নিরাপত্তায় চাই মানসম্মত কেব্ল
একটি ভবনের স্থায়িত্ব শুধু ইট-সিমেন্টের ওপর নির্ভর করে না; বরং ভবনের ভেতরে বহমান বিদ্যুৎ-সংযোগ কতটা নিরাপদ, তার ওপরই নির্ভর করে জনমালের সুরক্ষা। নিম্নমানের বৈদ্যুতিক তার বা কেব্ল ব্যবহারের ফলে সৃষ্টি হওয়া বৈদ্যুতিক গোলযোগ কেবল যান্ত্রিক বিড়ম্বনাই বাড়ায় না; বরং অকালে কেড়ে নিচ্ছে শত শত প্রাণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈদ্যুতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এখন আর আপস করার সুযোগ নেই; নিরাপদ আগামী গড়তে প্রয়োজন উচ্চ বিদ্যুৎ পরিবাহী এবং মানসম্মত বিশেষায়িত কেব্ল।
পরিসংখ্যানের ভয়ংকর চিত্র
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাম্প্রতিক তথ্য এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। গত এক বছরে দেশে যে ২৬ হাজার ৬৫৯টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, তার মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ৬৯টি; অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশ দুর্ঘটনার মূল কারণ ছিল বৈদ্যুতিক গোলযোগ। এই অগ্নিদুর্ঘটনাগুলোতে কেবল প্রাণহানিই ঘটেনি; বরং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮০ কোটি টাকায়। নিম্নমানের কেব্ল ব্যবহারের কারণেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়, যা মুহূর্তেই পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে।
অগ্নিপ্রতিরোধক কেবলের গুরুত্ব
অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমাতে বর্তমানে আধুনিক ‘মাল্টি-স্টেজ ইঞ্জিনিয়ারিং প্রসেস’ পদ্ধতিতে তৈরি অগ্নিপ্রতিরোধক কেব্ল ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এসব কেব্ল ব্যবহৃত হয় ‘ফ্লেম রিটার্ডেন্ট’ পিভিসি। এর বিশেষত্ব হলো, কোনো কারণে আগুন লাগলেও এই কেব্ল নিজে নিজে নিভে যায় এবং বিষাক্ত গ্যাস ও ধোঁয়া খুবই কম নির্গত করে। ফলে অগ্নিকাণ্ডের সময় নিশ্বাস বন্ধ হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক কমে আসে।
কপার বনাম অ্যালুমিনিয়াম কেব্ল
বাজারে প্রধানত দুই ধরনের কেব্ল দেখা যায়—তামা বা কপারের তৈরি এবং অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি। কপারের কন্ডাক্টিভিটি বা পরিবাহী ক্ষমতা অ্যালুমিনিয়ামের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি। এটি কম প্রতিরোধে বেশি কারেন্ট বহন করতে পারে, ফলে দীর্ঘ মেয়াদে ‘অক্সিডেশন’ বা ক্ষয় কম হয়। অন্যদিকে অ্যালুমিনিয়াম তার তুলনামূলক হালকা ও সস্তা হওয়ায় সাধারণত সরবরাহ লাইনের মৌলিক পরিষেবায় ব্যবহৃত হয়। তবে অভ্যন্তরীণ ওয়্যারিংয়ের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা তামার তার ব্যবহারের ওপরই বেশি জোর দিচ্ছেন।
শর্টসার্কিট ও নকল কেবলের ঝুঁকি
আরএফএল গ্রুপের (বিজলি কেবলস) বিপণনপ্রধান রিয়াজুল করিম খান বলেন, ‘উন্নত মানের কেব্ল শর্টসার্কিটের ঝুঁকি তিন স্তরে নিয়ন্ত্রণ করে—ডিজাইন, ম্যাটেরিয়াল ও পারফরম্যান্স। এর ফলে ইনসুলেশন অতিরিক্ত উত্তপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা পায়।
নকল কেব্ল চেনার উপায় সম্পর্কে রিয়াজুল করিম খান জানান, নকল কেব্ল সাধারণত ওজনে হালকা হয় এবং এর কন্ডাক্টর নির্ধারিত গেজের তুলনায় পাতলা থাকে। আসল কেবলে ব্র্যান্ডের নাম, বিএসটিআই সনদ নম্বর এবং মার্কিং অত্যন্ত স্পষ্ট ও স্থায়ী থাকে। যদি এই তথ্যগুলো অস্পষ্ট বা ঘোলাটে হয়, তবে সেটি নকল হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি স্থপতি আবু সাঈদ এম আহমেদ ভবনের নিরাপত্তাকে একটি যন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘বিল্ডিংকে যদি আমরা একটি মেশিন হিসেবে দেখি, তবে কেব্ল হলো তার অপরিহার্য অংশ। একটি বিয়ারিং ছাড়াও যেমন মেশিন চলে না, তেমনি ভবনের পুরো সিস্টেম দাঁড়িয়ে থাকে কেবেলের ওপর। বাজারে প্রচুর নকল পণ্য আছে, তাই নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রাহককে অবশ্যই মান যাচাই করে কিনতে হবে।’
সমাধানের পথ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট সমাধানে বিএসটিআই ও আইএসও মান নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। তামার বিশুদ্ধতা, কন্ডাক্টরের সঠিক বিন্যাস এবং ইনসুলেশনের ইউনিফর্ম পুরুত্ব নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বিএসটিআইয়ের মাধ্যমে কন্ডাক্টরের প্রতিরোধক্ষমতা এবং হাই ভোল্টেজে তারের সক্ষমতা কঠোরভাবে তদারকি করা হলে বাজারে নিম্নমানের তারের দৌরাত্ম্য কমবে।
একটি মানসম্মত বৈদ্যুতিক তার শুধু একটি নির্মাণসামগ্রী নয়, এটি একটি পরিবারের আজীবনের নিরাপত্তা। তাই সামান্য খরচ বাঁচাতে গিয়ে নিম্নমানের কেব্ল ব্যবহার করে নিজের ঘরকে মৃত্যুফাঁদে পরিণত না করাই বুদ্ধিমানের কাজ।