গ্যাসের দাম এক লাফে ৮৭ থেকে ১৭৮ শতাংশ বাড়ানোর কারণে ছোট-মাঝারি ও বড় শিল্পের অনেক ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করেন। উৎপাদন খরচ কতটা বাড়বে, তা নিয়েও হিসাব-নিকাশ শুরু করেছেন শিল্পমালিকেরা। তাতে কেউ কেউ হতাশাও প্রকাশ করেছেন। বাড়তি দাম দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাওয়া নিয়েও রয়েছে উদ্যোক্তাদের শঙ্কা। তবে ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা বিষয়টি নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক। কারণ, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণার পর জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারা (ব্যবসায়ীরা) যদি নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ চায়, তাহলে যে মূল্যে কিনে আনব, সেই মূল্যই তাদের দিতে হবে। এখানে ভর্তুকি দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।’ প্রধানমন্ত্রীর এই মনোভাবের কারণে ব্যবসায়ীরা ধরে নিয়েছেন, গ্যাসের দাম কমানোর দাবি জানিয়ে খুব একটা লাভ হবে না। 

এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘সব শিল্পের জন্য গ্যাসের একই দাম নির্ধারণ করা কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। আমরা ক্যাপটিভের ক্ষেত্রে ৫৭ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির অনুরোধ করেছিলাম। একই হারে অন্যান্য শিল্পেও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করলে তেমন কোনো সমস্যা হতো না। আমরা দু-এক দিনের মধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে গ্যাসের দাম সহনীয় করার বিষয়ে কথা বলব।’

গত ২০ ডিসেম্বর এফবিসিসিআই নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের শর্তে ক্যাপটিভের জন্য গ্যাসের প্রতি ইউনিটের জন্য ২৫ টাকা দাম প্রস্তাব করে।

প্রক্রিয়াজাত খাদ্য প্রস্তুতকারক রপ্তানিমুখী মাঝারি পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান হিফস অ্যাগ্রোর চট্টগ্রামের পাথরঘাটা ও চাক্তাই এবং নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে তিনটি কারখানা রয়েছে। পাথরঘাটার কারখানায় মাসে ৬০ হাজার ও চাক্তাই কারখানায় মাসে ৫০ হাজার টাকা গ্যাস বিল দিতে হয়। গ্যাসের নতুন দাম কার্যকর হলে সেটি বেড়ে হবে যথাক্রমে ১ লাখ ৮০ হাজার ও দেড় লাখ টাকা।

হিফস অ্যাগ্রোর সিইও ছৈয়দ মোহাম্মদ শোয়াইব হাছান বলেন, ‘গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়বে প্রায় আড়াই শতাংশ। এমনিতেই আমরা বিভিন্ন সংকটে রয়েছি। ভারতে চিনির দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫২ টাকা। আর আমাদের দেশে কিনতে হচ্ছে ১০০ টাকার বেশি দামে। মুম্বাই থেকে সৌদি আরবের জেদ্দায় কনটেইনারভাড়া ৭০০-৮০০ ডলার। আর চট্টগ্রাম থেকে ভাড়া ১ হাজার ৮০০ ডলার। তাতে ভারতের চেয়ে আমাদের বিস্কুটের দাম দ্বিগুণ পড়ে যায়।’

গাজীপুরের চন্দ্রায় টাওয়েল টেক্স লিমিটেড বিভিন্ন ধরনের টেরি টাওয়েল পণ্য উৎপাদিত হয়। তাদের বার্ষিক রপ্তানির পরিমাণ ৪০ লাখ ডলার। নতুন করে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের উৎপাদন খরচ বাড়বে ২০ দশমিক ৮৮ শতাংশ। বর্তমানে ভোর ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত গ্যাসের চাপ থাকছে না। অবস্থার উন্নতি না হলে গ্যাসের নতুন দামে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে ৩১ শতাংশ। 

এমন তথ্যই দিলেন টাওয়েল টেক্সের এমডি এম শাহাদাৎ হোসেন। তিনি বলেন, ‘হোম টেক্সটাইল খাতে আমাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান। তারা ১ ডলারের বিপরীতে ২৫৬ রুপি পায়। আমরা পাই ১০২ টাকা। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পর আমরা প্রতিযোগিতায় আরও পেছনে পড়ে যাব।’

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পর সিরামিক, ইস্পাত, বস্ত্রকল, তৈরি পোশাকশিল্পসহ কয়েকটি খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে প্রথম আলোর এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁদের তথ্য অনুযায়ী, সিরামিক পণ্যের উৎপাদন খরচ ২০-২৫ শতাংশ, টনপ্রতি রডে ১২০০-৩০০০ টাকা, প্রতি কেজি সুতা উৎপাদনে গ্যাসের খরচ ২৫ সেন্ট থেকে ৪৯ সেন্টে দাঁড়াবে। 

জানতে চাইলে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মানোয়ার হোসেন বলেন, ‘গ্যাসের নতুন দাম আমাদের জন্য একটা “শক”। আমাদের হিসাবে প্রতি টন রডের দাম তিন হাজার টাকা বাড়বে।’ 

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ছোট, মাঝারি ও বড়—সব শিল্পের জন্য গ্যাসের দাম একই করা ন্যায্যতার পরিপন্থী। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানা এত বেশি টাকায় গ্যাস কেনার মতো অবস্থায় নেই। নতুন এ দাম কার্যকর হলে ছোট ও মাঝারি শিল্পের অনেকেই টিকে থাকতে পারবে না।