নতুন নিয়মে ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন বেড়েছে, বন্ধ হয়নি অনিয়ম

রাজধানীর পোস্তগোলাতে গড়ে ওঠা লৌহজাত বিভিন্ন যন্ত্র তৈরির কারখানায় কাজ করছেন এক শ্রমিক।ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

গাজীপুরের একটি কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের জন্য যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে গত বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে চেষ্টা করেও আবেদন জমা দিতে পারেনি বাংলাদেশ বিপ্লবী গার্মেন্টস ওয়ার্কার ফেডারেশন। তবে কারখানাটির মালিকপক্ষ অন্য একটি ফেডারেশনের মাধ্যমে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি ইউনিয়নের আবেদন করিয়ে নেয়। এর ১১ দিন পর বিপ্লবী গার্মেন্টস ওয়ার্কার ফেডারেশন আবেদন জমা দিতে সক্ষম হয়। আট দিনের ব্যবধানে দুটি ট্রেড ইউনিয়নই নিবন্ধন পায়।

এ নিয়ে বিপ্লবী গার্মেন্টস ওয়ার্কার ফেডারেশনের সভাপতি সালাউদ্দিন স্বপন প্রথম আলোকে জানান, তাঁদের ইউনিয়ন ঠেকাতে মালিকপক্ষ আরেকটি ইউনিয়ন করিয়েছে। একাধিক ইউনিয়ন থাকলে যৌথ দর-কষাকষি প্রতিনিধি (সিবিএ) নির্বাচন করতে হয়। এর আগে পর্যন্ত কোনো ইউনিয়ন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না।

নতুন নিয়মে ট্রেড ইউনিয়নের নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজ করার পর গাজীপুরের এই কারখানার মতো প্রতি মাসেই বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন হচ্ছে। দেশে গত ১৮ নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ মাসে ১৬৪টি ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন পেয়েছে। এর মধ্যে নতুন নিয়মে নিবন্ধনের সংখ্যাই বেশি।

ন্যূনতম ২০ জন শ্রমিকের সম্মতিতে ইউনিয়ন নিবন্ধনের সুযোগ তৈরি হলেও আগের মতো অনিয়ম হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন শ্রমিকনেতারা। তাঁদের দাবি, ইউনিয়ন নিবন্ধন ঘিরে একধরনের সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন অজুহাতে প্রথম ধাপে ইউনিয়ন নিবন্ধনের আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে না। এতে শ্রম দপ্তরের কিছু কর্মকর্তা জড়িত। এ সুযোগে মালিকপক্ষ অসাধু শ্রমিকনেতাদের দিয়ে পাল্টা ইউনিয়ন গঠনের আবেদন করিয়ে নিচ্ছে। এভাবে প্রতি মাসেই কিছু ফেডারেশন একাধিক ইউনিয়নের নিবন্ধন পাচ্ছে বটে, কিন্তু প্রকৃত ইউনিয়ন নিবন্ধন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

শ্রমিকনেতা বাবুল আখতার প্রথম আলোকে বলেন, এখন নিবন্ধন দ্রুত পাওয়া যাচ্ছে ঠিকই, তবে নিবন্ধন পাওয়া অধিকাংশ ইউনিয়নই মালিকপক্ষের উদ্যোগে গঠিত। এতে অসাধু শ্রমিকনেতাদের ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব ইউনিয়নের সঙ্গে সাধারণ শ্রমিকদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি বলেন, যথাযথ ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে শ্রম দপ্তরের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি বন্ধ করে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

শ্রম অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ১০ হাজারের বেশি নিবন্ধিত ট্রেড ইউনিয়ন রয়েছে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতে ১ হাজার ৫৯৮টি, নির্মাণে ৬৯০টি, বস্ত্রে ১১৬টি, খাদ্যে ৮১টি, অটোমোবাইল ওয়ার্কশপে ৬৮টি, ব্যাংকে ২৭টি এবং জুতাশিল্পে ১৭টি ট্রেড ইউনিয়ন রয়েছে।

নতুন নিয়মে ইউনিয়ন

দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার পর গত নভেম্বরে শ্রম আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। এর ফলে কারখানা বা প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম ২০ জন শ্রমিকের সম্মতিতে ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ তৈরি হয়। গত মাসে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) বিলে এ বিধান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। আগে ইউনিয়ন গঠনে মোট শ্রমিকের ২০ শতাংশের সম্মতির প্রয়োজন হতো।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানে ২০ থেকে ৩০০ শ্রমিক থাকলে ২০ জনের সম্মতি লাগবে। ৩০১ থেকে ৫০০ শ্রমিকের ক্ষেত্রে ৪০ জন, ৫০১ থেকে ১ হাজার ৫০০ শ্রমিকের ক্ষেত্রে ১০০ জন, ১ হাজার ৫০১ থেকে ৩ হাজার শ্রমিকের ক্ষেত্রে ৩০০ জন এবং ৩ হাজারের বেশি শ্রমিক থাকলে ৪০০ জনের সম্মতি লাগে।

নভেম্বরে জারি করা অধ্যাদেশে একটি প্রতিষ্ঠানে পাঁচটি ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ দেওয়া হলেও পাস হওয়া বিলে সেটি কমিয়ে তিনটিতে নামানো হয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠানে একাধিক ইউনিয়ন থাকলে গোপন ব্যালটে ভোটের মাধ্যমে যৌথ দর-কষাকষিতে প্রতিনিধি (সিবিএ) নির্বাচন করতে হবে। আর যদি একটি ইউনিয়ন থাকে, সেটিই সিবিএ হিসেবে বিবেচিত হবে।

সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন নভেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত ১৬টি ইউনিয়নের জন্য আবেদন করেছে। এর মধ্যে ৮টি নিবন্ধন পেলেও বাকিগুলো প্রত্যাখ্যাত হয়। পরে আবার আবেদন করে আরও দুটি ইউনিয়নের নিবন্ধন পায় সেগুলো।

সংগঠনটির সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, প্রকৃত ইউনিয়নের তুলনায় ‘পকেট ইউনিয়ন’বেশি হচ্ছে। মালিকপক্ষ টাকা দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু ফেডারেশনের মাধ্যমে এসব ইউনিয়ন করাচ্ছে। এতে সাহায্য করছেন শ্রম অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা। এ কারণেই ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা বাড়ছে।

অনিয়ম হয় যেভাবে

ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের জন্য আবেদন পড়লে অনেক সময় মালিকপক্ষ দ্রুত নির্দিষ্ট কিছু ফেডারেশনের মাধ্যমে ইউনিয়নের নিবন্ধন করিয়ে নেয়। ইউনিয়নে যেসব শ্রমিকের সই থাকে, তাঁদের অজান্তেই মালিকপক্ষের নিয়ন্ত্রিত ইউনিয়নের সদস্য করা হয়। একজন শ্রমিক একাধিক ইউনিয়নের সদস্য হতে পারেন না, এ অজুহাতে প্রকৃত ইউনিয়নের আবেদন বাতিল হয়ে যায়।

এমন তথ্য দিয়ে একাধিক শ্রমিকনেতা বলেন, ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন ঘিরে শ্রম দপ্তরে অনিয়ম এখন অনেকটাই ‘ওপেন সিক্রেট’। অনেক ক্ষেত্রে নতুন ইউনিয়নের নিবন্ধন আটকে দিতে অর্থ ব্যয় করা হয়। আবার বিপরীতে তিন থেকে চার লাখ টাকা খরচ করে পাল্টা ইউনিয়নের নিবন্ধন নেওয়া হয়।

গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ইউনিটি ফেডারেশনের দেড় শতাধিক কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন রয়েছে। নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত তারা ২৫টি ইউনিয়নের নিবন্ধন পেয়েছে। আরও কয়েকটি আবেদন জমা রয়েছে।

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আরাফাত জাকারিয়া প্রথম আলোকে বলেন, মালিকদের সহযোগিতা থাকায় ইউনিয়ন গঠন সম্ভব হচ্ছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, কিছু ইউনিয়ন মালিকপক্ষের উদ্যোগেও গঠিত হয়েছে।

ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে

শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুছ সামাদ আল আজাদ বলেন, ইউনিয়নের নিবন্ধন সহজ করার পর সংখ্যা বেড়েছে। একটি প্রতিষ্ঠান থেকে একাধিক আবেদন জমা পড়ায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, নতুন আইনে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা বিধিমালা প্রণয়নের সময় দূর করার চেষ্টা করা হবে।