২০২৪–২৫ অর্থবছরের তথ্য
বিলিয়ন ডলার ক্লাবে এখন দেশি-বিদেশি আট শিল্প গ্রুপ
উৎপাদনমুখী খাতে লেনদেনে এগিয়ে এমজিআই, প্রাণ ও আবুল খায়ের গ্রুপ। ছিটকে গেছে বসুন্ধরা।
দেশে উৎপাদনমুখী খাতে বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে আমদানি–রপ্তানিতে বিলিয়ন ডলার বা ১০০ কোটি ডলারের বেশি লেনদেন করেছে আট শিল্প গ্রুপ।
বিলিয়ন ডলার ক্লাবে জায়গা নেওয়া এই আট শিল্প গ্রুপ হলো মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ বা এমজিআই, প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ, আবুল খায়ের গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, টি কে গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ, বিএসআরএম গ্রুপ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়াংওয়ান করপোরেশন। আর আগের অর্থবছর এ তালিকায় থাকলেও সর্বশেষ অর্থবছরে এসে তালিকা থেকে ছিটকে গেছে বসুন্ধরা গ্রুপ।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে শিল্প গ্রুপগুলোর আমদানি ব্যয় এবং রপ্তানি আয় হিসাব করে এ তালিকা তৈরি করেছে প্রথম আলো। তালিকা তৈরিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রকৃত আমদানি ও রপ্তানির হিসাব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। আমদানি পর্যায়ে আমদানিকারকদের ঘোষিত মূল্য হিসাব করা হয়েছে। স্থানীয় আমদানি বা রপ্তানি এ তালিকার হিসাবে রাখা হয়নি। এবার দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিদেশি শিল্প গ্রুপও তালিকায় রাখা হয়েছে।
নতুন নতুন কারখানা গড়ে তোলার কারণে কাঁচামাল আমদানিও বেড়েছে। এ কারণে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের আমদানি–রপ্তানিতে লেনদেন বেড়েছে।মোস্তফা কামাল, চেয়ারম্যান. মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ
বিলিয়ন ডলার ক্লাবে জায়গা নেওয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর গত অর্থবছরে মোট আমদানি–রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৫৪ কোটি মার্কিন ডলার, যা ওই অর্থবছরে দেশের মোট আমদানি–রপ্তানির ১১ শতাংশ। এসব প্রতিষ্ঠান গত অর্থবছরে সরকারকে রাজস্ব দিয়েছে ১৭ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছে সোয়া পাঁচ লাখ মানুষের।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, বসুন্ধরা গ্রুপ ২০২৩–২৪ অর্থবছরে আমদানি–রপ্তানিতে ১১২ কোটি ডলার লেনদেন করে বিলিয়ন ডলার ক্লাবে জায়গা করে নিয়েছিল। তবে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তাদের লেনদেনের পরিমাণ নেমেছে ৫১ কোটি ডলারে। মূলত ভোগ্যপণ্য, ক্লিংকারসহ শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে গ্রুপটির। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর গ্রুপটির নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে দুদক, সিআইডি, এনবিআরসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা অনুসন্ধান শুরু করে।
বিলিয়ন ডলার ক্লাব
বিলিয়ন ডলার ক্লাবে জায়গা নেওয়া তিনটি শিল্প গ্রুপ দেশের রপ্তানিতেও নেতৃত্ব দিচ্ছে। গ্রুপ তিনটি হলো ইয়াংওয়ান, প্রাণ–আরএফএল ও স্কয়ার গ্রুপ। এই তিন প্রতিষ্ঠানেরই আমদানি–রপ্তানিতে গত অর্থবছরে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বাকি পাঁচটি মূলত দেশের আমদানি প্রতিস্থাপক শিল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছে। যার ফলে আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে অনেক পণ্য দেশীয় উৎপাদননির্ভর হচ্ছে। সীমিত আকারে কেউ কেউ রপ্তানিও করছে।
আমরা যেসব খাতে ব্যবসা করি, সেখানে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এসব খাতে আরও বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারলে রপ্তানিতে আরও ভালো করতে পারব।
শীর্ষস্থানে এমজিআই
দেশে উৎপাদনমুখী খাতে বহু বছর ধরে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ বা এমজিআই। গত অর্থবছরে গ্রুপটি ২৩২ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। সরকারকে রাজস্ব দিয়েছে ৫ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা (৪৩ কোটি ডলার)। সব মিলিয়ে বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানিতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যয় হয়েছে ২৭৫ কোটি ডলার। একই সময়ে গ্রুপটি রপ্তানি করেছে প্রায় ১৩ কোটি ডলারের পণ্য। সেই হিসাবে সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে গ্রুপটি আমদানি–রপ্তানিতে লেনদেন করেছে ২৮৩ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই লেনদেন ৩ শতাংশ বেশি।
মেঘনা গ্রুপ প্রতিনিয়ত কারখানা সম্প্রসারণ ও নতুন নতুন খাতে বিনিয়োগ করছে। সমুদ্রগামী জাহাজ, হেলিকপ্টারের বহর বাড়িয়েছে গ্রুপটি। ইস্পাতপণ্য রড তৈরি ও কাচ কারখানায় বিনিয়োগ করেছে গ্রুপটি। প্রতিবছর গ্রুপটিতে নতুন নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে। প্রায় ৫০ বছর আগে উদ্যোক্তা মোস্তফা কামালের হাত ধরে এমজিআই শিল্পগোষ্ঠীর যাত্রা শুরু হয়। গ্রুপটির প্রধান ব্র্যান্ড ‘ফ্রেশ’। গ্রুপটিতে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৪৭ হাজার মানুষের। অস্থায়ী কর্মসংস্থান হয়েছে আরও ১৫–১৭ হাজার মানুষের। সব মিলিয়ে ৬৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে গ্রুপটিতে।
জানতে চাইলে এমজিআইয়ের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, নতুন নতুন কারখানা গড়ে তোলার কারণে কাঁচামাল আমদানিও বেড়েছে। এ কারণে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের আমদানি–রপ্তানিতে লেনদেন বেড়েছে। কারখানা সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগে স্থাপন করা কারখানায় উৎপাদন শুরু হলে কাঁচামাল আমদানি আরও বাড়বে, কর্মসংস্থানও বাড়বে।
দুই ধাপ এগিয়ে দ্বিতীয় প্রাণ–আরএফএল
উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে খুব দ্রুত এগোচ্ছে প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ। এক বছরের ব্যবধানে দুই ধাপ এগিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে উন্নীত হয়েছে গ্রুপটি। এনবিআরের হিসাবে দেখা যায়, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ১৫৯ কোটি মার্কিন ডলারের লেনদেন নিয়ে চতুর্থ অবস্থানে ছিল গ্রুপটি। এক বছরের ব্যবধানে ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে গ্রুপটির, তাতে লেনদেন ছাড়িয়েছে ১৯০ কোটি ডলার। গত অর্থবছরে গ্রুপটির আমদানিতে ব্যয় হয় ১৪৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার। একই সময় রপ্তানি ছিল ৪৪ কোটি ৬১ লাখ ডলার। গ্রুপটিতে কর্মসংস্থান হয়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার লোকের।
তৈরি পোশাকের বাইরে বৈচিত্র্যময় পণ্য রপ্তানিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে গ্রুপটি। তাদের রপ্তানিঝুলিতে আছে প্রায় দেড় হাজার পণ্য। রপ্তানি করার রেকর্ড আছে ১৪৮টি দেশে। আবার দেশীয় বাজারেও সমান পদচারণ শিল্প গ্রুপটির।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘কাঁচামাল ও বিনিয়োগের যন্ত্রপাতি আমদানি এবং বহুমুখী পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের দুই খাতে লেনদেন বেড়েছে। তবে আমরা যেসব খাতে ব্যবসা করি, সেখানে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এসব খাতে আরও বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারলে রপ্তানিতে আরও ভালো করতে পারব। আমাদের দক্ষ মানবসম্পদ কাজে লাগিয়ে আমরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে চাই। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে কর্মযজ্ঞের ব্যাপক সুবিধা তৈরি হয়নি, এমন অঞ্চল যেমন রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া, খুলনা, যশোর ও ভোলায় শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে চাই।’
বাংলাদেশ থেকে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে যদি লিড টাইম দুই থেকে তিন সপ্তাহ কমানো যায়, তাহলে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আরও বাড়বে। এ জন্য অবকাঠামো খাতের উন্নয়ন দরকার।
ভারী শিল্প সম্প্রসারণে আবুল খায়ের গ্রুপ
দেশে ভারী শিল্পের নেতৃত্বে থাকা আবুল খায়ের গ্রুপ গত অর্থবছরে উৎপাদনক্ষমতা সম্প্রসারণ করেছে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে গ্রুপটির ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস কারখানার রড উৎপাদনক্ষমতা ১৮ লাখ টন বাড়িয়ে ৩০ লাখ টনে উন্নীত করা হয়েছে। রড উৎপাদনক্ষমতায় গ্রুপটি এখন শীর্ষে।
রড ছাড়াও সিমেন্ট, ঢেউটিনে বাংলাদেশে ১ নম্বরে রয়েছে গ্রুপটি। এ ছাড়া গুঁড়া দুধে ১ নম্বরে, চা ও টোব্যাকোতে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে গ্রুপটি। স্যানিটারি পণ্য এবং নিত্যব্যবহার্য পণ্যেও গ্রুপটি ভালো ব্যবসা করছে।
গত অর্থবছরে গ্রুপটি শুধু আমদানি পর্যায়ে সরকারকে রাজস্ব দিয়েছে ৩ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা (প্রায় ৩২ কোটি ৭৬ লাখ ডলার)। এই রাজস্বসহ পণ্য আমদানিতে তাদের ব্যয় ১৬০ কোটি ডলার। আবার এক বছরের ব্যবধানে ৭৪ শতাংশ বেড়ে গ্রুপটির রপ্তানি ৭ কোটি ৫৯ লাখ ডলারে উন্নীত হয়েছে। গ্রুপটির রপ্তানি তালিকায় আছে খাদ্যপণ্য, তামাক, সিমেন্ট, ব্যাগ ও চা। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে গ্রুপটি বিলিয়ন ডলার ক্লাবের তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। গ্রুপটির আমদানি–রপ্তানিতে মোট লেনদেন প্রায় ১৬৮ কোটি ডলার।
আবুল খায়ের গ্রুপের যাত্রা শুরু হয়েছিল শিল্পোদ্যোক্তা আবুল খায়েরের হাত ধরে। ১৯৫৩ সালে যাত্রা শুরু হওয়া এই গ্রুপকে শীর্ষে নিয়ে গেছেন আবুল খায়েরের সন্তানেরা। গ্রুপটির হাত ধরে কর্মসংস্থান হয়েছে ৫৫ হাজার মানুষের। বর্তমানে ইস্পাত ছাড়াও সিমেন্ট, শিপিং, সিরামিকসহ বিভিন্ন খাতে ৪০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে গ্রুপটির।
বিদেশি প্রতিষ্ঠান ইয়াংওয়ানও বিলিয়ন ডলারে
উৎপাদনমুখী খাতে বিলিয়ন ডলার আমদানি–রপ্তানির গ্রুপে জায়গা করে নেওয়া একমাত্র বিদেশি শিল্প গ্রুপ ইয়াংওয়ান করপোরেশন। দক্ষিণ কোরীয় ব্যবসায়ী কিহাক সাংয়ের মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠান শতভাগ রপ্তানিনির্ভর পণ্য উৎপাদন করে।
বাংলাদেশের শীর্ষ রপ্তানিকারক এই শিল্প গ্রুপটি গত অর্থবছরে ৫৫ কোটি ডলারের কাঁচামাল আমদানি করেছে। রপ্তানি করেছে ৯৭ কোটি ডলারের পণ্য। ইয়াংওয়ানের প্রচ্ছন্ন রপ্তানিও রয়েছে।
ইয়াংওয়ানের যাত্রা শুরু হয়েছে প্রায় ৪৫ বছর আগে চট্টগ্রাম থেকে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কোরিয়ান ইপিজেড ইয়াংওয়ানের হাত ধরেই যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় ইয়াংওয়ানের কারখানাগুলোয় কাজ করেন ৭৩ হাজারের বেশি লোক।
রপ্তানির সম্ভাবনা নিয়ে জানতে চাইলে ইয়াংওয়ান করপোরেশনের চেয়ারম্যান কিহাক সাং প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে বৈশ্বিক ব্যবসায়িক পরিবেশের কিছুটা অবনতি ঘটছে। ফলে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি প্রবৃদ্ধির সামগ্রিক পূর্বাভাস ততটা আশাব্যঞ্জক নয়। এরপরও বাংলাদেশ থেকে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে যদি লিড টাইম (পণ্যের ক্রয়াদেশপ্রাপ্তি থেকে জাহাজীকরণের সময়পর্ব) দুই থেকে তিন সপ্তাহ কমানো যায়, তাহলে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আরও বাড়বে। এ লক্ষ্য অর্জনে বন্দরের কার্যক্রম, শুল্কপ্রক্রিয়া, শিপিংসহ অবকাঠামো খাতের উন্নয়ন দরকার।
সামনের দিনগুলোয় স্কয়ার গ্রুপের আমদানি-রপ্তানি আরও বাড়বে। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী অবস্থায় থাকে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।তপন চৌধুরী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্কয়ার ফার্মা
বহুমুখী বিনিয়োগ সিটি গ্রুপের
ভোগ্যপণ্য শিল্পে নেতৃত্ব দেওয়া সিটি গ্রুপের আমদানি–রপ্তানি খাতে লেনদেন কমেছে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরের তুলনায় গত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তাদের লেনদেন ২২ শতাংশ কমেছে। ভোগ্যপণ্য খাত থেকে বেরিয়ে বৈচিত্র্য আনতে গ্রুপটি একসঙ্গে বহুমুখী খাতে বিনিয়োগ শুরু করেছিল। এ তালিকায় রয়েছে কাগজ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলপিজি, সিমেন্ট খাত, কাজুবাদাম, চা–বাগান ইত্যাদি। তাতে প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে গেছে। তৃতীয় অবস্থান থেকে নেমে বর্তমানে গ্রুপটি বিলিয়ন ডলার ক্লাবে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে।
সিটি গ্রুপ ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ১২৯ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। সরকারকে রাজস্ব দিয়েছে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বা ১৫ কোটি ডলার। আবার এক কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। গ্রুপটির রপ্তানির তালিকায় রয়েছে খাদ্যপণ্য, চা, ভোজ্যতেল, প্রাণিখাদ্য ইত্যাদি। ২০২৩–২৪ অর্থবছরের তুলনায় গত অর্থবছরে তাদের লেনদেন ২২ শতাংশ কমেছে।
শিল্পোদ্যোক্তা ফজলুর রহমানের হাত ধরে ১৯৭২ সালে যাত্রা শুরু হয় সিটি গ্রুপের। গত দুই দশকে গ্রুপটির বহরে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান। গ্রুপটির প্রধান ব্র্যান্ড তীর।
স্কয়ার গ্রুপের ব্যবসা বাড়ছে
স্কয়ার গ্রুপের ব্যবসা বাড়ছে। এক বছরের ব্যবধানে শিল্প গ্রুপটির আমদানি–রপ্তানি খাতে লেনদেন বেড়েছে ১২ শতাংশ। তাতে তালিকায় দুই ধাপ এগিয়ে ষষ্ঠ অবস্থানে উন্নীত হয়েছে গ্রুপটি।
গত অর্থবছরে গ্রুপটি শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে ব্যয় করেছে প্রায় ৭৭ কোটি ডলার। দেশে বাজারজাতের পাশাপাশি রপ্তানি করেছে ৪৩ কোটি ডলারের পণ্য। গ্রুপটির রপ্তানি তালিকায় সিংহভাগই তৈরি পোশাক। এর বাইরে রপ্তানি তালিকায় রয়েছে ওষুধ, প্রসাধন ও খাদ্যপণ্য। গ্রুপটি দেশীয় বাজারেও ওষুধ, নিত্যব্যবহার্য পণ্য বাজারজাত করছে। গ্রুপটিতে কর্মসংস্থান হয়েছে ৮০ হাজারের বেশি মানুষের।
জানতে চাইলে স্কয়ার টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান ও স্কয়ার ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তপন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা আশাবাদী, সামনের দিনগুলোয় স্কয়ার গ্রুপের আমদানি–রপ্তানি আরও বাড়বে। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী অবস্থায় থাকে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। তিনি আরও বলেন, বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি হওয়ার পেছনে স্কয়ার গ্রুপের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা রয়েছে। আমরা আসলে একটি দল হিসেবে কাজ করি। প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতার জন্য সবার মধ্যে সুন্দর সম্পর্ক থাকা গুরুত্বপূর্ণ। স্কয়ারে বহু বছর সেটি থাকায় আমরা প্রত্যেক সদস্যের প্রতি সন্তুষ্ট। আমরা একসঙ্গে বেড়ে উঠেছি। সামনের দিনেও সেভাবেই এগিয়ে যেতে চাই।’
অর্থনীতিতে যে প্রবৃদ্ধি হওয়া দরকার, তা ঠিক রাখতে আইনের শাসনসহ বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো দূর করা দরকার। শেয়ারবাজারও কার্যকর করা দরকার।
টি কে গ্রুপের দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি
গত অর্থবছরে টি কে গ্রুপের আমদানি–রপ্তানিতে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ নিয়ে টানা দুবার বিলিয়ন ডলার ক্লাবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে গ্রুপটি। গত অর্থবছরে গ্রুপটি ১১৪ কোটি ৭৪ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। আমদানির তালিকায় ছিল ভোগ্যপণ্য, বিশেষ করে ভোজ্যতেল, ঢেউটিনের কাঁচামাল ইত্যাদি। গ্রুপটি রপ্তানি করেছে ৪৫ লাখ ডলারের পণ্য। রপ্তানি তালিকায় রয়েছে খাদ্যপণ্য, জুতা, সুতা ও রাসায়নিক।
অর্ধশত বছরের পুরোনো এই শিল্প গ্রুপটির যাত্রা শুরু হয়েছে মোহাম্মদ আবু তৈয়ব ও মোহাম্মদ আবুল কালাম—দুই ভাইয়ের হাত ধরে। বাংলাদেশে অনেক খাতের প্রথম কারখানার সূচনা করেছিলেন এই দুই উদ্যোক্তা। গ্রুপটিতে কর্মসংস্থান হয়েছে ৫০ হাজার লোকের।
জানতে চাইলে টি কে গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মাদ মুস্তাফা হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি স্বাভাবিক ব্যবসার অংশ। গত অর্থবছরে ডলারের দাম স্থিতিশীল থাকায় ধারাবাহিক আমদানি সম্ভব হয়েছে। তবে অর্থনীতিতে যে প্রবৃদ্ধি হওয়া দরকার, তা ঠিক রাখতে আইনের শাসনসহ বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো দূর করা দরকার। শেয়ারবাজারও কার্যকর করা দরকার। তাহলে প্রবৃদ্ধি আরও বাড়বে।
বিএসআরএম, এক খাতেই বিলিয়ন ডলার
লৌহ ও ইস্পাত খাতের ব্যবসা দিয়ে বিলিয়ন ডলার ক্লাবে জায়গা করে নেওয়া গ্রুপ বিএসআরএম। লৌহ ও ইস্পাতশিল্পে রড ও ওয়্যার রডের বহুমুখী পণ্য বাজারজাত করে আসছে গ্রুপটি। নিয়মিত ব্যবসা সম্প্রসারণেও রয়েছে গ্রুপটি।
গত অর্থবছরে গ্রুপটি ১০২ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। প্রায় সবই লোহার কাঁচামাল। তবে গ্রুপটির রপ্তানি নেই। অনিয়মিতভাবে ভারতে রড রপ্তানি করে আসছিল গ্রুপটি। রডের বাজারে মন্দা থাকায় গত অর্থবছরে গ্রুপটির আমদানি–রপ্তানিতে লেনদেন ১১ শতাংশ কমেছে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে গ্রুপটির লেনদেন ছিল ১১৪ কোটি ডলার। ১৯৫২ সালে যাত্রা শুরু করা গ্রুপটির নেতৃত্ব দিচ্ছে এখন তৃতীয় প্রজন্ম।
বিএসআরএম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমের আলিহুসাইন প্রথম আলোকে বলেন, বিএসআরএম গ্রুপ মূলত ইস্পাতপণ্য তৈরির কাঁচামাল আমদানি করে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম আগের তুলনায় কমেছে। এ কারণে আমদানিতে লেনদেনও কমেছে।
বিশ্লেষকের মত
গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, শিল্পায়নের বড় ভিত্তি হলো অভ্যন্তরীণ চাহিদা। বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে ভোক্তার চাহিদার ওপর নির্ভর করে আমদানি প্রতিস্থাপক কারখানা গড়ে তুলেছেন উদ্যোক্তারা, যাঁদের লেনদেন বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। দেশীয় চাহিদা পূরণের মাধ্যমে তাঁরা প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জন করছেন। ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাজারে যাচ্ছেন। উৎপাদনমুখী খাতের উদ্যোক্তারা যাতে উন্নত বন্দর ব্যবস্থাপনা ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ–জ্বালানি সরবরাহ পান, তা নিশ্চিত করা দরকার।