মনোনীত পরিচালক নিয়ে ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীদের একাংশ

এফবিসিসিআইছবি: সংগৃহীত

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) পর্ষদে ১২ মনোনীত পরিচালক রাখা এবং তাঁদের নির্বাচনে নতুন প্রক্রিয়া নিয়েও অসন্তুষ্ট ব্যবসায়ীদের একাংশ। তারা বলছেন, এতে পদ–বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হতে পারে। নির্বাচিত ব্যক্তিদের পাশাপাশি অনির্বাচিত ব্যক্তিদের পরিচালক হওয়াটাও অস্বস্তিকর।

মনোনীত পরিচালক নিয়ে আপত্তি থাকলেও যত দ্রুত সম্ভব বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা চূড়ান্ত হোক, এটাই চান ব্যবসায়ীরা। কারণ হিসেবে তাঁরা বলছেন, দ্রুত বিধিমালা চূড়ান্ত হলে তাতে এফবিসিসিআইসহ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোয় নির্বাচনের জট খুলবে। নেতৃত্ব সংকটে স্থবির হয়ে পড়া এসব সংগঠনে আবারও প্রত্যাশিত ব্যবসায়ী নেতৃত্ব ফিরবে।

গত সপ্তাহে বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা সংশোধনের খসড়া ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এই খসড়ার ওপর আগামী শনিবার পর্যন্ত অংশীজনেরা মতামত দিতে পারবেন বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

খসড়া সংশোধনী নিয়ে একাধিক চেম্বার ও বাণিজ্য সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে আজ সোমবার প্রথম আলোর এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁরা বলছেন, মোটদাগে ব্যবসায়ীদের চাওয়াগুলো খসড়া সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ছোটখাটো কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি থাকলেও খসড়া সংশোধনীতে বড় কোনো ত্রুটি বা আপত্তির কিছু নেই।

১৯৬১ সালের বাণিজ্য সংগঠন অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০২২ সালে নতুন করে বাণিজ্য সংগঠন আইন প্রণয়ন করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। সেই আইনের ভিত্তিতে গত বছরের মে মাসে বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা-২০২৫–এর প্রজ্ঞাপন জারি হয়। এরপরই এফবিসিসিআইয়ের পাশাপাশি ঢাকা চেম্বার, মেট্রোপলিটন চেম্বারসহ বেশ কয়েকটি বাণিজ্য সংগঠন বেশ কয়েকটি বিধি নিয়ে আপত্তি জানায়। বাণিজ্য সংগঠনগুলোর আপত্তির কারণে এই বিধি সংশোধনের উদ্যোগ নেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

বিজিএমইএ, ঢাকা চেম্বার, এমসিসিআইয়ের মতো সংগঠনের নেতারা যদি যুক্ত হতে না পারেন, তাহলে ফেডারেশন শক্তিশালী হবে না।
আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী, সভাপতি, বিসিআই

মনোনীত পরিচালকে আপত্তি

২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ওই বছরের সেপ্টেম্বরে এফবিসিসিআইয়ে প্রশাসক নিয়োগ দেয় সরকার। এর আগে সংগঠনটির পরিচালনা পর্ষদ ছিল ৮০ জনের। বিধিমালায় পর্ষদের আকার কমিয়ে ৪৬-এ নামিয়ে আনা হয়। আর এবারের খসড়ায় বিধিমালায় নতুন করে দুটি সহসভাপতি পদ যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, ৪৮ জনের পর্ষদে সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি, ৪ সহসভাপতি ছাড়া ৪২ পরিচালকের মধ্যে ৩০ জন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপ থেকে নির্বাচিত হবেন। চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপ থেকে ৫ জন করে ১০ জন মনোনীত পরিচালক থাকবেন। এর বাইরে নারী চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপ থেকে ১ জন করে ২ জন মনোনীত পরিচালক পর্ষদে যুক্ত হবেন। এই ১২ জন মনোনীত পরিচালকের জন্য নির্বাচিত পর্ষদ ২২ জনের নাম সরকারের কাছে পাঠাবে। ওই প্রস্তাব পাওয়ার পর সরকার মনোনীত পরিচালক চূড়ান্ত করবে।

ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি হতে চাইলে ভোট ছাড়া হয় কীভাবে। সে জন্য আমরা মনোনীত পরিচালকের বিধান বাতিলের দাবি করেছিলাম।
মীর নিজাম উদ্দিন আহমেদ, সাবেক সহসভাপতি, এফবিসিসিআই

মনোনীত পরিচালকের জন্য কোন কোন চেম্বার ও বাণিজ্য সংগঠন থেকে প্রস্তাব করা যাবে, তারও একটি তালিকা খসড়া বিধিতে প্রস্তাব করা হয়েছে। সেই তালিকায় আছে ঢাকা চেম্বার, চট্টগ্রাম চেম্বার, রাজশাহী চেম্বার, খুলনা চেম্বার, বরিশাল চেম্বার, সিলেট চেম্বার, এমসিসিআই, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রি, রংপুর চেম্বার, ঢাকা উইমেন চেম্বার, চট্টগ্রাম উইমেন চেম্বার, বাংলাদেশ ইউমেন চেম্বার, ময়মনসিংহ চেম্বার ও চিটাগাং মেট্রোপলিটন চেম্বার। বাণিজ্য সংগঠনের মধ্যে তালিকায় আছে বিজিএমইএ, বিটিএমএ, হিমায়িত খাদ্য রপ্তানিকারক সমিতি, পাটকল সমিতি, ওষুধ শিল্প সমিতি, অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস, বিকেএমইএ, বায়রা, প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি, রিহ্যাব, বেসিস, সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ও আসবাব রপ্তানিকারক সমিতি।

জানতে চাইলে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহসভাপতি মীর নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি হতে চাইলে ভোট ছাড়া হয় কীভাবে। সে জন্য আমরা মনোনীত পরিচালকের বিধান বাতিলের দাবি করেছিলাম। তারপরও আমরা চাই দ্রুত বিধিমালা সংশোধন করে নির্বাচনের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের হাতে ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্ব ফিরে আসুক। তা না হলে ব্যবসায়ীদের কথা বলবেন কারা। বিধিমালার চূড়ান্ত না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে এফবিসিসিআই অভিভাবকশূন্য।’

অবশ্য মনোনীত পরিচালক নিয়ে ভিন্নমত দিলেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, ঢাকা চেম্বার, এমসিসিআইয়ের মতো সংগঠনের সদস্যরা অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। তবে ফেডারেশনের বর্তমান নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় তাঁরা যেতে আগ্রহী নন। আর তাঁরা যদি মনোনীত পরিচালক হিসেবে যুক্ত হতে না পারেন, তাহলে ফেডারেশন শক্তিশালী হবে না। সে জন্য পর্ষদে মনোনীত পরিচালক থাকা যুক্তিযুক্ত।

এক ভোটে অসন্তোষ

তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাচনে দেখা যায়, একজন ব্যবসায়ীর যতগুলো কারখানা থাকে, ততগুলো ভোট দিতে পারেন। এমন ব্যবসায়ীরা ভোটের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেন। বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালার খসড়া সংশোধনীতে প্রস্তাব করা হয়েছে, কোনো বাণিজ্য সংগঠনে এক ব্যক্তির একাধিক সদস্যপদ থাকলেও একটির বেশি ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন না।

সংশোধনের এই প্রস্তাব যুক্তিযুক্ত হয়নি বলে মনে করেন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতিটি কোম্পানির আলাদা সত্তা রয়েছে। সে জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠানের মালিক একটির বেশি ভোট দিতে পারবেন না, সেটি যুক্তিযুক্ত হয়নি। যৌথ বিনিয়োগ কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অনেকের বিনিয়োগ আছে। সে জন্য সব প্রতিষ্ঠান থেকেই ভোটের সুযোগ থাকা উচিত। আমরা এই সংশোধনীর বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মতামত দেব।’

এদিকে বর্তমানে বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাহী কমিটি বা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি, সহসভাপতিসহ সব পদে সরাসরি ভোটের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা শিথিল করা হচ্ছে। খসড়া প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাহী কমিটি বা পরিচালনা পর্ষদের ভোটাধিকার, নির্বাচন ও নেতৃত্ব তাদের সংঘবিধি ও সংঘস্মারক অনুযায়ী করা যাবে।

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, অধিকাংশ নির্বাচনে একাধিক প্যানেলের প্রার্থীরা অংশ নেন। শীর্ষ পদে একাধিক প্যানেল থেকে বিজয়ী হলে অনেক ক্ষেত্রে সংগঠন পরিচালনায় মতবিরোধ দেখা দেয়। সব পদে সরাসরি ভোট হলে এমন পরিস্থিতি হবে।