সাক্ষাৎকার: হারুন ওর্তাচ

দেশের শিল্প, পরিবহন ও রান্নার জ্বালানি নিরাপত্তায় এলপিজি

তুর্কি এলপিজি খাতের শীর্ষস্থানীয় নাম ‘আইগ্যাস’ ও দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী ‘ইউনাইটেড গ্রুপ’-এর যৌথ উদ্যোগে ২০২১ সালে যাত্রা শুরু করে ‘ইউনাইটেড আইগ্যাস এলপিজি লিমিটেড’। আন্তর্জাতিক বাজারের ৬৫ বছরের অভিজ্ঞতা ও শক্তিশালী অবকাঠামো নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহত করছে। গৃহস্থালির পাশাপাশি অটোগ্যাস, শিল্প ও রেটিকুলেশন খাতে এলপিজির বহুমুখী ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হারুন ওর্তাচ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রথম আলো:

ঈদের আগে গ্রাহকদের সিলিন্ডার মজুতের প্রবণতা ও কৃত্রিম সংকট আপনারা কীভাবে সামাল দিচ্ছেন?

হারুন ওর্তাচ: ইউনাইটেড আইগ্যাস এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় মূলত দুটি কৌশল একসঙ্গে প্রয়োগ করে—নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা ও গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা। আমরা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যেকোনো পরিস্থিতিতে পরিবেশকের প্রতিটি অর্ডার নিশ্চিতভাবে সরবরাহ করি।

সরকারি ছুটি শুরু হওয়ার পরও অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয় বহন করে আমাদের প্ল্যান্টগুলো পুরোপুরি সচল রাখি, যাতে একটি সিলিন্ডার ট্রাকও খালি ফিরে না যায়। আমাদের বার্তা একটাই—বাজারে পর্যাপ্ত এলপিজি সরবরাহ রয়েছে, কোনো সংকট নেই, সিলিন্ডার সহজে পাওয়া যাচ্ছে এবং তাড়াহুড়া করার কোনো কারণ নেই। বিশেষ করে উৎসবের দিনগুলোতে কোনো গ্রাহককে যেন তাঁর এলপিজি সরবরাহ নিয়ে বিন্দুমাত্র দুশ্চিন্তা করতে না হয়, সেটিই আমাদের লক্ষ্য।

প্রথম আলো:

ঈদে শহর থেকে গ্রামে চাহিদার যে বড় স্থানান্তর ঘটে, সরবরাহ লাইনে তা আপনারা কীভাবে সমন্বয় করেন?

হারুন ওর্তাচ: এই সমন্বয়প্রক্রিয়ার কাজ আমরা কয়েক মাস আগে থেকেই পরিকল্পনা করতে শুরু করি। আগের বছরগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে ঈদের সময়ের বাড়তি চাহিদা অনুযায়ী ছুটি শুরুর আগেই সিলিন্ডার সরবরাহ জোরদার করি। পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করতে সারা দেশের বিতরণ কেন্দ্রগুলোতে ধাপে ধাপে সিলিন্ডার পাঠাই।

প্রথম আলো:

বৈশ্বিক ডলার–সংকটের এই সময়ে ঈদের পিক-টাইমে এলপিজি আমদানির চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবিলা করছেন?

হারুন ওর্তাচ: বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বৈদেশিক মুদ্রা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা সামলানো ও জাহাজ চলাচলের সময়সূচি ঠিক রাখা—আমদানির প্রতিটি ধাপেই এখন নিখুঁত পরিকল্পনা এবং শক্তিশালী আর্থিক সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রয়োজন। এই বহুমুখী চাপের মধ্যেও আমাদের যৌথ উদ্যোগের কারণে এগিয়ে থাকতে পারছি।

আইগ্যাস ও ইউনাইটেড গ্রুপ—দুটি প্রতিষ্ঠানই পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে বৈশ্বিক ও স্থানীয় পর্যায়ে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করছে। আমাদের আগে থেকে নিখুঁত পরিকল্পনা থাকায় সময়মতো বড় চালান নিশ্চিত করা ও ঈদের চাহিদা আসার আগেই স্টোরেজ পরিপূর্ণ রাখতে সবচেয়ে বড় সহায়তা করছে।

প্রথম আলো:

ছুটির মধ্যেও যাঁরা সিলিন্ডার সরবরাহ সচল রাখছেন, সেই খুচরা বিক্রেতা ও ডেলিভারিম্যানদের জন্য কী ধরনের প্রণোদনা আছে?

হারুন ওর্তাচ: আমাদের পরিবেশক, খুচরা বিক্রেতা ও ডেলিভারি কর্মীরাই প্রতিষ্ঠানটির পুরো সরবরাহব্যবস্থার মূল ভিত্তি ও চালিকা শক্তি। ঈদের এই উৎসবের সময়ে আমরা পরিবেশকদের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা ও লজিস্টিক সহায়তার ব্যবস্থা রাখি, যাতে পিক সিজনেও বাজারে সিলিন্ডারের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে। পুরো নেটওয়ার্কের সঙ্গে নিবিড় ও সার্বক্ষণিক সমন্বয় রেখে আমরা এই বাড়তি চাহিদা সামাল দিই, যাতে দেশের কোনো গ্রাহক সেবা থেকে বঞ্চিত না হন।

প্রথম আলো:

উৎসবের সাময়িক চাহিদার বাইরে দেশের এলপিজি খাতকে দীর্ঘ মেয়াদে লাভজনক ও টেকসই করতে আইগ্যাসের ভাবনা কী?

হারুন ওর্তাচ: দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনায় আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত। অবকাঠামোতে স্টোরেজ, ফিলিং সক্ষমতা ও সারা দেশে শক্তিশালী বিতরণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বহুমুখীকরণের মাধ্যমে অটোগ্যাস, শিল্প খাতে এলপিজির ব্যবহার, বাণিজ্যিক ক্ষেত্র ও রেটিকুলেশন ব্যবস্থায় সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে বহুতল ভবন ও আবাসিক কমপ্লেক্সে এলপিজি সরবরাহ করা হয়।

প্রথম আলো:

দেশের এলপিজি সিলিন্ডারের বাজার কত টাকার? এই বাজারের প্রবৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কেমন দেখছেন?

হারুন ওর্তাচ: বাংলাদেশে এলপিজির মূল্য মূলত আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত এবং মাসে মাসে এই মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে ওঠানামা করে। আমাদের অভ্যন্তরীণ হিসাব ও বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৭ লাখ মেট্রিক টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য বর্তমান বৈশ্বিক দরে প্রায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা)। দেশে নগরায়ণ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চলছে, পাশাপাশি শিল্প খাতেও এলপিজির চাহিদা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। আমরা আশা করছি, আগামী বছরগুলোতে এই বাজার ২৫ থেকে ৩০ লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছাবে। বিশেষ করে গৃহস্থালির বাইরে অটোগ্যাস ও শিল্প খাত আমাদের জন্য নতুন প্রবৃদ্ধির সীমানা হিসেবে উঠে আসছে।

প্রথম আলো:

ঈদের উৎসবমুখর ও ব্যস্ত সময়ে অসাবধানতাবশত এলপিজি সিলিন্ডারজনিত দুর্ঘটনা এড়াতে নিরাপত্তা সচেতনতায় আপনাদের বিশেষ উদ্যোগ কী?

হারুন ওর্তাচ: নিরাপত্তা আমাদের কাছে সাময়িক কোনো ক্যাম্পেইন নয়, এটি আমাদের ব্যবসার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সিলিন্ডার সব সময় খোলামেলা ও পর্যাপ্ত বায়ুচলাচলযুক্ত জায়গায় সোজা করে রাখা। আগুনের বা তাপের উৎস থেকে সিলিন্ডারকে নিরাপদ দূরত্বে বজায় রাখা। নিয়মিত বিরতিতে রেগুলেটর ও হোস পাইপ পরীক্ষা করা এবং নির্দিষ্ট সময় পর পরিবর্তন করা।

পাশাপাশি আমরা আমাদের গ্রাহকদের ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ডের রেগুলেটর ও হোস পাইপ ব্যবহারে উৎসাহিত করি—কারণ সিলিন্ডারের মানের মতোই এই আনুষঙ্গিক সরঞ্জামগুলোর মানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া আমরা বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় আমাদের প্ল্যান্টগুলোতে নিয়মিত অগ্নি ও নিরাপত্তা মহড়া পরিচালনা করি।

প্রথম আলো:

দেশে যানবাহনের জ্বালানি (অটোগ্যাস) ও শিল্পকারখানায় এলপিজির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এই উদীয়মান বাজারের চাহিদা ধরতে আপনাদের বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনা কী?

হারুন ওর্তাচ: অটোগ্যাস এখন জনপ্রিয় বিকল্প জ্বালানি হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে, কারণ এটি পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী। পাশাপাশি যেসব এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট রয়েছে, সেখানে শিল্প ও বাণিজ্যিক ব্যবহারকারীরা এলপিজিকে মূল জ্বালানি হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। আধুনিক আবাসন প্রকল্পে রেটিকুলেশন গ্যাস সরবরাহের বাজারটাও দ্রুত বড় হচ্ছে।

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় আমাদের মাদার টার্মিনাল (১৬,০০০ মেট্রিক টন অন-সাইট স্টোরেজ) এবং রূপগঞ্জের স্যাটেলাইট টার্মিনাল আমাদের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভিত্তি দিয়েছে। এখন সারা দেশে আমাদের অটোগ্যাস স্টেশন ও বিতরণ নেটওয়ার্ক দ্রুত সম্প্রসারণ করছি, যাতে এই খাতগুলো যখন পুরোদমে বাড়তে শুরু করবে, আমরা যেন তখনই সর্বোচ্চ সেবা দিতে প্রস্তুত থাকি।  আমাদের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান যেখানেই হোক না কেন, প্রতিটি প্রান্তিক গ্রাহক যেন শতভাগ নির্ভরযোগ্যতার সঙ্গে সঠিক সময়ে ইউনাইটেড আইগ্যাসের এলপিজি সিলিন্ডারটি হাতে পান।