বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাহী কমিটি বা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি, সহসভাপতিসহ সবগুলো পদ সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা থাকছে না। দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) পরিচালনা পর্ষদের সদস্যসংখ্যা ৪৬ থেকে বেড়ে হতে পারে ৪৮। নতুন করে দুইটি সহসভাপতির পদ বাড়ছে।
এ ছাড়া সদস্যদের ফি নির্ধারণের ক্ষমতা পুনরায় বাণিজ্য সংগঠনের কাছে যেতে পারে। এফবিসিসিআইয়ের অধীনে থাকা বাণিজ্য সংগঠনের বার্ষিক চাঁদার পরিমাণও কমতে পারে। এ ছাড়া বাণিজ্য সংগঠনের কোনো সদস্যের একাধিক ভোট থাকলেও নির্বাচনে তিনি একটির বেশি ভোট দিতে পারবেন না। বর্তমানে একজন ব্যবসায়ীর একাধিক সদস্য পদ থাকলে তিনি প্রতিটি সদস্য পদের বিপরীতে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান।
এমন বিধান রেখে বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা-২০২৫ সংশোধনের খসড়া চূড়ান্ত করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। গত সপ্তাহে মন্ত্রণালয় নিজস্ব ওয়েবসাইটে সেই খসড়া বিধিমালা প্রকাশ করা হয় মতামত গ্রহণের জন্য। ২৫ জুলাই পর্যন্ত এ বিষয়ে অংশীজনদের মতামত নেওয়া হবে।
১৯৬১ সালের বাণিজ্য সংগঠন অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০২২ সালে নতুন বাণিজ্য সংগঠন আইন প্রণয়ন করে সরকার। এ আইনের ভিত্তিতে বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা-২০২৫–এর প্রজ্ঞাপন জারি করে বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার। গত বছরের মে মাসে এই প্রজ্ঞাপন জারির পর এফবিসিসিআইয়ের পাশাপাশি ঢাকা চেম্বার, মেট্রোপলিটন চেম্বারসহ বেশ কয়েকটি বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা নিয়ে আপত্তি জানায়। সেই আপত্তির কারণে নতুন করে আবার বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। গত সেপ্টেম্বরে বিধিমালা সংশোধনের বিষয়ে একটি বৈঠক হওয়ার পর প্রক্রিয়াটি শ্লথ হয়ে যায়। আর এই বিধিমালা সংশোধন না হওয়ায় এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরও ভোট হয়নি। কারণ, বিধিমালা সংশোধন চেয়ে একাধিক রিট মামলা হয়।
সব পদে সরাসরি ভোট নয়
বর্তমানে বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাহী কমিটি বা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি, সহসভাপতিসহ সব পদে সরাসরি ভোটের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা শিথিল করা হচ্ছে। খসড়ায় প্রস্তাব করা হয়েছে, বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাহী কমিটি বা পরিচালনা পর্ষদের ভোটাধিকার, নির্বাচন ও নেতৃত্ব–সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সংঘবিধি ও সংঘস্মারক অনুযায়ী করা যাবে।
বাণিজ্য সংগঠনের সংঘবিধি ও সংঘস্মারক সংশোধন প্রক্রিয়া কিছুটা সহজ করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, বাণিজ্য সংগঠনের বার্ষিক সাধারণ সভা বা বিশেষ সাধারণ সভায় তাদের সংঘবিধিতে নির্ধারিত সংখ্যক সদস্যের উপস্থিতিতে এবং তাঁদের মধ্যে ন্যূনতম দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতিতে সংঘবিধি ও সংঘস্মারক সংশোধন প্রস্তাব গৃহীত হবে। তবে সংঘবিধিতে কোনো বিধান না থাকলে বৈধ এক-তৃতীয়াংশ সদস্যের উপস্থিতিতে এবং তাঁদের দুই-তৃতীয়াংশের সম্মতি লাগবে।
বর্তমানে যৌথ চেম্বারের ক্ষেত্রে প্রতি পাঁচজন বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর বিপরীতে ন্যূনতম দুজন বিদেশি ব্যবসায়ী থাকতে হয়। খসড়া প্রস্তাবে তা সংশোধন করে যৌথ চেম্বারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের ন্যূনতম দুজন ব্যবসায়ী রাখার কথা বলা হয়েছে। আর যৌথ চেম্বারের সদস্য কারা হবেন, সেটি সংশ্লিষ্ট চেম্বারের সংঘবিধি অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
এ ছাড়া প্রতিটি বাণিজ্য সংগঠন নিজেদের সংঘস্মারক ও সংঘবিধি অনুসারে ভর্তি ফি ও বার্ষিক চাঁদার পরিমাণ নির্ধারণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে খসড়া বিধিমালায়। গত বছর সংশোধিত বিধিতে এই চাঁদা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল। তবে চাঁদার হার বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা তার বিরোধিতা করেন।
জানতে চাইলে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালায় যেসব সংশোধনী চেয়েছিলাম সেগুলো মোটামুটি খসড়ায় এসেছে। এখন যত দ্রুত সম্ভব সংশোধনী চূড়ান্ত করা প্রয়োজন। সংশোধনী চূড়ান্ত হলে আমরা নির্বাচনে যেতে পারব।’
এফবিসিসিআইয়ে পদ বাড়ছে
টানা ২১ মাস এফবিসিসিআইয়ে কোনো পরিচালনা পর্ষদ নেই। সর্বশেষ ফেডারেশনের পর্ষদ ছিল ৮০ জনের। গত বছরের বিধিমালায় সেই পর্ষদের আকার ৪৬-এ নামিয়ে আনা হয়। তবে নতুন করে দুইটি সহসভাপতি পদ যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে খসড়ায়। একই সঙ্গে মনোনীত পরিচালক নির্বাচনে কিছুটা পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, ৪৮ জনের পর্ষদে সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি, ৪ সহসভাপতি বাদে ৪২ পরিচালকের মধ্যে ৩০ জন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপ থেকে নির্বাচিত হবেন। চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপ থেকে ৫ জন করে ১০ জন মনোনীত পরিচালক থাকবেন। তার বাইরে নারী চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপ থেকে ১ জন করে ২ জন মনোনীত পরিচালক পর্ষদে যুক্ত হবেন। এই ১২ জন মনোনীত পরিচালকের জন্য নির্বাচিত পর্ষদ ২২ জনের নাম সরকারের কাছে পাঠাবে। সরকার মনোনীত পরিচালকদের চূড়ান্ত করবে।
এ ছাড়া ফেডারেশনে দুই বছরের মেয়াদের জন্য গঠিত সাধারণ পরিষদের প্রত্যেক সদস্যকে এককালীন ২০ হাজার টাকা নিবন্ধন ফি দেওয়ার বিধানের বদলে ১০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে খসড়ায়। একই সঙ্গে এফবিসিসিআইয়ের অধীনে থাকা বাণিজ্য সংগঠনের বার্ষিক চাঁদার হার কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। যেমন-ক শ্রেণির চেম্বারের বার্ষিক চাঁদা ১ লাখ থেকে কমিয়ে ৬০ হাজার টাকা এবং ক শ্রেণির বাণিজ্য সংগঠনের বার্ষিক চাঁদা ৭৫ হাজারের বদলে ৪৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
জানতে চাইলে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহসভাপতি আবুল কাসেম হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, ১২ জন মনোনীত পরিচালক সরকার নির্ধারণ করবে—এই বিধানটির মাধ্যমে ফেডারেশনের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা সুযোগ তৈরি করা হলো। এতে করে পদ বেচাকানার বাণিজ্য হবে। এটি আমাদের জন্য খুবই অস্বস্তিকর। আমরা মনোনীত পরিচালক চাই না। আমরা চাই, সবাই সরাসরি ভোটে পরিচালক হোক।’