিটি ধাপে গুণগত মান নিশ্চিত করেই পণ্য বাজারজাত করা হয়।’
বর্তমানে প্রিমিয়াম সেগমেন্টের সিমেন্টবাজারে প্রায় ৩০ শতাংশ আকিজ সিমেন্টের দখলে রয়েছে।
পরিবেশ রক্ষা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
পরিবেশ সুরক্ষায় আকিজ সিমেন্ট এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। যেখানে সরকারিভাবে বায়ুমণ্ডলে ধূলিকণার অনুমোদিত মাত্রা ৪০০ পিপিএম, সেখানে আকিজ সিমেন্টের প্রথম লাইন ২৫ পিপিএম এবং দ্বিতীয় লাইন মাত্র ১৫ পিপিএম ধূলিকণা নিঃসরণ নিশ্চিত করে।
ভবিষ্যৎ লক্ষ্য: দেশ ছাড়িয়ে বিশ্ববাজারে
বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতেই আকিজ সিমেন্ট বদ্ধপরিকর। উন্নত কাঁচামাল (ক্লিংকার ও জিপসাম) আমদানির মাধ্যমে মান ধরে রেখে প্রতিষ্ঠানটি এখন আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের ভিশন নিয়ে কাজ করছে। দুই যুগের মাইলফলক স্পর্শ করার পর তাদের পরবর্তী লক্ষ্য উৎপাদনক্ষমতা আরও বাড়িয়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পতাকাবাহী ব্র্যান্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা।
আকিজ সিমেন্টের এই দুই যুগের পথচলা প্রমাণ করে, সততা, সঠিক প্রযুক্তি ও গুণগত মানের সমন্বয় থাকলে যেকোনো প্রতিকূলতা জয় করে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছানো সম্ভব। আধুনিক বাংলাদেশের বিনির্মাণে আকিজ সিমেন্ট এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম আস্থার প্রতীক হয়ে থাকবে—তারা এমন আশা করছে।