লাইটার জাহাজ ব্যবস্থাপনায় স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু

স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির উদ্বোধন করেন নৌপরিবহন অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ও শিপ সার্ভেয়ার মির্জা সাইফুর রহমান। আজ শুক্রবার সকালে বিডব্লিউটিসিসির কার্যালয়েছবি: জাহাজী লিমিটেড

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ নদীপথে বছরে প্রায় সাড়ে সাত কোটি টন পণ্য পরিবহন হয় লাইটার জাহাজে। এই বিপুল পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত প্রায় দেড় হাজার লাইটার জাহাজের ব্যবস্থাপনায় এত দিন কোনো আধুনিক বা সমন্বিত প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থা ছিল না। ফলে পণ্য পরিবহনে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতো, আবার বড় জাহাজ বহির্নোঙরে অলস পড়ে থাকায় আমদানিকারকদের জরিমানাও গুনতে হতো।

এই পরিস্থিতি বদলাতে লাইটার জাহাজ ব্যবস্থাপনায় স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু হয়েছে। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের উদ্যোগে লাইটার জাহাজ পরিচালনাকারী বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো–অর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) নতুন এই পদ্ধতি কার্যকর করেছে। এতে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন খাতের প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান জাহাজী লিমিটেড।

আজ শুক্রবার সকালে বিডব্লিউটিসিসির কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির উদ্বোধন করেন নৌপরিবহন অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ও শিপ সার্ভেয়ার মির্জা সাইফুর রহমান। বিডব্লিউটিসিসির আহ্বায়ক সফিক আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন নৌবাণিজ্য দপ্তরের নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন শেখ মো. জালাল উদ্দিন গাজী, বিডব্লিউটিসিসির মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ, লিটমন্ড শিপিংয়ের পরিচালক বেলায়েত হোসেন এবং চট্টগ্রাম ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট লোকাল এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নরোত্তম চন্দ্র সাহা।

সনাতন পদ্ধতি থেকে ডিজিটালে
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বড় জাহাজে খোলা ও বস্তাবন্দী অবস্থায় পণ্য আসার পর তা খালাসের জন্য লাইটার জাহাজ বুকিং দিতে হয়। এত দিন এ জন্য আমদানিকারকের প্রতিনিধিদের সশরীর উপস্থিত হয়ে বার্থিং মিটিংয়ে আবেদন করতে হতো। বরাদ্দ পাওয়ার পর বড় জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য স্থানান্তর করে নির্ধারিত ঘাটে নিয়ে খালাস করা হতো।

পণ্য খালাস শেষে খালি জাহাজ আবার চট্টগ্রামে ফিরে এলে নতুন ভাড়া পাওয়ার জন্যও বিডব্লিউটিসিসি কার্যালয়ে সরাসরি গিয়ে সিরিয়াল নিতে হতো। একাধিক দপ্তরে উপস্থিত হয়ে হাতে–কলমে আবেদন জমা দেওয়াই ছিল একমাত্র উপায়। পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল সনাতন ও কাগজনির্ভর।

এই পদ্ধতির সুযোগে প্রভাবশালী মালিকদের জাহাজ পরে এসেও আগে সিরিয়াল পাওয়ার অভিযোগ ছিল। আবার কোনো কোনো আমদানিকারক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বা কম জাহাজ বরাদ্দ পেতেন। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।

মোবাইল অ্যাপে সিরিয়াল
নতুন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকায় পৌঁছানোর পর জাহাজের কর্মীরা মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে এক মিনিটের মধ্যেই ডিজিটাল সিরিয়াল নিশ্চিত করতে পারবেন। এতে সশরীর উপস্থিত থাকার ঝামেলা কমবে। সময় ও খরচ সাশ্রয় হবে।

‘আগে এলে আগে পাবেন’ ভিত্তিতে সিরিয়াল নিশ্চিত করতে জিও–ফেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে সিরিয়াল ভাঙা বা প্রভাব খাটানোর সুযোগ থাকবে না।
জাহাজমালিকেরা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বার্থিং তালিকা দেখতে পারবেন। জাহাজে পণ্য বোঝাই ও খালাসের সর্বশেষ অবস্থা এবং জরুরি আবহাওয়ার বার্তাও সরাসরি মোবাইলে পৌঁছাবে। মাঝনদী বা সমুদ্রে দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত সহায়তার জন্য অ্যালার্ম–সুবিধাও রাখা হয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও নিকটবর্তী জাহাজকে সতর্ক করবে।

পণ্য পরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাবে
স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির সুফল সম্পর্কে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর মো. শফিউল বারী প্রথম আলোকে বলেন, লাইটার জাহাজ চলাচল ও বরাদ্দে যে বিশৃঙ্খলা রয়েছে, নতুন পদ্ধতি চালু হলে তা দূর হবে। এই খাতে স্বচ্ছতা আসবে। জাহাজমালিক ও আমদানিকারক—উভয় পক্ষই সুবিধা পাবেন।

শফিউল বারী বলেন, বর্তমানে কোন জাহাজে কী পণ্য আছে বা কোথায় অবস্থান করছে, তা জানার সুযোগ সীমিত। নতুন ব্যবস্থায় কোন রুটে কতটি জাহাজ চলছে, কী পণ্য বহন করছে এবং কোথায় আছে—এসব তথ্য পাওয়া যাবে। কোনো আমদানিকারক জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করলে সেটিও নজরে আসবে। এতে অধিদপ্তরের পক্ষে দ্রুত তদারকি সম্ভব হবে।

বিডব্লিউটিসিসির মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ বলেন, লাইটার জাহাজ ব্যবস্থাপনার এই সফটওয়্যার অনেক মালিক আগে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করতেন। এখন সব জাহাজমালিককে বাধ্যতামূলকভাবে এই সফটওয়্যার ব্যবহার করতে হবে।

জাহাজী লিমিটেডের উদ্যোক্তা কাজল আবদুল্লাহ বলেন, নৌ খাতের এই প্রযুক্তি নিয়ে সাড়ে তিন বছর কাজ করার পর পরীক্ষামূলকভাবে সফল হওয়ায় এটি চালু করা হয়েছে। শিগগিরই এর সুফল পাবে এই খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো।
জাহাজী লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার অভিনন্দন জোতদার বলেন, লাইটার জাহাজ ব্যবস্থাপনার পুরো প্রক্রিয়া এখন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার আওতায় আসছে। এতে পক্ষপাত বা প্রভাব খাটানোর সুযোগ থাকবে না।