সংকটে দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে রপ্তানি আয়, শীর্ষ পাঁচটি খাতের রপ্তানিই কমেছে

চট্টগ্রাম বন্দরফাইল ছবি: প্রথম আলো

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহের তীব্র সংকটের পাশাপাশি দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এখন বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে যখন বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে গতি দরকার তখন পণ্য রপ্তানি নেতিবাচক ধারা থেকে বের হতে পারছে না। গত আট মাস ধরে পণ্য রপ্তানি কমছে। তার মধ্যে গত মার্চ মাসে রপ্তানি কমেছে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১৮ শতাংশের কাছাকাছি।

গত মার্চে রপ্তানিতে বড় ধস নামার পেছনের কারণ হচ্ছে, তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত কৃষি পণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং পাট ও পাটজাত পণ্য—এই শীর্ষ পাঁচ খাতের সব কটির পণ্য রপ্তানি কমেছে। শুধু তাই নয়, ছোট খাতগুলোর অধিকাংশের রপ্তানি কমে গেছে। ফলে নেতিবাচক ধারা থেকে বের হতে পারছে না রপ্তানি খাত।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, গত মার্চ মাসে পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৩৩৯ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার। যদিও গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) জানিয়েছে, ৩৪৮ কোটি ডলারের পণ্য। এই রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ কম। গত বছরের মার্চে রপ্তানি হয়েছিল ৪২৪ কোটি ৮৬ লাখ ডলারের পণ্য।

ইপিবির তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) রপ্তানি হয়েছে ৩ হাজার ৫৩৯ কোটি ডলারের পণ্য। এই রপ্তানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ কম। গত অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে রপ্তানি হয়েছিল ৩ হাজার ৭১৯ কোটি ডলারের পণ্য।

চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে অর্থাৎ জুলাইয়ে ৪৭৭ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। সেই মাসে প্রায় ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। তারপর গত আট মাস পণ্য রপ্তানি শুধুই কমেছে। জুলাইয়ের পর গত জানুয়ারিতে ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি হয়। অন্য মাসগুলোয় রপ্তানি ছিল ৪ বিলিয়নের নিচে।

ইপিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের শীর্ষ রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকের রপ্তানি গত মার্চে কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ। ২৮১ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। গত বছরের মার্চে রপ্তানি হয়েছিল ৩৪৫ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক। গত মাসে তৈরি পোশাকের রপ্তানি সবচেয়ে বেশি কমে গেছে। সামগ্রিকভাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ২ হাজার ৮৫৮ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে রপ্তানি কমেছে ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় শীর্ষ রপ্তানি খাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি গত মার্চে হয়েছে ৮ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। এই রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ কম। এখন পর্যন্ত (প্রথম ৯ মাসে) চলতি অর্থবছর ৮৮ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ বেশি। তার মানে গত মাসে কমলেও খাতটির সামগ্রিক রপ্তানি এখনো ইতিবাচক ধারায় আছে।

তৃতীয় শীর্ষ রপ্তানি খাত প্রক্রিয়াজাত কৃষি পণ্যের রপ্তানি গত মাসে কমেছে দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। মার্চে রপ্তানি হয়েছে ৬ কোটি ৪৫ লাখ ডলারের প্রক্রিয়াজাত কৃষি পণ্য। এদিকে সামগ্রিকভাবে অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ৭৩ কোটি ডলারের প্রক্রিয়াজাত কৃষি পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ২১ শতাংশ কম।

এদিকে চতুর্থ শীর্ষ রপ্তানি খাত হোম টেক্সটাইলের রপ্তানি গত মাসে কমেছে। রপ্তানি হয়েছে ৭ কোটি ৯২ লাখ ডলারের হোম টেক্সটাইল। এই রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সাড়ে ২০ শতাংশের মতো কম। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ৬৭ কোটি ডলারের হোম টেক্সটাইল রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দশমিক ৭৩ শতাংশ কম।

পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি অনেক দিন ধরেই ভুগছে। গত মাসে ৬ কোটি ৭৮ লাখ ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ কম। সামগ্রিকভাবে খাতটির রপ্তানি কিছুটা কমেছে। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ৬২ কোটি ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৩০ শতাংশ কম।

একাদিক রপ্তানিকারকেরা বলছেন, গত মাসে পবিত্র ঈদুল ফিতরের কারণে শিল্পকারখানায় কর্মদিবস ৮ থেকে ১০ দিন কম ছিল। ফলে কারখানা থেকে বন্দরে রপ্তানি পণ্য গিয়েছে কম। তা ছাড়া গত বছর মার্কিন বাজারে পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর থেকে ক্রয়াদেশ কম। সেটির প্রভাবে ইউরোপের বাজারে ক্রয়াদেশ কমেছে। তার কারণ চীনারা মার্কিন বাজারে অধিক শুল্কের খড়্গ এড়াতে ইউরোপের ক্রেতাদের কম দাম অফার করে অনেক বেশি ক্রয়াদেশ নিয়ে নিচ্ছে। তাতে সামগ্রিকভাবে পণ্য রপ্তানির ক্রয়াদেশ কমে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণেও সামনে রপ্তানি কম থাকতে পারে।

রপ্তানি খাতের এই দুরবস্থার মধ্যে গত মাসে ইতিহাসের সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছে। এই মাসে দেশে ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন বা ৩৭৫ কোটি মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। এই আয় গত বছরের মার্চে আসা প্রবাসী আয়ের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেশি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ না হলে প্রবাসী আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তার কারণ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রবাসী আয়ের প্রায় অর্ধেক আসছে।