শ্রমিক আন্দোলনে বহিরাগত ইন্ধন নিয়ে সতর্ক সরকার

মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে পোশাকশ্রমিকেরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। গতকাল রোববার মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্ত্বরেছবি: সাজিদ হোসেন
প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন

পোশাক খাতের চলমান শ্রমিক আন্দোলনের বহিরাগতদের উসকানি বা ইন্ধনের বিষয়ে সতর্ক সরকার। এই আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও দলটির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কিছু পোশাকশিল্প মালিকেরা অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছেন বলে মনে করছে সরকার। এ জন্য দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পলাতক কিছু নেতার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। গতকাল সোমবার পোশাকশিল্প মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে এমনটাই জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

সচিবালয়ে আজ সকালে মালিকপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আর বিকেলে বৈঠক করেন পোশাকশিল্পের শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে। বৈঠক সূত্রে জানা যায়, মালিক ও শ্রমিকপক্ষের সঙ্গে বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এই আন্দোলনে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ করানো হচ্ছে। এ সময় পোশাকশিল্পের মালিকেরা বলেন, এ বিষয়ে কারও বিরুদ্ধে যদি সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

এদিকে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকার দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে আজ সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকার মিরপুর এলাকার প্রায় ছয় শতাধিক কারখানার কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। আন্দোলন অব্যাহত থাকলে আরও কিছু কারখানা বন্ধের আশঙ্কা করছেন মালিকেরা। এমনকি মালিকেরা কালকের (মঙ্গলবার) মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বুধবার থেকে ঘোষণা দিয়ে কারখানা বন্ধের বিষয়টিও বিবেচনা করছেন। মজুরি বোর্ড গঠনের পরও আন্দোলনের যৌক্তিকতা দেখছেন না শিল্পমালিকেরা। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক পোশাকশিল্প মালিকের সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য জানা গেছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিল্পমালিকদের জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২৪ ঘণ্টা নজরদারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সচিবালয়ে সকালে পোশাকশিল্পের মালিকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘একমুহূর্তের জন্যও কোনো কারখানা বন্ধ থাকুক, সরকার তা চায় না। আন্দোলনের নামে শ্রমিকস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে। প্রকৃত শ্রমিকেরা এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত নন। পোশাকশিল্পের মালিকেরা, যাঁরা আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, তাঁরাও অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে কাজ করেছেন। এর পেছনে সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রীও জড়িত।’

বৈঠকে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এবং বাংলাদেশ নিট পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম উপস্থিত ছিলেন। দুই বৈঠকেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং শ্রমিকনেতা ও সংসদ সদস্য শিমুল বিশ্বাস।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিযোগ, কিছু শিল্পমালিক উদ্দেশ্যমূলকভাবে কারখানা বন্ধ করেছেন। এসব মালিকের তালিকা দিতে মালিক সংগঠনগুলোর নেতাদের বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অস্থিরতা সৃষ্টিতে জড়িত শ্রমিকনেতা ও সংগঠনগুলোর নামের তালিকাও চাওয়া হয়েছে।

এদিকে বৈঠক সূত্রে জানা যায়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে শিল্পমালিকেরা বলেছেন, তাঁরা কারখানার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শ্রম আইন অনুযায়ী কারখানা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া তাঁদের সামনে কোনো পথ নেই। তাঁরা আশা করেন, সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনবে। তাতে তাঁদেরও কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে হবে না। এর আগে গত রোববার বিজিএমইএর জরুরি এক সভায় উপস্থিত কারখানামালিকেরা আন্দোলন না থামলে কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্তের কথা জানান।

প্রমাণ থাকলে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি

সূত্রগুলো জানায়, গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য যাঁরা পোশাক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাঁরা বিভিন্নভাবে দেশের বাইরে বসে অস্থিরতা তৈরি করছেন। আন্দোলনের ভেতর বহিরাগত ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশ করানো হচ্ছে। আওয়ামী লীগের অন্তত ৫০ নেতা–কর্মী এ অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা করছেন। এর মধ্যে সাবেক এক প্রতিমন্ত্রীর গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় একটি পোশাক কারখানা রয়েছে। সেখান থেকে শ্রমিকদের উসকানি দেওয়া হচ্ছে বলে জানানো হয়। সাভারের একজন সাবেক সংসদ সদস্যের নামও এসেছে, যিনি বিদেশে বসে শ্রমিকদের উসকানি দিচ্ছেন। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক এক মেয়রের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

তবে পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠনের নেতারা বলেন, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। এ সময় তাঁরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তিনটি বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন। এক. গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি; দুই. প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া; তিন. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা।

২৪ ঘণ্টা নজরদারি

পোশাক কারখানার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে পুলিশ সদর দপ্তরে একটি নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি ঠিক করা হয়েছে। মালিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও যোগাযোগের জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি থাকবেন। সেখান থেকে সুরক্ষা অ্যাপের মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা কোনো শিল্পকারখানা বন্ধ হোক, সেটা চাই না। চাই না একমুহূর্তের জন্যও বন্ধ হোক।’ তিনি জানান, প্রতি তিন বছর পর শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি রয়েছে। সরকার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল। মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের নামও পাওয়া গিয়েছিল। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলো নাম দিতে কয়েক দিন সময় নিয়েছিল। তাদের নাম পাওয়ার পরই মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়।

কারখানা চালাতে পারছেন না মালিকেরা

বৈঠক শেষে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের সঙ্গে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা কারখানা চালাচ্ছি না, এ কথা ঠিক নয়। আসল কথা হচ্ছে চালাতে পারছি না। আগামীকালও কারখানা চালু রাখার চেষ্টা করব। না পারলে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের পথে যেতে হবে।’

কারখানা চালু রাখতে না পারার কারণ জানতে চাইলে বিজিএমইএর সভাপতি বলেন, কারখানার সামনে মিছিল হচ্ছে, বাইরে থেকে কারখানায় ঢিল ছোড়া হচ্ছে। অথচ মজুরি বোর্ড গঠনের পর শ্রম অসন্তোষের কোনো কারণ নেই।

‘মজুরি বোর্ড গঠনে দেরি হয়েছে’

শ্রমিকনেতারা বলছেন, মজুরি বোর্ড গঠনে সরকারের দেরির কারণেই পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। বিকেলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে প্রথম আলোর কাছে এ মন্তব্য করেন ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন স্বপন। তিনি বলেন, ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠনের দাবিতে গত ১৯ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন শ্রমিকনেতারা। সেখানে ৪ অক্টোবর স্মারকলিপি দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। ঘোষণা অনুযায়ী, সেদিন স্মারকলিপিও দেওয়া হয়। এরপরও সরকার মজুরি বোর্ড গঠনে দেরি করেছে। তিনি বলেন, আরও আগে মজুরি বোর্ড গঠন করতে পারলে পরিস্থিতি এত খারাপ হতো না।

শ্রমিকদের শান্ত করতে এখন ঘন ঘন বৈঠক করে দ্রুত ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে আগামী জানুয়ারি থেকে নতুন মজুরি কার্যকরের ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান এই শ্রমিকনেতা।

এদিকে মজুরি বোর্ডের শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিরা দ্রুত মজুরি নির্ধারণের পাশাপাশি আটক ও গ্রেপ্তার শ্রমিকদের মুক্তি এবং মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। গতকাল শ্রম ভবনে সংবাদ সম্মেলনে বোর্ডের শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাবুল আখতার বলেন, ‘আমরা মজুরি বোর্ডে এমনভাবে কাজ করব, যাতে আগামী জানুয়ারি থেকে শ্রমিকেরা বাড়তি মজুরি হাতে পান। এ ক্ষেত্রে বিলম্ব হওয়ার কোনো কারণ নেই।’

বাবুল আখতার আরও বলেন, চলমান মজুরি আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কিছু শ্রমিক ও শ্রমিকনেতাকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। পাশাপাশি হয়রানিমূলক মামলা ও অন্যান্য ব্যবস্থা প্রত্যাহার করতে হবে।