নুডলসের বাজার ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে
কর্মব্যস্ত জীবনযাত্রা, বদলে যাওয়া রুচি আর চটজলদি রান্নার সুবিধায় দেশে দ্রুত বাড়ছে প্যাকেটজাত, কাপ ও প্রিমিয়াম নুডলসের বাজার। প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বাজারে জনপ্রিয়তা নুডলসের বেশি।
আজ নুডলস দিবস। স্কুলের টিফিন বক্স, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের কক্ষ, কর্মব্যস্ত অফিসের ফাঁক কিংবা বাসার রান্নাঘর—সবখানেই এখন নুডলসের সহজ ও নিয়মিত উপস্থিতি। খুব অল্প সময়ে ঝটপট তৈরি করা যায় এবং পেটও ভরে সহজে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই মুখরোচক খাবার এখন দেশের সব বয়সী মানুষের প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসের অন্যতম প্রয়োজনীয় অংশ হয়ে উঠেছে। এই ব্যাপক চাহিদাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে দেশের বিশাল এক প্রক্রিয়াজাত খাদ্য খাত। এই পণ্যের বাজার এখন প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার।
বাড়ছে বাজারের আকার ও প্রবৃদ্ধি
আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান মর্ডর ইন্টেলিজেন্সের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ক্রমবর্ধমান চাহিদার ওপর ভর করে বাংলাদেশে নুডলসের বাজারের আকার ২০২৫ সালে ছিল ১০২ দশমিক ৮২ মিলিয়ন ডলার। প্রতিবছর ৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ গড় প্রবৃদ্ধি ধরে প্রতিষ্ঠানটির অনুমান, ২০২৬ সালে এই বাজারের আর্থিক আকার বেড়ে দাঁড়াবে ১১০ দশমিক ৩৭ মিলিয়ন ডলারে এবং ২০৩১ সালে তা পৌঁছাবে ১৫৭ দশমিক ২৮ মিলিয়ন ডলারে। স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মতে, পাঁচ বছর আগে ২০২১ সালে এ বাজারের আকার ছিল প্রায় এক হাজার কোটি টাকার। স্বাভাবিক সময় বার্ষিক ১০ শতাংশ হারে বাজার বড় হলেও করোনাকালে গৃহবন্দী মানুষের বাড়তি চাহিদায় প্রবৃদ্ধির হার ছাড়িয়েছিল ১৫ শতাংশের বেশি।
চাহিদার পেছনে যা
বর্তমানে দেশের দুই-পঞ্চমাংশের বেশি মানুষ শহরে বসবাস করছেন। তাঁদের দ্রুতগতির ও ব্যস্ত জীবনযাত্রায় স্ন্যাকস এবং ফাস্ট ফুডজাতীয় খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে প্রতিদিন। পরিবারে মা–বাবা দুজনই চাকরিজীবী হওয়ায় সন্তানের টিফিন দ্রুত প্রস্তুত করা কিংবা অফিস শেষে ঘরে ফিরে ক্লান্ত শরীরে ঝটপট মুখরোচক কিছু বানানোর সবচেয়ে সহজ সমাধান হিসেবে নুডলসের প্রসার ঘটছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব ও ভোক্তাদের দ্রুত বদলে যাওয়া খাদ্যাভ্যাস। সুপারমার্কেট, পাড়ার খুচরা দোকান ও অনলাইন চেইনশপগুলোতে এখন মিলছে বাহারি নুডলস। পাশাপাশি অফিসে বা যাতায়াতের পথে খাওয়ার উপযোগী কাপ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নুডলসের বিক্রিও বাড়ছে দ্রুতগতিতে।
প্রতিযোগিতা ও পুষ্টি সচেতনতা
ইনস্ট্যান্ট নুডলসের বাজারে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান নেস্লের ব্র্যান্ড ‘ম্যাগি’ এখনো এক-চতুর্থাংশ বাজার দখলে রেখেছে। তবে তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জোরালো প্রতিযোগিতা চালাচ্ছে দেশীয় ব্র্যান্ড প্রাণের মি. নুডলস, মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ, কোকোলা, স্কয়ারের চপস্টিক ও ইফাদের এগি। ২০২০ সালের দিকে মোট বিক্রি হওয়া নুডলসের প্রায় ৬০ শতাংশই ছিল সাধারণ ইনস্ট্যান্ট নুডলস। তবে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে এসে প্রাণ, স্কয়ার, ইফাদ ও ফ্রেশের মতো ব্র্যান্ডগুলো বাজারে নানা নতুন ও বৈচিত্র্যময় ফ্লেভার নিয়ে এসেছে।
এমজিআইয়ের চিফ মার্কেটিং অফিসার (সিএমও) কাজী মো. মহিউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশে নুডলসের বাজার বর্তমানে বেশ সম্ভাবনাময় এবং ক্রমবর্ধমান। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের ব্যস্ত জীবনযাত্রা, তরুণ প্রজন্ম ও পরিবারের মধ্যে দ্রুত ও সহজে প্রস্তুত করা খাবারের চাহিদা নুডলসের বাজারকে এগিয়ে নিচ্ছে। একই সঙ্গে ভোক্তারা এখন শুধু দাম নয়, স্বাদ, মান, নিরাপত্তা ও বৈচিত্র্যকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন।’
মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ ও রপ্তানি
বর্তমানে মূল্যস্ফীতির কারণে কাঁচামাল, প্যাকেজিং ও পরিবহনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সরবরাহ করা এ খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, অপচয় হ্রাস ও দক্ষ সরবরাহ শৃঙ্খলের মাধ্যমে খাবারের মান ও দামের ভারসাম্য বজায় রাখা হচ্ছে। দেশীয় বাজারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত নুডলসের চমৎকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে পাস্তা, স্পেগেটি, ম্যাকারনি ও নুডলস রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৩ কোটি ৮ লাখ ডলার, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ৩ কোটি ২৯ লাখ ডলার। বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় ভোক্তাদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে সাশ্রয়ী এশীয় খাবারের যে ব্যাপক কদর তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে সামনের দিনগুলোতে এ খাতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আরও অনেক দূর নিয়ে যাওয়া সম্ভব।