বস্ত্র খাতে নগদ সহায়তা বাড়িয়ে ৫% করা হলো

আড়াই বছর আগে স্থানীয় সুতা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ৪ শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়া হতো।

স্পিনিং মিল। ছবি: প্রথম আলো

বস্ত্র খাতের ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পে দেশি সুতা বা কাপড় ব্যবহারে শুল্ক বন্ড ও ডিউটি ড্র-ব্যাকের পরিবর্তে বিকল্প নগদ সহায়তার হার দেড় শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করেছে সরকার। যেসব তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতা ব্যবহার করবেন, তাঁরাই বাড়তি এই নগদ সহায়তা পাবেন।

অর্থ মন্ত্রণালয় গত বৃহস্পতিবার এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে একটি নির্দেশনা পাঠিয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের গত ২৩ ডিসেম্বরের এক চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে এই নির্দেশনা জারি করা হয়। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, রপ্তানিকারকদের প্রণোদনা নেওয়ার আগে দেশীয় উৎস থেকে সুতা বা কাপড় সংগ্রহের প্রমাণপত্র দাখিল করতে হবে। সুবিধাটি ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে।

প্রণোদনা ৫ শতাংশ হওয়ায় আমদানি করা সুতার সঙ্গে দেশীয় সুতার দামের পার্থক্য কমবে। তাতে মিলগুলোর ক্রয়াদেশ বাড়বে।
মোহাম্মদ খোরশেদ আলম, পরিচালক, বিটিএমএ

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা গতকাল শুক্রবার প্রথম আলোকে জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে বস্ত্র খাতের জন্য চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করবে।

বস্ত্রকলমালিকদের সংগঠন বিটিএমইএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেলের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআর ভবনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তাঁরা দেশি সুতা ব্যবহার উৎসাহিত করতে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য নগদ সহায়তা দেড় শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করাসহ ছয় দফা দাবি জানান।

জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই ব্যবসায়ে টিকে থাকতে নগদ সহায়তা বৃদ্ধির দাবি করেছিলেন বস্ত্রকলমালিকেরা। আলাপ-আলোচনার পর নীতিগতভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছালেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি সেই সরকার। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে তাদের কাছে বিটিএমএর নেতারা দেনদরবার শুরু করেন। সম্প্রতি এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবুজ সংকেত দেন। তারপরই মূলত বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশনা পাঠাল অর্থ মন্ত্রণালয়।

আড়াই বছর আগে স্থানীয় সুতা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ৪ শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়া হতো। তবে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তা কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হয়। ছয় মাসে সেই সহায়তা কমিয়ে দেড় শতাংশ করা হয়। এই সহায়তার ওপর আবার ৫ শতাংশ করও দিতে হয় রপ্তানিকারকদের। এর পর থেকেই সুতা আমদানি বাড়তে থাকে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যানুযায়ী, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকার সুতা আমদানি হয়েছিল, যা পরের অর্থবছরে বেড়ে ২১ হাজার ১৪২ কোটি টাকায় ওঠে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকার সুতা আমদানি হয়, যার বড় অংশই ভারতীয়।

জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম গতকাল বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, ‘যখন ৫ শতাংশ নগদ সহায়তা ছিল, তখন আমদানি ও দেশীয় সুতার মধ্যে দামের পার্থক্য ছিল কেজিপ্রতি ১০-১৫ সেন্ট। যেহেতু সুতা দ্রুত পাওয়া যায় এবং পরিবহন খরচ কম, সেহেতু আমরা দেশীয় সুতাই ব্যবহার করতাম। তবে নগদ সহায়তা কমানোর পর দামের পার্থক্য ৪০ সেন্টে গিয়ে পৌঁছায়। সে জন্যই সুতা আমদানি বাড়তে থাকে। এখন নগদ সহায়তা বৃদ্ধির কারণে দেশীয় সুতার বিক্রি বাড়বে।

বিটিএমএর হিসাবে, দেশে বর্তমানে ১ হাজার ৮০০-এর বেশি টেক্সটাইল মিল রয়েছে। এর মধ্যে স্পিনিং মিল বা সুতার কল ৫২৭টি। খাতটিতে মোট বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার। নিট পোশাকশিল্পের ৮০ শতাংশ এবং ওভেন পোশাকের প্রায় ৪০ শতাংশ সুতা সরবরাহ করে স্থানীয় মিলগুলো।

একাধিক বস্ত্রকলমালিক বলেন, দেড় শতাংশের পরিবর্তে ৫ শতাংশ নগদ সহায়তা দিলে সরকারের প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা খরচ হবে বছরে। তবে দেশীয় সুতার ব্যবহার বাড়লে কর ও শুল্ক বাবদই সরকারের আয় কয়েক গুণ বেশি হবে। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ও রপ্তানি খাতের চাহিদা মেটাতে বছরে ৪২০ কোটি কেজি সুতার প্রয়োজন হয়। তার মধ্যে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো সরবরাহ করে ৩০০ কোটি কেজি।

বিটিএমএর পরিচালক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, প্রণোদনা ৫ শতাংশ হওয়ায় আমদানি করা সুতার সঙ্গে দেশীয় সুতার দামের পার্থক্য কমবে। তাতে মিলগুলোর ক্রয়াদেশ বাড়বে। যদিও ইরান যুদ্ধের কারণে কয়েক মাস ধরে বিশ্বজুড়ে তৈরি পোশাকের চাহিদা কিছুটা কমেছে।

এক প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, সুতার মূল কাঁচামাল তুলা ও জ্বালানি। কয়েক বছর ধরে গ্যাস-সংকটে ভুগছে সুতাকলগুলো। চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহেও সরকারের কার্যকর উদ্যোগ লাগবে। অন্যথায় পুরোপুরি সুফল মিলবে না।