দেশে বছরে ১২ লাখ স্মার্টফোন বিক্রি হয়, ২৪ হাজার কোটি টাকার বাজার

অবৈধ ফোনের দাপট ও শুল্ক বাধার কারণে দেশি স্মার্টফোন শিল্প সংকটে পড়েছে বলে দাবি এমআইওবির।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইওবি) নেতারাছবি: এমআইওবি

দেশে মোবাইল ফোনের বাজারে এখন একধরনের বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় কারখানায় বিশ্বমানের স্মার্টফোন তৈরির সক্ষমতা বাড়লেও উচ্চ করহার ও অবৈধ ফোনের দাপটে বৈধ ফোনের ব্যবসা টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ছে। দেশে বছরে স্মার্টফোন বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১২ লাখ ইউনিট, মাসিক গড়ে ১ লাখের মতো। এর বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে ‘গ্রে মার্কেট’ বা অবৈধ আমদানির দখলে।

আজ মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এমআইওবি) এই চিত্র তুলে ধরেছে। সংগঠনটি জানায়, অবৈধ ফোনের বাজার নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে দেশীয় কারখানায় বিনিয়োগ করা প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ঝুঁকির মুখে পড়বে। উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) বা আইএমইআই ডেটাবেজ–ব্যবস্থা কঠোরভাবে বাস্তবায়িত না হলে এই খাত বড় সংকটে পড়তে পারে।

এমআইওবির তথ্য অনুযায়ী, দেশের বাজারে বৈধ স্মার্টফোনের গড় দাম ১৪ হাজার টাকা। বিপরীতে অবৈধ পথে আসা ফোনের গড় দাম প্রায় ৫০ হাজার টাকা। সাধারণত দামি ফোনই অবৈধ পথে বেশি আসে, যা মোট ব্যবহৃত ফোনের ২০ শতাংশের মতো। তবে বাজারমূল্যে তা ৪১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। সব মিলিয়ে ১২ লাখ ফোনের বাজারমূল্য প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈধভাবে বিক্রি হওয়া ১০ লাখ ফোনের দাম ১৪ হাজার কোটি টাকা, আর অবৈধভাবে বিক্রি হওয়া ২ লাখ ফোনের বাজারমূল্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।

অবৈধ ফোনের প্রতিটির গড় দাম ৫০ হাজার টাকা বৈধ ফোনের প্রতিটির গড় দাম ১৪ হাজার টাকা ২ লাখ ফোনের অবৈধ বাজার ১০ হাজার কোটি টাকা ১০ লাখ ফোনের বৈধ বাজার ১৪ হাজার কোটি টাকা

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বিশেষ করে ৩০ হাজার টাকার বেশি দামের প্রিমিয়াম স্মার্টফোনগুলোর প্রায় সবই কর ফাঁকি দিয়ে দেশে প্রবেশ করে। এর ফলে সরকার বছরে অন্তত ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এনইআইআর ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে। এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে চুরি হওয়া বা অবৈধ ফোন শনাক্ত করা সহজ হবে।

এমআইওবি সভাপতি জাকারিয়া শহীদ বলেন, এনইআইআর পুরোপুরি কার্যকর হলে চলতি ২০২৬ সাল থেকেই সরকার বছরে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব পেতে পারে। একই সঙ্গে পাচার হওয়া ১০ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা দেশে থেকে যাবে।

উদ্যোক্তারা জানান, বর্তমানে ফোন আমদানিতে প্রায় ৫৭ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয়। এটি কমিয়ে ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনা গেলে এবং এনইআইআর কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হলে বৈধ ফোনের দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমতে পারে।

বাজারে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম বাড়ানোর অভিযোগ নাকচ করেছে এমআইওবি। সংগঠনটির দাবি, দেশে বর্তমানে ১৮টি কারখানায় মোবাইল ফোন উৎপাদন হচ্ছে এবং কোনো একটি ব্র্যান্ডের একচেটিয়া আধিপত্য নেই। তবে এসব কারখানা তাদের মোট সক্ষমতার মাত্র ৬০ শতাংশ ব্যবহার করছে। উৎপাদন বাড়লে খরচ কমবে এবং গ্রাহকেরাও কম দামে ফোন পাবেন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, স্যামসাং, শাওমি, ভিভো, অপো ও রিয়েলমির মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের ফোন এখন বাংলাদেশেই তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ ব্র্যান্ডের ফোন দেশীয় কারখানায় উৎপাদিত হয়। এই খাত থেকে সরকার বছরে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব পাচ্ছে।

উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য, ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে বার্ষিক স্মার্টফোন বিক্রি ২০ লাখে উন্নীত করা। তখন এই খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় ১৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। বর্তমানে দেশে স্মার্টফোন উৎপাদনে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত স্থানীয় মূল্য সংযোজন হচ্ছে। এ শিল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন ৫০ হাজারের বেশি মানুষ, যাঁদের প্রায় ৩০ শতাংশ নারী।