সোনার দাম বিশ্ববাজারে কমেছে, দেশে কী কমবে
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে গত কয়েক দিনে বিশ্ববাজারে সোনার দামের পতন হয়েছে। সংঘাত প্রশমনের কিছুটা সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় গতকাল মঙ্গলবার সোনার দামে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরেছে। তারপরও ঈদের আগের চেয়ে বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম এখনো ৩০০ ডলার কম। বিশ্ববাজারে দাম নিম্নমুখী থাকলেও ঈদের ছুটির কারণে দেশের বাজারে সোনার দর সমন্বয় করেনি জুয়েলার্স সমিতি।
গতকাল সন্ধ্যা ছয়টায় এই প্রতিবেদন লেখার সময় বিশ্ববাজারে স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স (৩১.১০৩৪৭৬৮ গ্রাম) সোনার দাম ছিল ৪ হাজার ৪১৪ মার্কিন ডলার। এই দর গত সোমবারের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি। সোমবার বিশ্ববাজারে সোনার দাম একপর্যায়ে কমে ৪ হাজার ১০০ ডলারের নেমে গিয়েছিল, যা গত ১১ ডিসেম্বরের পর সর্বনিম্ন। তারপর ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা পাঁচ দিন স্থগিত করার ঘোষণা দিলে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ১৩ শতাংশ কমে যায়। তখন সোনার দাম বাড়তে থাকে।
ঈদের ছুটির কারণে আমরা সোনার দাম সমন্বয় করছি না। চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে আমরা সমন্বয় করব। বিশ্ববাজারে সোনার দরে নিম্নমুখী প্রবণতা থাকলে অবশ্যই দাম কমবে।
বৈশ্বিক গণমাধ্যম রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত প্রশমনের সম্ভাবনা এবং এর ফলে মূল্যস্ফীতি ও সুদের হারের ওপর প্রভাব—এই পরস্পরবিরোধী সংকেত মূল্যায়ন করছেন।
এ বিষয়ে ইউবিএসের বিশ্লেষক জিওভান্নি স্টাউনোভো বলেন, বাজারে বিনিয়োগকারীরা এখন অপেক্ষা ও দেখার অবস্থানে রয়েছেন। তেলের দাম কিছুটা কম থাকায় সুদের হার বৃদ্ধির প্রত্যাশা কিছুটা কমছে, যা আপাতত সোনার দামে স্থিতিশীলতা এনেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল দাম বেড়ে এরই মধ্যে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এতে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির উদ্বেগ বাড়ছে। এ ছাড়া সুদের হার বৃদ্ধির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে সোনার আকর্ষণ কমে গেছে। ফলে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সোনার দাম প্রায় ১৮ শতাংশ কমে গেছে।
বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা ক্রয় বৃদ্ধি ও বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ—সব মিলিয়ে সোনার দামে অনেক দিন ধরেই ঊর্ধ্বগতি ছিল। বিশ্ববাজারে সোনার দাম গত বছর ৭০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। গত জানুয়ারিতে স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৫ হাজার ৬০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।
গত সপ্তাহে আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে অর্থনীতিবিদ জেমস মিডওয়ে বলেছেন, সোনার দামে বড় পরিবর্তন ঘটতে হলে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ফেডারেল রিজার্ভ যদি স্পষ্টভাবে জানায় মূল্যস্ফীতির চাপ থাকা সত্ত্বেও সুদের হার কমানো হবে। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধ কত দিন স্থায়ী হয়—এই ধারণায় পরিবর্তন এলে।
দেশে দাম কি কমবে
দেশে গত বৃহস্পতিবার দুই দফায় সোনার দাম ভরিতে ১৫ হাজার ৩৩৮ টাকা কমায় বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি বা বাজুস। ওই দিন বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ছিল ৪ হাজার ৭৩২ ডলার। পরদিন ৪ হাজার ৫০০ ডলারের নিচে নামলেও ঈদের ছুটির কারণে দাম সমন্বয় করেনি সমিতি। শুক্রবার থেকে গতকাল পর্যন্ত বিশ্ববাজারে সোনার দাম কমেছে ৩০০ ডলার। শুধু ডলারের বিনিময় হার দিয়ে হিসাব করলে প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট সোনায় দাম কমার কথা প্রতি ভরি প্রায় ১০-১২ হাজার টাকা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা জানান, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ও ক্ষয়ক্ষতি বাড়তে থাকলে সোনা আবারও বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে দাম আবার প্রতি আউন্স ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এমনকি বছর শেষে ৬ হাজার ডলারেও পৌঁছে যেতে পারে। তবে সোনার দাম হ্রাস-বৃদ্ধিতে একধরনের অনিশ্চয়তা থাকে। সেটি বিবেচনায় রাখতেই হবে।
দেশে গত বছরের জানুয়ারিতে ২২ ক্যারেটে এক ভরি সোনার দাম ছিল প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। চলতি বছরের শুরুতে সেই দাম বেড়ে হয় ২ লাখ ২২ হাজার। গত ২৯ জানুয়ারি দাম বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। আর এখন বিক্রি হচ্ছে প্রতি ভরি ২ লাখ ৪৬ হাজার ৯২৬ টাকা। তার মানে উত্থান-পতনের পরও এক বছর তিন মাস আগে কেনা প্রতি ভরি সোনার অলংকারের সম্পদমূল্য ১ লাখ টাকা বেশি।
বিশ্ববাজারে সোনার দাম কমলেও দেশে কমছে না কেন—জানতে চাইলে বাজুসের দাম নির্ধারণ কমিটির চেয়ারম্যান দেওয়ান আমিনুল ইসলাম গত সোমবার দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঈদের ছুটির কারণে আমরা সোনার দাম সমন্বয় করছি না। চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে আমরা সমন্বয় করব। বিশ্ববাজারে সোনার দরে নিম্নমুখী প্রবণতা থাকলে অবশ্যই দাম কমবে। কারণ আমরা ব্যবসায়ী ও ক্রেতা—উভয়ের স্বার্থই বিবেচনায় নিই।’