প্রতি টন রডে খরচ বাড়বে ১১ থেকে ১২ হাজার টাকা, সংবাদ সম্মেলনে বিএসএমএর দাবি

বিএসএমএ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই খাতের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। আজ বুধবার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবেছবি: প্রথম আলো

আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ভ্যাট, শুল্ক ও কর বৃদ্ধির কারণে দেশের ইস্পাতশিল্প বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছে এই খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ)। সংগঠনটি বলছে, বিদ্যুতের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি ও নতুন কর–শুল্ক কাঠামোর সম্মিলিত প্রভাবে প্রতি টন রড উৎপাদনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ খরচ মিলিয়ে অতিরিক্ত ১১ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় বাড়তে পারে। যার সরাসরি প্রভাব গ্রাহকের ওপর পড়বে। তাতে বিক্রি আরও কমে যাবে।

আজ বুধবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম এ কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে দেশের ইস্পাতশিল্পের সংকট উত্তরণে সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেছে সংগঠনটি। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে ইস্পাতশিল্পের ওপর প্রস্তাবিত অতিরিক্ত ভ্যাট, শুল্ক ও কর প্রত্যাহার, বিক্রয় পর্যায়ের ভ্যাট ও স্থানীয় স্ক্র্যাপের ওপর অতিরিক্ত ভ্যাট বাতিল, উৎপাদনসংশ্লিষ্ট কাঁচামালের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত কর–শুল্ক পুনর্বিবেচনা, টার্নওভার কর ১ শতাংশের বদলে আগের মতো শূন্য দশমিক ৬ শতাংশে ফিরিয়ে আনা ও উন্নয়ন বাজেট দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিল্পপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি।

সংবাদ সম্মেলনে বিএসএমএর সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এবারের বাজেটে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ রয়েছে। তবে একই সময়ে ইস্পাতশিল্পের ওপর নতুন করে ভ্যাট, শুল্ক ও কর আরোপ করায় শিল্পটির টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। দেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৫০ লাখ টন রডের চাহিদা থাকলেও উৎপাদন সক্ষমতা এক কোটি টনের বেশি। ফলে অধিকাংশ কারখানা ৫০ শতাংশের কম সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং উদ্যোক্তাদের আর্থিক চাপে ফেলছে।

সংগঠনটি জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতি টন রড উৎপাদনে অতিরিক্ত ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি বন্দর মাশুল, রিভার ডিউজ, ল্যান্ডিং চার্জ, পরিবহন ব্যয় ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে আরও প্রায় ৩ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে। এ ছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে বিক্রয় পর্যায়ে ভ্যাট বৃদ্ধি, স্থানীয় স্ক্র্যাপের ওপর অতিরিক্ত ভ্যাট, ফেরো–অ্যালয়, রিফ্র্যাক্টরি সামগ্রী, স্পেয়ার পার্টস ও অন্যান্য উপকরণের ওপর কর ও শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। তাতে প্রতি টন রড উৎপাদনে আরও প্রায় ২ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা খরচ বাড়তে পারে।

সংবাদ সম্মেলনে বিএসএমএর নেতারা দাবি করেন, বাজেটে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে প্রত্যক্ষ উৎপাদন ব্যয় পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়বে। অন্যদিকে বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকের কম ব্যবহার, ওভারহেড ব্যয়, ব্যাংকঋণের সুদ ও স্থায়ী ব্যয় বৃদ্ধির কারণে পরোক্ষভাবে আরও পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকার অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে। সব মিলিয়ে প্রতি টন রডে উৎপাদনে অতিরিক্ত ব্যয় ১১ থেকে ১২ হাজার টাকায় পৌঁছাতে পারে।

বিএসএমএর নেতারা বলেন, সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো উৎপাদন ও শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন। সড়ক, সেতু, ফ্লাইওভার, রেলপথ, মেট্রোরেল, সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল, আবাসন ও অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন হলে রডের চাহিদা বাড়বে। এতে মিলগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারবে।

মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বড় অবকাঠামো নির্মাণ ও কার্যাদেশ বন্ধ আছে। কারণ, আগের ঠিকাদারেরা অনেকে গা ঢাকা দিয়েছেন এবং কেউ কেউ বিদেশে চলে গেছেন। এখন নকশা অনুমোদন না হওয়ায় অনেক কাজ আটকে আছে। উন্নয়ন বাজেট দ্রুত ছাড় করে নির্মাণশিল্প বাঁচানোর আহ্বান জানান তিনি।

বিএসএমএর মহাসচিব ও রানি স্টিলের চেয়ারম্যান সুমন চৌধুরী বলেন, শিক্ষা বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু শিক্ষিত জনগোষ্ঠী বের হয়ে যেখানে কাজ করবে, তাদের ওপর করের বোঝা চাপানো হয়েছে। ফলে কর্মসংস্থান তৈরি হবে না। আবার অনেক কারখানা ব্যাংকের দায় শোধ করতে পারবে না।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সোনারগাঁও স্টিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মারুফ মহসিন, সিএসআরএমের পরিচালক জাকারিয়াসহ এ খাতের বিভিন্ন উদ্যোক্তা।