মোটরসাইকেল শিল্পের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও এর বিকাশকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
বিজয় কুমার মণ্ডল: গত দশকে বাংলাদেশের মোটরসাইকেল শিল্পে একটি ইতিবাচক রূপান্তর ঘটেছে। একসময়ের আমদানিনির্ভর বাজারটি এখন দেশীয় উৎপাদন, ভেন্ডর উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে স্বয়ংসম্পূর্ণ হচ্ছে। এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জাতীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে।
তবে সাম্প্রতিক উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ ও ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হারের কারণে বাজারে কিছুটা স্থবিরতা চলছে। তা সত্ত্বেও মোটরসাইকেল এখনো দেশের সবচেয়ে সাশ্রয়ী ব্যক্তিগত পরিবহনমাধ্যম। দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতির প্রসারের কারণে দীর্ঘ মেয়াদে এই শিল্পের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এআইটি প্রত্যাহার করা হলেও ১৫০ সিসির বেশি ক্ষমতার বাইক নিবন্ধনে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এটি বাজারে কেমন প্রভাব ফেলবে?
বিজয় কুমার মণ্ডল: অগ্রিম আয়কর বা এআইটি প্রত্যাহার অবশ্যই একটি ইতিবাচক ও ব্যবসাবান্ধব পদক্ষেপ। এটি ক্রেতাদের আর্থিক স্বস্তি দেবে এবং মোটরসাইকেল মালিকানার প্রাথমিক ব্যয় কমাবে।
অন্যদিকে ১৫০ সিসির বেশি ক্ষমতার মোটরবাইকে টিআইএন বাধ্যতামূলক করায় বাজারের একটি অংশে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। তবে এর গ্রাহকদের ক্রয়ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে বেশি। রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আরও সুশৃঙ্খল করতে দীর্ঘ মেয়াদে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও দেশীয় যানবাহনে উৎসাহ দেওয়া।
স্থানীয় উৎপাদন বা ভেন্ডর উন্নয়নের ক্ষেত্রে হিরো ব্র্যান্ড বর্তমানে কোন পর্যায়ে রয়েছে? এ ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী?
বিজয় কুমার মণ্ডল: হিরো মোটোকর্প নিলয় বাংলাদেশ স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলায় অন্যতম পথিকৃৎ। আমাদের যশোরের অত্যাধুনিক কারখানায় উন্নত ওয়েল্ডিং ও আধুনিক পেইন্ট শপ আছে। আমাদের লক্ষ্য যন্ত্রাংশ সংযোজনের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী স্থানীয় ভেন্ডর ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা।
গত তিন দশকে ধারাবাহিক শিল্পনীতি ও ভেন্ডর উন্নয়নের মাধ্যমে ভারত আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মোটরসাইকেল উৎপাদন ও রপ্তানি কেন্দ্র। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশও যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তির জন্য ভারতের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। আমাদের দেশেও একই সম্ভাবনা আছে, তবে কাঁচামালের সহজলভ্যতা, দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও ভেন্ডরদের জন্য বিনিয়োগ সহায়তা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে একটি শক্তিশালী স্থানীয় উৎপাদন ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে সরকার, শিল্প উদ্যোক্তা ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি অংশীদারদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বাজারের সাময়িক স্থবিরতা উত্তরণে কেমন নীতিসহায়তা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
বিজয় কুমার মণ্ডল: বাজারকে পুনরুজ্জীবিত করতে আমাদের কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত নজর দেওয়া প্রয়োজন—মোটরসাইকেল ক্রয়ে সহজ ও সাশ্রয়ী ফাইন্যান্সিং সুবিধা নিশ্চিত করা। দেশীয় উৎপাদনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল শিল্পনীতি প্রণয়ন। ভেন্ডর উন্নয়ন ও প্রযুক্তি স্থানান্তরে বিশেষ প্রণোদনা। পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়া।
যেকোনো শিল্পের টেকসই বিকাশের জন্য নীতিগত ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। এ ছাড়া মনে রাখা দরকার—মোটরসাইকেল এখন আর বিলাসদ্রব্য নয়, বরং গণপরিবহনের ঘাটতি পূরণে সাধারণ মানুষের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। উপরন্তু একটি বাইকের চূড়ান্ত মূল্যের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ শুল্ক ও কর হিসেবে রাজস্ব আয় হয়। তাই এই খাতকে নিয়ন্ত্রণের চেয়ে নীতিসহায়তা দেওয়া বেশি জরুরি।
নতুন প্রজন্মের ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে হিরো ব্র্যান্ডের ভবিষ্যৎ পণ্য পরিকল্পনা কী?
বিজয় কুমার মণ্ডল: আজকের তরুণ প্রজন্ম শুধু একটি বাহন চায় না, তারা প্রযুক্তি, স্টাইল, স্মার্ট কানেকটিভিটি ও নিরাপত্তা খোঁজে। হিরো মোটোকর্পের মূল দর্শন হলো ‘সবার জন্য প্রযুক্তি’। আমরা প্রিমিয়াম ফিচারগুলো এন্ট্রি ও কমিউটার সেগমেন্টের সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে নিয়ে এসেছি।
আমাদের ১০০ ও ১২৫ সিসি বাইকে ডিস্ক ব্রেক, এলইডি হেডলাইট, ফুয়েল ইনজেকশন প্রযুক্তি ও এবিএস ব্রেকিং সিস্টেম যুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে হিরোর উদ্ভাবিত আইথ্রিএস প্রযুক্তি জ্বালানি সাশ্রয় করছে। ভবিষ্যতে আমরা আরও স্মার্ট ডিজিটাল কনসোল, উন্নত নিরাপত্তা ও পরিবেশবান্ধব পাওয়ারট্রেন নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছি।
আগামী কয়েক বছরে এই খাতের প্রবৃদ্ধি নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী? সরকারের কাছে প্রধান চাহিদা কী?
বিজয় কুমার মণ্ডল: দেশে এখনো মোটরসাইকেল মালিকানার হার অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের চেয়ে কম, তাই প্রবৃদ্ধির বড় সুযোগ রয়েছে। দ্রুত নগরায়ণ এবং ই–কমার্স বা ডেলিভারি অর্থনীতির বিকাশ এই খাতকে আরও এগিয়ে নেবে।
সরকারের কাছে আমাদের প্রধান প্রত্যাশা হলো একটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল শিল্পনীতি। হিরো নিলয় ইতিমধ্যেই হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার ও রাজস্বে বড় অবদান রেখে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন করেছে। সঠিক নীতিগত সহায়তা পেলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মোটরসাইকেল উৎপাদন ও রপ্তানি হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।