ইইউ ও ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে বাংলাদেশের দুশ্চিন্তা
প্রায় ২০ বছর ধরে আলোচনার পর ভারত আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) গত সপ্তাহে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) চূড়ান্ত করেছে। এটি কার্যকর হলে ভারতে রপ্তানি করা ইইউর প্রায় ৯৬ শতাংশ পণ্যে শুল্ক উঠে যাবে। অন্যদিকে ভারতের ৯০ শতাংশ পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক তুলে নেবে ইইউ। সেটি হলে উভয় দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়বে।
এই চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপের ২৭টি দেশের সঙ্গে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ ভারতের পণ্যের মুক্তবাণিজ্য শুরু হবে। বিশ্বের ২৫ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) যৌথভাবে দখলে রেখেছে ইইউ ও ভারত। তাদের হাতেই আছে প্রায় ২০০ কোটি টাকার বড় এক বাজার। দুই দেশের শীর্ষ নেতা এটিকে ‘মাদার অব অল ডিলস’ (সব চুক্তির সেরা) হিসেবে অভিহিত করেছেন।
এফটিএ কার্যকর হলে ইইউর বাজারে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন পণ্যে ভারত শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। সেটি হলে বাজারটিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানি প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। যদিও বর্তমানে অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা জিএপির অধীনে ইইউতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায় বাংলাদেশ। তবে চলতি বছরের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হবে বাংলাদেশ। তারপর তিন বছর অর্থাৎ ২০২৯ সাল পর্যন্ত ইইউর বাজারে জিএসপি–সুবিধা পাবে বাংলাদেশ।
রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, ইইউ ও ভারতের মধ্যকার এফটিএ কার্যকর হলে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকশিল্প বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ জিএসপি প্লাস সুবিধা পেলেও তার অধীনে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না। সে ক্ষেত্রে বিকল্প হচ্ছে ইইউর সঙ্গে এফটিএ করা। না হলে শুল্ক দিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি করতে হবে। সেটি হলে ইইউর মতো বড় বাজারে রপ্তানি কমতে পারে।
ইইউ বাংলাদেশি পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। তার মধ্যে ২১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে ইইউর বাজারে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ৮ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন, কানাডায় ১ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন, জাপানে ১ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
ইইউর বাজারে ভারত কী সুবিধা পাবে
বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান ও আল–জাজিরার তথ্য অনুযায়ী ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট এন্তোনিয়ো লুই সান্তোস দ্য কোস্টা ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন গত মঙ্গলবার ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দিল্লিতে এক শীর্ষ বৈঠকে এফটিএ চূড়ান্ত করেন। চুক্তিটা অবশ্য এখনই সই হচ্ছে না। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও ইইউর সদস্যদেশগুলো এই চুক্তিতে সম্মতি দিলে বছরের শেষ দিকে চুক্তি সই হতে পারে। সামনের বছর এটির বাস্তবায়ন হতে পারে।
২০০৭ সালে ভারত ও ইইউর মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা শুরু হলেও গাড়ি, কৃষি ও দুগ্ধ খাত নিয়ে মতবিরোধের কারণে তা ভেস্তে যায়। ২০২২ সালে আবার আলোচনা শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক আরোপ, বৈশ্বিক উৎপাদনে চীনের একচেটিয়া আধিপত্য এবং গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ—এসব উদ্বেগ আলোচনায় গতি আনে। শেষ পর্যন্ত দুই দশকের চেষ্টার সফল পরিসমাপ্তি ঘটায় দুই দেশ।
ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইইউ ও ভারতের মধ্যকার বাণিজ্য ছিল ১২০ বিলিয়ন ইউরো। ভারত থেকে ইইউ দেশগুলোর আমদানি ছিল ৭১ বিলিয়ন ইউরো। আর ইইউ থেকে ভারত আমদানি করেছে ৪৯ বিলিয়ন ইউরো।
এফটিএ বাস্তবায়িত হলে ইইউ থেকে আমদানি করা ৩০ শতাংশ পণ্যের ওপর ভারতীয় শুল্ক তাৎক্ষণিকভাবে শূন্য হবে। ইইউ কর্মকর্তারা জানান, ভারতে রপ্তানি করা ৯৬ দশমিক ৬ শতাংশ পণ্যের শুল্ক উঠে যাবে। এতে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ইউরো শুল্ক সাশ্রয় হবে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর।
ইইউ থেকে আমদানি হওয়া গাড়ির ওপর শুল্ক ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে নামিয়ে আনবে ভারত, যা কয়েক বছরের মধ্যে ১০ শতাংশে নামবে। পাশাপাশি যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক দ্রব্য ও ওষুধের ওপর বিদ্যমান ভারতীয় শুল্কের বেশির ভাগই উঠে যাবে। বিমান ও মহাকাশশিল্পের প্রায় সব পণ্যে শুল্ক প্রত্যাহার করা হবে। এ ছাড়া ওয়াইন ও স্পিরিটের ওপর বর্তমান ১৫০ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করা হবে।
ইউরোপের কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় গরুর মাংস, মুরগি, চিনি, আটা, রসুন ও ইথানলের ওপর শুল্ক বজায় রাখছে ইইউ। এতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে চুক্তিটিতে অনুমোদন পাওয়া সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ভারতের রপ্তানি করা ৯০ শতাংশ পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক তুলে নেবে ইইউ কর্তৃপক্ষ। ৭ বছরের মধ্যে এই সুবিধা ৯৩ শতাংশে উন্নীত হবে। ইইউর বাজারে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ, রাসায়নিক দ্রব্য, প্লাস্টিক, রাবার, রত্ন ও অলংকার রপ্তানিতে তাৎক্ষণিকভাবে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে ভারতীয়রা।
তৈরি পোশাক নিয়ে দুশ্চিন্তা
ইইউর বাজারে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানির বড় অংশই তৈরি পোশাক। গত অর্থবছরে বাজারটিতে রপ্তানি হওয়া ২১ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১৯ দশমিক ৭১ বিলিয়ন হচ্ছে তৈরি পোশাক, যা বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির ৫০ শতাংশ। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ৩৯ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে।
নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের তৈরি পোশাকশিল্পের বর্তমান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম এবং ভবিষ্যতের প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজার ইইউর সঙ্গে এফটিএ করে ফেলেছে। আমরা বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। অনেকেই মনে করেন যে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। এত সস্তায় কেউ পোশাক দিতে পারবে না। ধারণাটি ভুল। ভারত খুব বেশি ব্যয়বহুল নয়। দেশটির অনেক রাজ্যে মজুরি কম। তারা তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশকে পেছনে ফেলার লক্ষ্য নিয়েছে।’
ফজলুল হক বলেন, ‘ইইউর সঙ্গে ভারতের এফটিএর পর আমাদের চিন্তিত হওয়া উচিত। আমাদের ভুল জায়গায় নজর দেওয়া বন্ধ করতে হবে। কীভাবে নিজেদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানো যায়, সেটি নিজে কাজ করতে হবে। অন্যদিকে সরকারকে ইইউর সঙ্গে এফটিএ করার উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে ২০২৯ সালের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে মারাত্মক প্রভাব পড়বে।’
ইইউর দেওয়া বাণিজ্যিক সুবিধার ওপর ভর করে বাংলাদেশ চীনের পর ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। ডেনিম, ট্রাউজার্স ও টি-শার্টের মতো কিছু ক্ষেত্রে চীনকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ।
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর বাংলাদেশ যদি দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে ২০২৯ সালের পর ইউরোপে পোশাক রপ্তানিতে প্রায় সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক গুনতে হবে। অন্যদিকে ভারত ও ভিয়েতনাম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে শূন্য শুল্কসুবিধা ভোগ করতে থাকবে। তখন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির ধস কেউ ঠেকাতে পারবে না বলে জানাচ্ছেন তৈরি পোশাকশিল্পের ব্যবসায়ীরা।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান র্যাপিডের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, এলডিসি গ্রাজুয়েশনের পর আরও তিন বছর ইইউর বাজারে বাংলাদেশি পণ্যে জিএসপি–সুবিধা থাকবে। ফলে ২০২৯ সাল পর্যন্ত রপ্তানিতে নাটকীয় পরিবর্তন না আসার সম্ভাবনাই বেশি। তবে ইইউর বাজারে ভারতের রপ্তানি অনেক বাড়বে। তিনি আরও বলেন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর বাংলাদেশ জিএসপি প্লাস পেতে পারে। তবে জিএসপি প্লাসের বর্তমান নীতিমালায় তৈরি পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে নীতিমালা সংশোধন করা গেলে সুযোগ তৈরি হবে।
এম এ রাজ্জাক বলেন, এলডিসি গ্রাজুয়েশনের পর জিএসপির নীতিমালায় পরিবর্তন নাকি এফটিএ করতে চায়, সে বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তারপর ইইউর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করতে হবে। কাজটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে করতে হবে। ইইউ ইতিমধ্যে বলেছে, এলডিসি গ্রাজুয়েশনের পর বাংলাদেশ কী করবে, সে বিষয়ে তারা কোনো আনুষ্ঠানিক আগ্রহপত্র পায়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার শ্রম আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করেছে। সংসদ নির্বাচনের পর অধ্যাদেশটি কোনো পরিবর্তন ছাড়াই আইন আকারে পাস করার ওপর জোর দেন এম এ রাজ্জাক। তিনি বলেন, ইইউর সঙ্গে বাণিজ্য সুবিধার আলোচনায় এগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।