সাক্ষাৎকার: মেজবাহ উদ্দিন মামুন

মোটরসাইকেলের বাজারকে চাঙা করবে প্রযুক্তি ও গ্রাহক আস্থা

দেশের মোটরসাইকেল শিল্পের বর্তমান অবস্থা, উচ্চ সিসির বাইকের সম্ভাবনা, বৈদ্যুতিক যানের ভবিষ্যৎ এবং স্থানীয় উৎপাদন পরিকল্পনা নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন বৈশ্বিক ব্র্যান্ড সিএফমটো বাংলাদেশে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নিউ গ্রামীণ মোটরস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মেজবাহ উদ্দিন মামুন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শামসুল হক মো. মিরাজ।  

প্রথম আলো:

মোটরসাইকেলের বর্তমান বাজার পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছেন এবং এটি মোকাবিলায় আপনাদের কৌশল কী?

মেজবাহ উদ্দিন মামুন: দেশের মোটরসাইকেল বাজার বর্তমানে একটি স্বাভাবিক অর্থনৈতিক সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপে বাজারে কিছুটা ধীরগতি দেখা গেলেও এটি সাময়িক পরিস্থিতি। সিএফমটো দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য গ্রাহকদের বিশ্বমানের প্রযুক্তি, পারফরম্যান্স ও নির্ভরযোগ্য বিক্রয়োত্তর সেবাদানের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করা।

বিশ্বের ১০০টির বেশি দেশে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সিএফমটোর বাংলাদেশে ডিলার নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, সেবা উন্নয়ন, যন্ত্রাংশের সহজলভ্যতা ও গ্রাহক অভিজ্ঞতা বাড়াতে গুরুত্ব দিচ্ছে। আমাদের বিশ্বাস, বাজারের ওঠানামা সাময়িক, কিন্তু শক্তিশালী ব্র্যান্ড আর গ্রাহকের আস্থা দীর্ঘ মেয়াদে সফলতার মূল ভিত্তি।

প্রথম আলো:

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আপনাদের বাইকগুলো ক্রেতাদের কাছ থেকে কেমন সাড়া পাচ্ছে?

মেজবাহ উদ্দিন মামুন: বর্তমান সময়ে গ্রাহকেরা অনেক বেশি সচেতন এবং তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তারা এখন শুধু মূল্য বা সিসি দেখছেন না; বরং প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা, ব্র্যান্ড ভ্যালু ও দীর্ঘমেয়াদি মালিকানার অভিজ্ঞতাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ জায়গায় সিএফমটো অত্যন্ত ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছে। কারণ, আমরা আন্তর্জাতিক প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম এমন প্রযুক্তি ও ফিচার অফার করছি।

আমাদের মোটরসাইকেলগুলোতে রয়েছে আধুনিক ডিজাইন, উন্নত ইলেকট্রনিকস সিস্টেম, এবিএস, ট্র্যাকশন কন্ট্রোল, টিএফটি ডিসপ্লে ও মানসম্মত ইঞ্জিনিয়ারিং। ফলে তরুণ, প্রযুক্তিপ্রেমী ও পারফরম্যান্স-সচেতন রাইডারদের মধ্যে ব্র্যান্ডটির গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। যাঁরা প্রিমিয়াম মোটরসাইকেল কিনতে চান, তাঁরা সিএফমটোকে একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।

প্রথম আলো:

জ্বালানিসংকটের সময়ে বাজারে আসা প্রিমিয়াম ইলেকট্রিক স্কুটার ব্র্যান্ড ‘জিহো’তে আপনাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রত্যাশা কতটুকু?

মেজবাহ উদ্দিন মামুন: বিশ্বব্যাপী অটোমোটিভ শিল্পের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ইলেকট্রিক মোবিলিটির পথে হাঁটছে। ভবিষ্যৎ স্মার্ট মোবিলিটি ভিশনের ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, স্মার্ট কানেকটিভিটি, উচ্চ পারফরম্যান্স ও প্রিমিয়াম ডিজাইনের সমন্বয়ে সিএফমটোর জিহো হবে নগর পরিবহনের নতুন সমাধান।

আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে দেশের শহরভিত্তিক দৈনন্দিন যাতায়াত, জ্বালানি ব্যয় সাশ্রয় ও পরিবেশগত সচেতনতায় টু-হুইলার শিল্পে ইভির গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। আমরা জিহোর মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ টেকসই মোবিলিটি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার যাত্রায় অংশ নিয়েছি।

প্রথম আলো:

বাড়তি ব্যয়ের চাপ ক্রেতাদের ওপর না ফেলে সিএফমটো কীভাবে পণ্যের দাম ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখছে?

মেজবাহ উদ্দিন মামুন: বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, লজিস্টিক ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওঠানামা অটোমোটিভ শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবু গ্রাহকদের জন্য সর্বোচ্চ মূল্য নিশ্চিত করতে চাই। সিএফমটোর অন্যতম শক্তি বৈশ্বিক উৎপাদন সক্ষমতা ও শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিক্রয়োত্তর সেবা, যন্ত্রাংশের সহজলভ্যতা, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও গ্রাহকের সন্তুষ্টি।

প্রথম আলো:

দেশে উচ্চ সিসির বাইকের আইনি অনুমোদনের সুবিধা কাজে লাগিয়ে সিএফমটো আগামীতে বাজারে কতটা বিস্তার করতে পারবে বলে মনে করেন?

মেজবাহ উদ্দিন মামুন: বাংলাদেশে ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেলের অনুমোদন এ শিল্পের জন্য একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। এটি দেশের রাইডারদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ও পারফরম্যান্সভিত্তিক মোটরসাইকেলের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। দেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামো যত উন্নত হবে, উচ্চ সিসির মোটরসাইকেলের চাহিদাও তত বাড়বে।

আধুনিক উচ্চ সিসির বাইকগুলোতে ডুয়েল-চ্যানেল এবিএস, ট্র্যাকশন কন্ট্রোল, কর্নারিং এবিএস, স্ট্যাবিলিটি কন্ট্রোল ও ক্রুজ কন্ট্রোলের মতো বিশ্বের সর্বাধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি সংযুক্ত থাকে। সিএফমটোর ১৫০ সিসি থেকে ১০০০ সিসিরও বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন বাইক আছে। সরকারের দূরদর্শী নীতির ধারাবাহিকতায় এই সিসি সীমা আরও সম্প্রসারিত হলে দেশে নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও প্রিমিয়াম মোটরসাইকেল বিকাশ আরও ত্বরান্বিত হবে।

প্রথম আলো:

উচ্চ আমদানি শুল্কের কারণে বাংলাদেশে গ্লোবাল ব্র্যান্ডের বাইকগুলোর দাম কিছুটা বেশি। দেশে সিএফমটোর বাইক সম্পূর্ণ সংযোজন বা স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

মেজবাহ উদ্দিন মামুন: দেশে বর্তমানে ১৬৫ সিসির ওপরে মোটরসাইকেল সিকেডি (সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায়) পদ্ধতিতে আমদানি ও স্থানীয়ভাবে সংযোজন করতে হয়। এই নীতিমালার আওতায় সিএফমটো ইতিমধ্যেই স্থানীয়ভাবে সংযোজন করছে। দেশের মোটরসাইকেল শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশে স্থানীয় সংযোজন ও উৎপাদনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষ মানবসম্পদ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।

বর্তমান সরকার বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। বৃহৎ পরিসরে স্থানীয় উৎপাদন সম্প্রসারণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে মোটরসাইকেল শিল্পের উন্নয়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। এতে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি আঞ্চলিক মোটরসাইকেল উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। উপযুক্ত নীতিসহায়তা ও বাজারের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আমরা ভবিষ্যতে স্থানীয় সংযোজন কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করতে এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে আগ্রহী।