খসড়া পোলট্রি নীতিমালা
এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চা আমদানি নিষিদ্ধের প্রস্তাবে খামারিদের আপত্তি
এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চা আমদানি নিষিদ্ধের প্রস্তাব।
প্যারেন্ট স্টক বা ডিম দেওয়া মুরগি আমদানিতে শর্তারোপ।
দেশের পোলট্রি খাতের উন্নয়নে নতুন নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত করেছে সরকার। প্রস্তাবিত নীতিমালায় এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চা আমদানি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে প্যারেন্ট স্টক—অর্থাৎ বাচ্চা উৎপাদনে ডিম দেওয়া মুরগি আমদানিতেও শর্তারোপের কথা বলা হয়েছে।
এদিকে খসড়া নীতিমালা নিয়ে ইতিমধ্যে আপত্তি উঠেছে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, এক দিন বয়সী বাচ্চা আমদানি পুরোপুরি নিষিদ্ধ হলে বাজারে একচেটিয়া বলয় তৈরি হতে পারে। তাঁরা প্যারেন্ট স্টক আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাব নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) যুগ্ম মহাসচিব অঞ্জন মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষণার পর কোনো সংকটে আমদানির প্রয়োজন দেখা দিলে নীতিমালা সংশোধনের প্রয়োজন পড়বে, যা সময়সাপেক্ষ। একই সঙ্গে প্যারেন্ট স্টক (পিএস) আমদানিতেও বাধার মুখে পড়তে হবে। কারণ, মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স থেকে গ্র্যান্ড প্যারেন্ট স্টক বা দাদা–দাদি আনার সক্ষমতা রাখে। ফলে সেসব প্রতিষ্ঠান থেকেই হ্যাচারিগুলোকে পিএস সংগ্রহ করতে হবে। আবার খামারিদেরও বাধ্য হয়ে হ্যাচারি থেকে বেশি দামে বাচ্চা কিনতে হবে।
অনুমোদনের জন্য খসড়া নীতিমালাটি শিগগিরই অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে উত্থাপনের কথা রয়েছে। খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, ‘বাণিজ্যিক পোলট্রি পালনের জন্য এক দিন বয়সী বাচ্চা আমদানি করা যাবে না। কেবল এক দিন বয়সী গ্র্যান্ড প্যারেন্ট স্টক এবং দেশে এক দিন বয়সী বাচ্চার সংকট দেখা দিলে ক্ষেত্রবিশেষে প্যারেন্ট স্টক আমদানি করা যাবে।’
মতামত গ্রহণের জন্য নীতিমালার খসড়াটি এখন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে।
‘জাতীয় পোলট্রি উন্নয়ন নীতিমালা ২০২৬’ নামের নতুন এই নীতিমালার ওপর খসড়া মতামত গ্রহণের জন্য তা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, সরকার আমদানিনির্ভরতা কমানোর কথা বললেও প্রস্তাবিত নীতিমালাটি ভোক্তা ও খামারিদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করতে পারে। কারণ, বাচ্চা উৎপাদন ও প্যারেন্ট স্টক সরবরাহের সক্ষমতা বর্তমানে গুটিকয় প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত। এতে এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা আরও বেড়ে যেতে পারে।
ইতিমধ্যে প্রস্তাবিত নীতিমালার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আলোচনার সুযোগ চেয়ে ১৫ জানুয়ারি সরকারকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিআইএ)। এদিকে বিপিআইএ গতকাল বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছে, নতুন নীতিমালা ‘গভীর ফাঁদে’ পরিণত হতে পারে।
প্রাণিসম্পদ–সচিবকে লেখা চিঠিতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, আমদানির সুযোগ না থাকলে মুষ্টিমেয় কয়েকটি ফার্মের হাতে বিষয়টি একচেটিয়াভাবে চলে যেতে পারে।
সংগঠনটির হিসাবে, গত ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ব্রয়লারের মোট প্যারেন্ট স্টক আমদানি হয়েছে প্রায় ৫ লাখ ২০ হাজারটি। একই সময়ে গ্র্যান্ড প্যারেন্ট স্টক আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজারটি। বর্তমানে একটি প্যারেন্ট স্টক মুরগির দাম ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা। ইউনিভার্সেল হ্যাচারির মালিক এম এ কাদের জানান, এই দাম বড়জোর ১০০ থেকে ১২০ টাকা হওয়া উচিত। প্যারেন্ট স্টক আমদানি কঠিন হলে দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, আমদানি পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে সীমিত করা যেতে পারে। কারণ বার্ড ফ্লুর মতো সমস্যা দেখা দিলে আমদানির প্রয়োজন হতে পারে। তা ছাড়া প্রয়োজনে ডিমও আমদানি করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, খাদ্যনিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের দিক থেকে পোলট্রি খাত একটি বিশাল শিল্পে পরিণত হয়েছে। তাই নতুন কোনো নীতিমালা করতে হলে সব অংশীজনের অংশগ্রহণে গণশুনানি হওয়া উচিত।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবু সুফিয়ান বলেন, আমদানির বিষয়ে ব্যবসায়ীদের আপত্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। দেখা যাক, কী হয়।
ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি সপ্তাহে ব্রয়লার মুরগির বাচ্চার চাহিদা প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ। সোনালি ও রঙিন জাতের বাচ্চার চাহিদা সপ্তাহে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ। কোনো কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলে বাচ্চা সরবরাহে সংকটের আশঙ্কা থাকে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, আমদানিনির্ভরতা কমাতে হলে হঠাৎ করে বন্ধ না করে বিকল্প ব্যবস্থা কী হবে, সেটি ভাবা এবং অংশীজনদের মতামত নেওয়া জরুরি।
২০২৪ সালেও এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চার দাম সর্বোচ্চ ৯০ থেকে ১০০ টাকায় উঠেছিল। দেশে বর্তমানে তালিকাভুক্ত হ্যাচারি রয়েছে ৫০টির বেশি। সরকারি মুরগির খামার রয়েছে ২৮টি, এর মধ্যে ১৫টি খামারে বাচ্চা উৎপাদন করা হয়। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এসব খামার থেকে মোট বাচ্চা উৎপাদন হয়েছিল মাত্র ৩৮ লাখ।
কিশোরগঞ্জের গ্রিন ফার্ম মাসে ১১ লাখ ডিম উৎপাদন করে। প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার মনিরুজ্জামান পাভেল প্রথম আলোকে বলেন, এখন অনেক প্রতিষ্ঠান আমদানি করায় বাজারে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ আছে। কিন্তু ১০০ জনের স্থলে যদি ৫ জন মাত্র আমদানি করে, তখন বাচ্চা সরবরাহে সংকট দেখা দেবে। এতে দাম বাড়বে।