ভারত থেকে সুতা আমদানিতে শুল্কারোপে তাড়াহুড়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে
ভারতসহ অন্য দেশ থেকে কটন সুতা আমদানিতে বন্ড–সুবিধা বাতিল, অর্থাৎ শুল্কারোপ করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ নিয়ে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা ও পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা ছাড়াই তাড়াহুড়া করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এই সুপারিশের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের সুপারিশের প্রক্রিয়াটি দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ ক্ষেত্রে সুতার ক্রেতা তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের মতামত না নিয়ে বস্ত্রকলমালিকদের চাওয়াকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পোশাকশিল্পের মালিকদের। মন্ত্রণালয় গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের পরিসংখ্যান দিয়ে বলেছে, ভারত থেকে তিনটি এইচএস কোডে সুতা আমদানি বেড়েছে। যদিও চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে এসব সুতার আমদানি কমেছে। কারণ, গত বছরের এপ্রিলে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ। বর্তমানে শুধু সমুদ্রবন্দর দিয়ে সুতা আসে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতের সুতার দাম সব সময়ই দেশে তৈরি সুতার চেয়ে ২০ থেকে ২৫ সেন্ট বেশি ছিল। গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সংকট, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে কাঁচামাল আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় দেশের সুতাকলগুলোর উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। তা ছাড়া নগদ সহায়তাও কমিয়ে দেড় শতাংশ করা হয়। তাতে ভারত ও বাংলাদেশের সুতার দামের ব্যবধান আরও বেড়েছে।
জানতে চাইলে বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘বস্ত্র খাতের অদক্ষতার দায় আমাদের কেন নিতে হবে। বন্ড–সুবিধা বাতিল মানে বস্ত্রকলমালিকদের একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ দেওয়া। তাঁরা যে দামে সুতা দেবেন, সেই দামে কিনতে হবে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসার (তৈরি পোশাক) জন্য এমন সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই বুদ্ধিদীপ্ত হতে পারে না।’
তাড়াহুড়া নিয়ে প্রশ্ন
ভারত থেকে আমদানিতে কমাতে ১০–৩০ কাউন্টের কটন ও ব্লেন্ডেড সুতা আমদানিতে ২০ শতাংশ সেফগার্ড শুল্ক আরোপ অথবা বন্ড–সুবিধা বাতিলের দাবি করে গত ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনে একটি চিঠি দেয় বস্ত্রকলমালিকদের সংগঠন বিটিএমএ।
বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ গত রোববার এক বিবৃতিতে দাবি করেন, প্রস্তাব দেওয়ার আগে অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে বিটিএমএ, বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএর নেতারা দেশীয় শিল্পের স্বার্থে একমত হয়েছিলেন, স্থানীয়ভাবে যেসব সুতা শতভাগ উৎপাদন করা সম্ভব, সেগুলো বন্ড–সুবিধার বাইরে আনা যেতে পারে।
সমস্যা সমাধানের জন্য যে পথে হাঁটা হচ্ছে, সেটি যৌক্তিক নয়। ...সরকারের উচিত নিরপেক্ষ সংস্থাকে দিয়ে সমীক্ষা করে ব্যবস্থা নেওয়া।খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, গবেষণা পরিচালক, সিপিডি
বিটিএমএর চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ট্যারিফ কমিশন ৫ জানুয়ারি সংগঠনটির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে। এর পরদিনই ট্যারিফ কমিশন ১০-৩০ কাউন্ট সুতা আমদানি বন্ড–সুবিধার বাইরে রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠায়। এই প্রক্রিয়ার আপত্তি জানিয়ে ৬ জানুয়ারি ট্যারিফ কমিশনকে পৃথক চিঠি দেয় বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ। এরপর সব পক্ষকে নিয়ে ৮ জানুয়ারি সভা করে ট্যারিফ কমিশন। সভায় বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএর নেতারা সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের বিরোধিতা করেন। ফলে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই সভা শেষ হয়। তবে বিষয়টি নিয়ে একটি সমীক্ষার কথা বলেন ট্যারিফ কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবদুল গফুর।
সেই সভার তিন দিন পর, অর্থাৎ ১২ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১০-৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বন্ড–সুবিধা বাতিলের সুপারিশ করে এনবিআরকে। এ ক্ষেত্রে ট্যারিফ কমিশনের ৬ জানুয়ারির সুপারিশ আমলে নেওয়া হয়।
সুপারিশের পেছনে মন্ত্রণালয়ের যুক্তি হচ্ছে, ভারত ও বাংলাদেশের স্পিনিং মিলে প্রতি কেজি সুতার উৎপাদন ব্যয় প্রায় কাছাকাছি, ২ ডলার ৯৩ সেন্ট। পার্শ্ববর্তী দেশটির উৎপাদকেরা সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা পান। ফলে তাঁরা বাংলাদেশে ২ ডলার ৫০ সেন্ট থেকে ২ ডলার ৬০ সেন্টে সুতা রপ্তানি করছেন। অন্যদিকে দেশীয় উৎপাদনকারীরা উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি ও সুতার উৎপাদন মূল্য কমিয়ে পার্শ্ববতী দেশটির উৎপাদকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা টিকেতে পারছেন না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিটিএমএর একজন নেতা জানান, সংগঠনের নেতারা প্রভাব খাঁটিয়ে দ্রুতগতিতে বন্ড–সুবিধা বাতিলের সুপারিশের কাজটি করেছেন।
জানতে চাইলে বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সুতা ও নিট পোশাক—দুটিই দেশের বড় খাত। স্থানীয় মিল সুতা উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করেছে। এটা নষ্ট হয়ে গেলে তারা আর দাঁড়াতে পারবে না। তাই এনবিআরকে সুপারিশ করেছি, যাতে ১০-৩০ কাউন্ট সুতা আমদানিতে বন্ড–সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়।’ অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে কোনো তাড়াহুড়া করা হয়নি। পোশাকশিল্পের মালিকদেরও মত নেওয়া হয়েছে।
কার লাভ, কার ক্ষতি
প্রায় চার দশক ধরে বন্ড–সুবিধায় সুতা আমদানি করছে তৈরি পোশাকশিল্প, বিশেষ করে নিট পোশাক রপ্তানিকারকেরা। এখন বন্ড-সুবিধা প্রত্যাহার হলে ভারতসহ অন্য দেশ থেকে সুতা আমদানিতে তাঁদের প্রায় ৪০ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, বন্ড-সুবিধা বাতিল হলে দেশীয় উৎস থেকে সুতা কিনতে হবে। তখন পোশাক রপ্তানিকারকদের দেশীয় মিল থেকে ৪০ সেন্ট বেশি দামে প্রতি কেজি সুতা কিনতে হবে। সে ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাবে। অন্যদিকে প্রতিযোগিতা না থাকলে সুতাকলমালিকেরা নিজেদের সুতার দাম নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারবেন।
সুতা আমদানিতে বন্ড-সুবিধা বাতিল করলে তার প্রভাব অন্য ক্ষেত্রেও পড়ার শঙ্কা রয়েছে। গত এপ্রিলে বস্ত্রকলমালিকদের অনুরোধে স্থলপথে সুতা আমদানি বন্ধ করেছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ পদক্ষেপের পর স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে তিন দফায় বিধিনিষেধ দিয়েছে ভারত। তাতে চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরে ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি কমেছে সাড়ে ৬ শতাংশ।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, সমস্যা সমাধানের জন্য যে পথে হাঁটা হচ্ছে, সেটি যৌক্তিক নয়। বিকল্প হিসেবে সুতা আমদানিতে অনিয়ম ঠেকাতে চট্টগ্রাম বন্দরে নজরদারি বাড়ানো, গ্যাস-বিদ্যুতের বিলে ভর্তুকি কিংবা কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ সুদহারে ঋণ দেওয়া যেতে পারে। সরকারের উচিত নিরপেক্ষ সংস্থাকে দিয়ে সমীক্ষা করে ব্যবস্থা নেওয়া।