রপ্তানি কমছে, দুশ্চিন্তা বাড়ছে

চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ইয়ার্ডের চিত্রফাইল ছবি

প্রবাসী আয় ও পণ্য রপ্তানির প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে ২০২৪–২৫ অর্থবছরের শেষ দিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুই উৎসের একটি প্রবাসী আয় চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরেও প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। তবে অন্য উৎস পণ্য রপ্তানি নেতিবাচক ধারায় চলে গেছে। পাঁচ মাস ধরেই তা কমছে।

সদ্য সমাপ্ত ডিসেম্বরে পণ্য রপ্তানি কমেছে ১৪ শতাংশ, যা গত দেড় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পতন। এ মাসে রপ্তানি হয়েছে ৩৯৭ কোটি ডলারের পণ্য। আগের অর্থবছরের একই মাসে রপ্তানি হয়েছিল ৪৬২ কোটি ডলারের পণ্য।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) অবশ্য গতকাল বৃহস্পতিবার পণ্য রপ্তানির তথ্য প্রকাশ করেনি। সাধারণত ইপিবি এনবিআর থেকে রপ্তানির প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করে।

কাস্টমসের শুল্কায়ন সম্পন্ন হওয়ার পর পণ্য রপ্তানি হয়। রপ্তানি পণ্যের সব প্রক্রিয়া শেষ হলে তা এনবিআরের তথ্যভান্ডারে নথিভুক্ত হয়। এনবিআরের তথ্যভান্ডারে স্থানীয় রপ্তানি (দেশের অভ্যন্তরে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল ও সরঞ্জাম সরবরাহ), নমুনা রপ্তানি এবং প্রকৃত রপ্তানি—এই তিন ধরনের হিসাব অন্তর্ভুক্ত থাকে।

টানা পাঁচ মাস রপ্তানি কমে যাওয়াকে দুশ্চিন্তার বলে মনে করছেন বিভিন্ন খাতের রপ্তানিকারকেরা। তাঁদের মতে, পাল্টা শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিক্রি কমেছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশটি থেকে ক্রয়াদেশ আসছে না। অন্যদিকে চীন ও ভারতের ওপর বেশি হারে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা শুল্ক আরোপ করায় ওই দুই দেশের উদ্যোক্তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ক্রেতাদের কম দামে পণ্য অফার করছেন। এতে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন।

বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ফলে এই খাতের রপ্তানি কমলে সামগ্রিক রপ্তানিতেও প্রভাব পড়ে। গত আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত টানা চার মাস তৈরি পোশাকের রপ্তানি কমেছে। ইপিবি গত মাসের হিসাব প্রকাশ না করায় ডিসেম্বরের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

ভারত সরকার মার্কিন পাল্টা শুল্কের প্রভাব থেকে নিজেদের রপ্তানি খাতের সুরক্ষায় সাড়ে চার হাজার কোটি রুপির সহায়তা ঘোষণা করেছে। অথচ বাংলাদেশ উল্টো পথে হাঁটছে। যেসব সুযোগ-সুবিধা ছিল, সেগুলোও এলডিসি ও আইএমএফের ভয়ে তুলে নেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রতিযোগীরা এগিয়ে যাচ্ছে, আর আমরা পিছিয়ে পড়ছি
মোহাম্মদ হাতেম, সভাপতি, বিকেএমইএ

ব্যাংক থেকে আগের মতো সহযোগিতা না পাওয়ায় অনেক কারখানা সরাসরি রপ্তানি করতে পারছে না বলে জানান নারায়ণগঞ্জের প্লামি ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল হক। তিনি গতকাল বলেন, বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে নিয়মের মধ্যে থেকেই প্রকৃত ব্যবসায়ীদের সহায়তা করতে হবে। তা না হলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থার সংকট তৈরি হবে।

রেমিট্যান্স বাড়ছে

বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ২৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩৩ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে এসেছে ১ হাজার ৬২৬ কোটি ডলারের প্রবাসী আয়, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেশি।

গত অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৪ হাজার ৮২৮ কোটি ডলারের, যা তার আগের অর্থবছরের তুলনায় সাড়ে ৮ শতাংশ বেশি। তবে ইপিবি ও এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে পণ্য রপ্তানি হয়েছে ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ২ হাজার ৪৫২ কোটি ডলারের তুলনায় ২ শতাংশ কম।

চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পণ্য রপ্তানি হয় ৪৭৭ কোটি ডলারের পণ্য, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। তবে আগস্টে রপ্তানি ৩ শতাংশ কমে ৩৯২ কোটি ডলারে নামে, যা আগের অর্থবছরের একই মাসে ছিল ৪০৩ কোটি ডলার।

সেপ্টেম্বর মাসে রপ্তানি আরও কমে ৩৬৩ কোটি ডলার হয়, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৪ দশমিক ৬১ শতাংশ কম। অক্টোবর ও নভেম্বরে যথাক্রমে ৩৮২ কোটি ও ৩৮৯ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই দুই মাসে রপ্তানি কমেছে যথাক্রমে ৭ শতাংশ ও সাড়ে ৫ শতাংশ।

জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বর্তমান অস্থির বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে প্রতিযোগী দেশগুলোর সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিচ্ছে। যেমন ভারত সরকার মার্কিন পাল্টা শুল্কের প্রভাব থেকে নিজেদের রপ্তানি খাতের সুরক্ষায় সাড়ে চার হাজার কোটি রুপির সহায়তা ঘোষণা করেছে। অথচ বাংলাদেশ উল্টো পথে হাঁটছে। যেসব সুযোগ-সুবিধা ছিল, সেগুলোও এলডিসি ও আইএমএফের ভয়ে তুলে নেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রতিযোগীরা এগিয়ে যাচ্ছে, আর আমরা পিছিয়ে পড়ছি।’