চট্টগ্রাম চেম্বারের নির্বাচন নিয়ে আবারও জটিলতা

চট্টগ্রাম চেম্বারের লোগোছবি: চেম্বারের ফেসবুক থেকে

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) আগের নির্বাচনী তফসিল বাতিল করে নতুন তফসিল ঘোষণার নির্দেশ দিয়েছেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সালিসি আদালত। এতে চেম্বারটির নির্বাচন ঘিরে আবারও জটিলতা দেখা দিয়েছে। কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন তফসিল ঘোষণা করতে হবে ২০২৫ সালের বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালার আলোকে। চেম্বারের বর্তমান সংঘবিধির সঙ্গে যা সাংঘর্ষিক।

সম্প্রতি এফবিসিসিআইয়ের সালিসি আদালতের চেয়ারম্যান নাসরিন বেগমসহ তিন সদস্যের বেঞ্চ নতুন তফসিল ঘোষণার এ নির্দেশ দেন। তাতে বলা হয়, গত বছরের ১১ আগস্ট ঘোষিত তফসিল আইনগতভাবে সঠিক ছিল না, তাই সেটি বাতিল করা হয়েছে। এখন ‘বাণিজ্য সংগঠন আইন, ২০২২’ ও ‘বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা, ২০২৫’ অনুসরণ করে নতুন তফসিল ঘোষণা করতে হবে।

চেম্বার সূত্র জানায়, এ নিয়ে দুবার চট্টগ্রাম চেম্বারের নির্বাচন স্থগিত হয়েছে। পাল্টাপাল্টি রিটের এক পর্যায়ে গত ১২ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের চার সদস্যের পূর্ণাঙ্গ চেম্বার আদালতের পক্ষ থেকে ২৬ এপ্রিলের মধ্যে এফবিসিসিআইয়ের সালিসি আদালতকে চট্টগ্রাম চেম্বারের বিরোধ নিষ্পত্তি করে সিদ্ধান্ত দিতে বলা হয়। ওই আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এফবিসিসিআই ট্রাইব্যুনাল এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

চেম্বারের নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিধিমালা অনুযায়ী নির্বাচন করতে হলে এখন চেম্বারের সংঘবিধি সংশোধন করতে হবে। কিন্তু নির্বাচিত বোর্ড ছাড়া সেটি সম্ভব নয়। আবার বর্তমান সংঘবিধি অনুযায়ী নির্বাচন করতে গেলে বিধিমালা ও আইন লঙ্ঘনের শঙ্কা রয়েছে। ফলে আদালতের চূড়ান্ত রায় দেখার পর এ বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে হবে।

দীর্ঘ এক যুগ পর চট্টগ্রাম চেম্বারে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের আশা করেছিলেন ব্যবসায়ীরা। সর্বশেষ এই চেম্বারে ভোট হয়েছিল ২০১৩ সালে। এরপর সব কমিটি গঠিত হয় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। তাই বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চেম্বারের নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে দুটি প্যানেলও ঘোষণা করা হয়েছিল। নতুন তফসিল হলে আগের এসব প্রক্রিয়া বাদ হয়ে যাবে। তাই এফবিসিসিআইয়ের সালিসি আদালতের নির্দেশনার বিষয়ে আপিল বিভাগে শুনানির কথা রয়েছে।

বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সালিসি আদালত যে রায় দিয়েছেন, তাতে নির্বাচন আয়োজন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে এখন আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করতে হবে।
মনোয়ারা বেগম, নির্বাচনী বোর্ডের প্রধান, চট্টগ্রাম চেম্বার।  

বিধিমালা ও সংঘবিধিতে যা আছে

চট্টগ্রাম চেম্বারের সংঘবিধি অনুযায়ী, চেম্বারটিতে ব্যবসায়ীদের ভোটে সাধারণ শ্রেণি থেকে ১২ জন, সহযোগী শ্রেণি থেকে ৬ জন এবং টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ শ্রেণি থেকে ৩ জন করে ৬ জন পরিচালক নির্বাচিত হন। এভাবে ২৪ সদস্যের চেম্বারের পর্ষদ গঠিত হয়। পরে নির্বাচিত পরিচালকদের ভোটে একজন সভাপতি ও দুজন সহসভাপতি নির্বাচিত হন।

বাণিজ্য সংগঠন আইনের ১৬ ধারা অনুযায়ী, ফেডারেশন ছাড়া অন্য সব বাণিজ্য সংগঠনকে তাদের সংঘবিধি অনুসারে সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাহী কমিটি বা পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে। পাশাপাশি সদস্যদের বিভিন্ন শ্রেণিও নির্ধারণ করতে হবে।

অন্যদিকে বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালার ১৮ বিধি অনুযায়ী, সব বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাহী কমিটি বা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি, সহসভাপতি—যে নামেই থাকুক না কেন; অথবা পরিচালক বা নির্বাহী কমিটির সদস্যরা অন্য সদস্যদের সরাসরি ও গোপন ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন। অর্থাৎ এখানে ‘সরাসরি নির্বাচন’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

সালিসি আদালতে ব্যবসায়ীদের কয়েকজন অভিযোগ করেছিলেন ৪ সেপ্টেম্বরের চিঠির বিষয়ে। আদালতও সেটি নিষ্পত্তি করতে বলেছিলেন। তা না করে ট্রাইব্যুনাল নতুন তফসিল ঘোষণার নির্দেশ দিলেন। এ নির্দেশে নির্বাচন নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।
আমির হুমায়ূন মাহমুদ চৌধুরী, সাবেক সভাপতি, চট্টগ্রাম চেম্বার।  

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এখানেই সংঘবিধি ও নতুন বিধিমালার মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছে। একদিকে সংঘবিধি অনুযায়ী পরোক্ষ ভোটের বিধান রয়েছে, অন্যদিকে নতুন বিধিমালায় সরাসরি ও গোপন ভোটে সব পদে নির্বাচন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে কোন কাঠামো অনুসরণ করে নির্বাচন করা হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম চেম্বারের নির্বাচনী বোর্ডের প্রধান মনোয়ারা বেগম বলেন, এফবিসিসিআইয়ের সালিসি আদালত যে রায় দিয়েছেন, তাতে নির্বাচন আয়োজন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে এখন আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করতে হবে।

তিন ব্যবসায়ীর আবেদন খারিজ

চেম্বার সূত্র জানায়, নির্বাচনের আগে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের আটটি সংগঠনকে বাদ দিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় চট্টগ্রাম চেম্বার। পরে গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয় এই আট সংগঠনকে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেয়। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ বেলাল হাইকোর্টে রিট করেন। এফবিসিসিআইতেও অভিযোগ করেন তিনিসহ তিন ব্যবসায়ী।

রিটের ভিত্তিতে হাইকোর্ট দুই শ্রেণিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন পরিচালনার নির্দেশনা দিয়ে রুল জারি করেন। তফসিল অনুযায়ী ১ নভেম্বর ভোট হওয়ার কথা ছিল। পরে আপিলে আদালত দুই সপ্তাহের জন্য নির্বাচন স্থগিত করেন। এরপর ১১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট ছয়টি টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের ছয় প্রতিনিধিকে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেন। এ আদেশের বিরুদ্ধেও আপিল করেন মোহাম্মদ বেলাল।

চলতি বছরের ১২ মার্চ আপিল শুনানিতে আদালত এফবিসিসিআইয়ের সালিসি ট্রাইব্যুনালকে বিষয়টি নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। এরপর ২ এপ্রিল নির্বাচন স্থগিত করে চেম্বার প্রশাসন। ট্রাইব্যুনালে সম্প্রতি চেম্বারের সাবেক সহসভাপতি এস এম নুরুল হক এবং দুই সাধারণ সদস্য মোহাম্মদ বেলাল হোসেন ও মুহাম্মদ আজিজুল হকের অভিযোগের নিষ্পত্তি করা হয়। যদিও ট্রাইব্যুনাল তাঁদের অভিযোগ খারিজ করেছেন।

ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, আবেদনকারীরা সংশ্লিষ্ট গ্রুপ বা সমিতির সদস্য না হওয়ায় তাঁদের মামলা করার আইনগত অধিকার (লকাস স্ট্যান্ডি) নেই এবং তাঁরা সরাসরি কোনো স্বার্থ বা ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত নন। আবেদনগুলো নামঞ্জুর করা হলেও সাধারণ সদস্যদের স্বার্থ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য নতুন করে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নতুন তফসিলের ঘোষণার সিদ্ধান্তটি সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি করেছে বলে মনে করেন চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমির হুমায়ূন মাহমুদ চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সালিসি আদালতে ব্যবসায়ীদের কয়েকজন অভিযোগ করেছিলেন ৪ সেপ্টেম্বরের চিঠির বিষয়ে। আদালতও সেটি নিষ্পত্তি করতে বলেছিলেন। তা না করে ট্রাইব্যুনাল নতুন তফসিল ঘোষণার নির্দেশ দিলেন। এ নির্দেশে নির্বাচন নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।