বন্ধ সরকারি কারখানায় বিনিয়োগে আগ্রহী ১৪ শিল্প গ্রুপ

রাষ্ট্রমালিকানাধীন বন্ধ ও লোকসানি কলকারখানায় বিনিয়োগে আগ্রহী দেশের ১৪ প্রতিষ্ঠান ও শিল্পগোষ্ঠী। এসব প্রতিষ্ঠান ও শিল্পগোষ্ঠী সরকারের কাছে ৮৬টি বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবগুলো এখন যাচাই-বাছাই করছে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রমালিকানাধীন বন্ধ ও লোকসানি কলকারখানায় কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মোটরসাইকেল উৎপাদন, ডেটা সেন্টার ও ডিজিটাল অবকাঠামো, খাদ্য ও পানি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, হালকা প্রকৌশল, নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত জুনে রাষ্ট্রমালিকানাধীন বন্ধ ও লোকসানি কলকারখানা চালুর উদ্যোগ নেয় সরকার। ওই মাসেই বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ আছে—এমন ৪৪টি কলকারখানা তালিকাভুক্ত করে বিডা। এর মধ্যে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) ১৩টি, বাংলাদেশ বস্ত্রকল করপোরেশনের (বিটিএমসি) ১২টি, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ১০টি, বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) ৫টি এবং বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের (বিএসইসি) ৪টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিডা বেসরকারি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে আগ্রহপত্র চাইলে ৪টি প্রতিষ্ঠান ও ১০টি শিল্পগোষ্ঠী ৮০টি বিনিয়োগ প্রস্তাব দেয়।

বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, একই কলকারখানায় একাধিক শিল্পগোষ্ঠী বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। যেমন ঠাকুরগাঁও সুগার মিলে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে প্যারাগন ও কাজী ফার্মস গ্রুপ। সেতাবগঞ্জ সুগার মিলে বিনিয়োগ করতে চায় নাবিল গ্রুপ, ব্র্যাক সিড অ্যান্ড অ্যাগ্রো এন্টারপ্রাইজ ও মিল্ক ভিটা।

গত ৪ জুলাই রাষ্ট্রমালিকানাধীন বন্ধ ও লোকসানি কলকারখানা চালুর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বৈঠক হয়। এতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে অলাভজনক ও বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে গত ৮ জুলাই শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে শিল্প মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে সভা হয়। এতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বিনিয়োগ প্রস্তাবের বিষয়ে মতামত তুলে ধরে। সভায় বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাই করে বিনিয়োগকাঠামো নির্ধারণের লক্ষ্যে একটি কার্যকর কমিটি গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।

অনেক দিন ধরেই সরকারি বন্ধ কলকারখানার ইস্যুটি ঝুলে ছিল। এগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ভালো। বেসরকারি খাতে গেলেও সেগুলো যেন শিল্পকারখানা হিসেবেই থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
মোস্তাফিজুর রহমান, সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি

জানতে চাইল শিল্পসচিব আব্দুন নাসের খান গত রোববার প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ প্রস্তাব আমরা পেয়েছি। গত মাসে ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন ২০২৬ পাস হয়েছে। সেই আইন অনুযায়ী নীতিমালা হয়ে গেলে সরকারি বন্ধ ও অলাভজনক কলকারখানা কোন মডেলে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হবে, সেটি চূড়ান্ত হবে।’ পুরো কাজ অল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কে কী করতে চায়

সরকারি বন্ধ ও অলাভজনক কলকারখানা চালু করতে ৩৫টি বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। তারপর আকিজ রিসোর্স গ্রুপ ১২টি, টি কে গ্রুপ ১০টি, কাজী ফার্মস ৪টি ও ট্রান্সকম গ্রুপ ৩টি বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে।

বেসরকারি খাতের ট্রান্সকম গ্রুপ সরকারি চার সংস্থার বন্ধ ও অলাভজনক কলকারখানায় নতুন বিনিয়োগের তিনটি প্রস্তাব দিয়েছে। এ ছাড়া আকিজ ভেঞ্চার গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠান মোট ১২টি বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে। গ্রুপটির আকিজ অ্যাগ্রো অ্যান্ড লাইভ স্টক তিনটি চিনিকলে কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, সৌরবিদ্যুৎ ও হিমাগার নির্মাণ এবং আকিজ ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস হালকা প্রকৌশল, আসবাব, রাবার, বৈদ্যুতিক গাড়ি, বিদ্যুৎ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নয়টি বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে।

গত মাসে ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন ২০২৬ পাস হয়েছে। সে আইন অনুযায়ী নীতিমালা হয়ে গেলে সরকারি বন্ধ ও অলাভজনক কলকারখানা কোন মডেলে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হবে, সেটি চূড়ান্ত হবে।
আব্দুন নাসের খান, শিল্পসচিব

প্যারাগন গ্রুপ ঠাকুরগাঁও চিনিকলে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প ও সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে আগ্রহ দেখিয়েছে। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ছোট আকারে হিমাগার স্থাপনের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ।

জানতে চাইলে প্যারাগন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়াতে চাই। সরকারি কারখানা দীর্ঘ মেয়াদে ইজারা পেলে সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি পশুখাদ্য উৎপাদনের কারখানা করব আমরা। এ ছাড়া আখ চাষের জমিতে ধান ও ভুট্টা চাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।’

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ সরকারি ১৬টি কলকারখানার বিপরীতে ৩৫টি বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে। তারা অটোমোবাইল সংযোজন, রিসোর্ট, ইকো ট্যুরিজম, কৃষিশিল্প, নির্মাণসামগ্রী, রেডিমিক্স কারখানা, পেপার মিল, সৌরবিদ্যুৎ, পাদুকাশিল্প, আসবাব, পোলট্রি, ডেইরি ফার্মসহ বিভিন্ন খাতে একক ও যৌথ বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে।

জানতে চাইলে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘বন্ধ শিল্পে বিনিয়োগের জন্য আমরা প্রাথমিক আগ্রহপত্র দিয়েছি। বেসরকারি পর্যায়ে জায়গা কিনে সেটি উন্নয়ন করে কারখানা নির্মাণ করতে সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লেগে যায়। তার বিপরীতে রেডি (প্রস্তুত) জমি পেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে উৎপাদনে যাওয়া যায়। তাতে সময়ের পাশাপাশি অর্থ সাশ্রয় হয়। তা ছাড়া আগে থেকে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ থাকলে উৎপাদন দ্রুত শুরু করা যায়।’

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত রাজশাহী টেক্সটাইল মিল ও রাজশাহী জুট মিলও সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারত্বে (পিপিপি) চালু করেছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। সেখানে দুটি কারখানায় এখন পর্যন্ত সাড়ে তিন হাজার মানুষ কাজ করছেন। গত মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) খুলনার দিঘলিয়ার স্টার জুট মিলস ও সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলস ইজারা পেয়েছে গ্রুপটি।

এ ছাড়া ব্র্যাক সিড অ্যান্ড অ্যাগ্রো এন্টারপ্রাইজ সেতাবগঞ্জ চিনিকল দীর্ঘ মেয়াদে ইজারা নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়ন, সবজি–ফল প্রক্রিয়াজাত করা, জৈব সার উৎপাদন, বীজ–আলু বর্ধন, হিমাগার, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের আগ্রহ দেখিয়ে মোট নয়টি বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে। যৌথ বিনিয়োগে এপিআই ও বায়োফার্মাসিউটিক্যালে বিনিয়োগের জন্য একটি প্রস্তাব দিয়েছে অ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যাল।

বেসরকারি খাত থেকে এত আগ্রহ পেয়ে আমরা বিস্মিত। গত ৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী বৈঠকের পর তিন সপ্তাহের মধ্যে আমরা সরকারের বন্ধ ও লোকসানি শিল্পকারখানা বেসরকারি খাতে ছাড়তে একটি খসড়া নীতিমালা দাঁড় করিয়েছি।
নাহিয়ান রহমান, নির্বাহী সদস্য, বিডা

কাজী ফার্মস গ্রুপ সরকারি বন্ধ কারখানায় বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়ে চারটি প্রস্তাব দিয়েছে। শিল্পগোষ্ঠীটি খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস, ঢাকা লেদার, প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ, ঠাকুরগাঁও সুগার মিল ও পঞ্চগড় সুগার মিলসের জমি ক্রয় বা দীর্ঘ মেয়াদে ইজারা নিয়ে অ্যাগ্রো প্রসেসিং, কর্ন স্টার্চ ও ফুড প্রসেসিং এবং বেভারেজ পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ করতে চায়। ভোগ্যপণ্যের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান নাবিল গ্রুপ রাজশাহী সুগার মিল ও সেতাবগঞ্জ সুগার মিলে সুগারবিট, সমন্বিত কৃষিশিল্প ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বিনিয়োগের জন্য দুটি প্রস্তাব দিয়েছে।

ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায় আরেক শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান টি কে গ্রুপ ১০টি বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে। তারা সরকারি বন্ধ কলকারখানার দীর্ঘমেয়াদি ইজারা নিয়ে অটোমোবাইলের যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক গাড়ি সংযোজন, চামড়ার জুতা উৎপাদন, সৌরবিদ্যুতের গ্লাসসহ নানা পণ্য উৎপাদনে কারখানা করতে আগ্রহী।

এ ছাড়া বেঙ্গল মিট প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি কৃষি খাদ্যে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে বৈদ্যুতিক গাড়ি সংযোজন, ব্যাটারি সিস্টেম, প্রকৌশল এবং টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার ও টেবিলওয়্যার পণ্য উৎপাদনের জন্য তিনটি বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে এক্সিলেন্ট সিরামিকস গ্রুপ।

মিল্ক ভিটা সেতাবগঞ্জ সুগার মিলে ৩০ হাজার লিটার উৎপাদনক্ষমতার একটি আধুনিক রিফাইনারি স্থাপনে বিনিয়োগ করতে চায়। আর গ্রাম উন্নয়ন কর্ম (জিইউকে) বৈদ্যুতিক গাড়ি, কৃষিযন্ত্র ও সেরিকালচারে বিনিয়োগের জন্য তিনটি প্রস্তাব দিয়েছে।

জানতে চাইলে বিডার নির্বাহী সদস্য নাহিয়ান রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বেসরকারি খাত থেকে এত আগ্রহ পেয়ে আমরা বিস্মিত। গত ৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী বৈঠকের পর তিন সপ্তাহের মধ্যে আমরা সরকারের বন্ধ ও লোকসানি শিল্পকারখানা বেসরকারি খাতে ছাড়তে একটি খসড়া নীতিমালা দাঁড় করিয়েছি। সেই নীতিমালা নিয়ে গত ২৮ জুলাই বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠক হয়। আশা করছি, এক মাসের মধ্যে নীতিমালাটি পাস হয়ে যাবে। বন্ধ ও লোকসানি শিল্পকারখানা ইজারা, মুনাফা ভাগাভাগি কিংবা অন্য কোনো মডেলে বেসরকারি খাতে ছাড়া হতে পারে।’

শিল্প হিসেবেই রাখতে হবে

সরকারের বন্ধ ও লোকসানি শিল্পকারখানা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই সরকারি বন্ধ কলকারখানার ইস্যুটি ঝুলে ছিল। এগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ভালো। বেসরকারি খাতে গেলেও সেগুলো যেন শিল্পকারখানা হিসেবেই থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। সেটি হলে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। অনেক সময় আমরা দেখেছি, সরকারি কলকারখানা ইজারা নিয়ে আবাসন প্রকল্প করা হয়েছে। তেমনটি যাতে না হয়, তার জন্য দক্ষতা ও সুনাম আছে—এমন প্রতিষ্ঠানকে বেছে নিতে হবে।’