ভবনের আধুনিক অবয়ব

রাজধানীর গুলশানে আধুনিক স্থাপত্যের নান্দনিক নিদর্শন শান্তা হোল্ডিংসের নির্মিত ‘গ্লাস হাউস’। চারপাশে কাচঘেরা আরও ভবন আছে।প্রথম আলো

রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে হাঁটলে এখন দুই পাশে চোখে পড়ে সারিবদ্ধ সব চোখধাঁধানো সুউচ্চ ভবন। রঙিন কিংবা স্বচ্ছ গ্লাসে মোড়ানো এসব ভবনের নির্মাণশৈলী যেকোনো পথচারীর দৃষ্টি কেড়ে নেয়। আধুনিক স্থাপত্যে এখন আর শুধু ইট-কংক্রিটের দেয়াল নয়; বরং নান্দনিকতার কেন্দ্রে রয়েছে গ্লাস ও অ্যালুমিনিয়ামের অনন্য যুগলবন্দী। এই দুই নির্মাণ উপকরণের সঠিক ব্যবহার শুধু ভবনের বাহ্যিক সৌন্দর্যই বাড়ায় না; বরং ভেতরের পরিবেশকে করে তোলে স্বাচ্ছন্দ্যময় ও পরিবেশবান্ধব।

জনপ্রিয়তার শীর্ষে গ্লাস ও অ্যালুমিনিয়াম

বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক ভবনের প্রায় ৯০ শতাংশ উইন্ডো বা ফ্রেমিং ব্যবস্থায় অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহার হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও এই প্রবণতা এখন দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে ঢাকার ধানমন্ডি, মতিঝিল, উত্তরা, গুলশান ও বনানীর মতো এলাকাগুলোতে নির্মিত নতুন ভবনগুলোর ৭০-৮০ শতাংশেরই বহিরাবরণের একটি বড় অংশজুড়ে গ্লাসের ব্যবহার (গ্লাস ফেসেড) দেখা যায়। বাণিজ্যিক টাওয়ার, করপোরেট অফিস ছাড়িয়ে এখন বিলাসবহুল আবাসন ও শপিং কমপ্লেক্সগুলোতেও গ্লাস এবং অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেমের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশবান্ধব সমাধান

আধুনিক গ্লাস ও অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহারের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো ভবনকে ‘এনার্জি এফিশিয়েন্ট’ বা জ্বালানিদক্ষ করা। বর্তমানে উন্নত গ্লাস প্রযুক্তিতে লো-ই, লেমিনেটেড এবং ইনসুলেটেড গ্লাস ব্যবহার হচ্ছে। ডাবল গ্লেজড বা দুই স্তরের কাচের প্যানেল, যার ভেতরে গ্যাস থাকে, যা বাইরের তাপ ভেতরে আসতে বাধা দেয়।

গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর গ্লাস ব্যবহারে ভবনের কৃত্রিম আলো এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমে আসে, যা সামগ্রিকভাবে ভবনের মোট জ্বালানি ব্যবহার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনতে পারে। এ ছাড়া ‘থার্মাল ব্রেক’ অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেম তাপরোধী ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে, যা বাংলাদেশের মতো উষ্ণ আবহাওয়ার দেশের জন্য অত্যন্ত কার্যকর।

স্থাপত্যশৈলী ও স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা

ভবনের নকশায় নান্দনিকতা ও প্রাকৃতিক আলোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্র্যাক্সিস আর্কিটেক্টসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী স্থপতি নাজলী হোসেন বলেন, ভবনের স্থাপত্যশৈলীতে গ্লাস ও অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহারের দুটি দিক রয়েছে। গ্লাস যদি কোনো স্ক্রিন বা শেডিং ডিজাইন ছাড়া উন্মুক্ত থাকে, তবে সরাসরি সূর্যের আলো ভেতরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে পূর্ব-পশ্চিমমুখী ভবনে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নাজলী হোসেন আরও যোগ করেন, স্থপতিরা নান্দনিকতা ও প্রাকৃতিক আলোর প্রাপ্যতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। কারণ, মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর এর গভীর প্রভাব রয়েছে। তবে দৃষ্টিনন্দন ও বসবাসযোগ্য আধুনিক নগরের জন্য সঠিকভাবে গ্লাসের ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং জানালা বা কার্টেন গ্লাসে প্রয়োজনীয় শেডিং বা স্ক্রিন ডিজাইনের সমন্বয় করা জরুরি।

নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বের নিশ্চয়তা

আধুনিক ভবনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন টেম্পার্ড গ্লাস এবং লেমিনেটেড গ্লাস ব্যবহার করা হচ্ছে। টেম্পার্ড গ্লাস ভেঙে গেলেও তা ছোট ছোট দানাদার টুকরায় পরিণত হয়, যা জানমালের ক্ষতি কমায়। অন্যদিকে লেমিনেটেড গ্লাস শব্দ নিরোধক হিসেবে কাজ করে, যা ব্যস্ত নগরজীবনে প্রশান্তি নিশ্চিত করে। অ্যালুমিনিয়াম যেহেতু হালকা ও ক্ষয়রোধী, তাই দীর্ঘ বছর ধরে এটি তার উজ্জ্বলতা ও কার্যক্ষমতা বজায় রাখে।

টেকসই লক্ষ্য অর্জনে অবদান

জ্বালানিসাশ্রয়ী গ্লাস ও অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেমের ব্যবহার কেবল একটি ভবনের জন্যই নয়; বরং সামগ্রিকভাবে কার্বন ফুটপ্রিন্ট হ্রাসে বড় ভূমিকা পালন করে। বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সঠিক নকশায় জানালা রাখা হলে তা প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি ব্যয় কমাতে পারে। এটি বর্তমানে বৈশ্বিক পরিবেশগত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 দেশের আবাসন খাতের এই বিবর্তনকে স্বাগত জানিয়ে অন্যতম শীর্ষ রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান শেল্​টেক্​ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ বলেন, সঠিক নকশা ও প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে গ্লাস ও অ্যালুমিনিয়ামের ব্যবহার ভবনে নান্দনিকতা, জ্বালানি–সাশ্রয় এবং পরিবেশবান্ধব—তিনটি দিকই একসঙ্গে নিশ্চিত করা সম্ভব। সব নির্মাণ প্রকল্পে এ ধরনের উপকরণের সুচিন্তিত ব্যবহারের মাধ্যমে নগরবাসীকে টেকসই ও দৃষ্টিনন্দন ভবন উপহার দিতে শেল্​টেক্​ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

আগামীর সম্ভাবনা

দ্রুত নগরায়ণের এই যুগে গ্লাস ও অ্যালুমিনিয়াম স্থাপত্য উদ্ভাবনের কেন্দ্রে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে যথাযথ দক্ষতা ছাড়া এর অপরিকল্পিত ব্যবহার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই ভবন নির্মাণ কোডে এসব উপকরণের সঠিক মান তদারকির ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। আগামী দিনগুলোতে স্থাপত্যের আধুনিকায়ন ও টেকসই উন্নয়নের মেলবন্ধনে গ্লাস এবং অ্যালুমিনিয়ামের আভরণে ঘেরা আরও অনেক নান্দনিক ভবনের দেখা মিলবে, এটাই এখন প্রত্যাশা। 

আকিজবশির গ্লাসের বিপণন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক আবু জুবায়েদ মুহাম্মদ রাসেল বলেন, আকিজবশির গ্লাস বাজারে আমূল পরিবর্তন এনেছে। বালু পরিশোধনের মাধ্যমে গ্লাসে আয়রনের পরিমাণ ১২০০ পিপিএম থেকে ৭০০ পিপিএমে নামিয়ে আনা হয়েছে। ফলে গ্লাসের স্বচ্ছতা বেড়েছে। আধুনিক প্রযুক্তিতে মান নিয়ন্ত্রণের ফলে এখন বাবলমুক্ত ও সঠিক পরিমাপের গ্লাস নিশ্চিত করা হচ্ছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে আবু জুবায়েদ বলেন, ‘আমরা ক্রেতাদের সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও বহুমাত্রিক গুণসম্পন্ন গ্লাস দিতে চাই। চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে “লো-ই”, “ইনসুলেটেড”, “ল্যামিনেটেড” গ্লাসসহ অনেক ধরনের উন্নত প্রযুক্তির গ্লাস উৎপাদনে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। আগামী দিনে ভবনের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সব উপকরণের সমাধান দিতে আকিজবশির গ্লাস কাজ করে যাচ্ছে।’