ব্র্যান্ডিং ও জিআই পণ্যের হাতছানি

হবিগঞ্জে চা বাগানে কাজ করছেন এক শ্রমিকছবি: প্রথম আলো

শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশের চা-শিল্প বর্তমানে উৎপাদনে সফল হলেও বৈচিত্র্যকরণ ও বিশ্ববাজারে ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠায় জোরালো অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। যেখানে শ্রীলঙ্কা বা ভারতের মতো দেশগুলো নিজস্ব চায়ের ব্র্যান্ডিং ও ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি কাজে লাগিয়ে বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্য নিশ্চিত করছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনো প্রথাগত উৎপাদন ও অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর বেশি নির্ভরশীল। অথচ দেশে গত ১০ বছরে ৬২টি পণ্য ভৌগোলিক নির্দেশক স্বীকৃতি পেলেও ঐতিহ্যবাহী চায়ের এখনো জিআই স্বীকৃতি মেলেনি। এ ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা নিলে এ খাতের চ্যালেঞ্জকে বিপুল সম্ভাবনায় খাতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ চা বোর্ড (বিটিবি) এবং বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিটিআরআই) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে চায়ের উৎপাদন রেকর্ড পরিমাণ বাড়লেও (যেমন ২০২৩ সালে রেকর্ড ১০২.৯২ মিলিয়ন কেজি উৎপাদন) আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের রপ্তানি ও চায়ের কাঙ্ক্ষিত মূল্যপ্রাপ্তি এখনো সীমিত। এর মূল কারণ, আমরা মূলত সাধারণ মানের ‘সিটিসি’ চা উৎপাদনে আটকে আছি, যেখানে বিশ্ববাজারে এখন ‘অর্থোডক্স’ ও অর্গানিক চায়ের চাহিদা ও মূল্য অনেক বেশি।

চায়ের বনেদি ব্যবসাকে শুধু টিকিয়ে রাখার গণ্ডি থেকে বের করে লাভজনক ও উচ্চমূল্যের ব্র্যান্ডেড শিল্পে রূপান্তর করতে হলে দেশীয় ঐতিহ্যের স্বীকৃতি আগে দিতে হবে। বাংলাদেশের সিলেট বা পঞ্চগড়ের চায়ের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। পঞ্চগড়ের সমতলের অর্গানিক চা কিংবা সিলেটের প্রিমিয়াম কোয়ালিটি চায়ের জন্য জিআই স্বীকৃতি আদায় করতে পারলে বিশ্ববাজারে এর দাম কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব।

পণ্যের বহুমুখীকরণ

শুধু সাধারণ ব্ল্যাক টি বা সিটিসি চায়ের ওপর নির্ভর না করে গ্রিন টি, হোয়াইট টি, ওলং টি এবং বিভিন্ন হারবাল চায়ের উৎপাদন বাড়াতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এ–জাতীয় চায়ের প্রিমিয়াম মূল্য পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের চা নামে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে আন্তর্জাতিক মেলা ও ফোরামে জোরালো ব্র্যান্ডিং করতে হবে। প্যাকেটজাত ও রেডি-টু-ড্রিংক চায়ের ব্র্যান্ড তৈরি করে সরাসরি রপ্তানি বাড়াতে হবে, যেন শুধু বাল্ক (খোলা) চা রপ্তানির ওপর নির্ভর করতে না হয়।

প্রযুক্তি ও গবেষণার আধুনিকায়ন: চা–বাগানগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল উচ্চ ফলনশীল ও গুণগত মানসম্পন্ন ‘ক্লোন’ (যেমন বিটিআরআই উদ্ভাবিত নতুন ক্লোনসমূহ) দ্রুত সম্প্রসারণ করতে হবে।

বাংলাদেশের সিলেট বা পঞ্চগড়ের চায়ের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। পঞ্চগড়ের সমতলের অর্গানিক চা কিংবা সিলেটের প্রিমিয়াম কোয়ালিটি চায়ের জন্য জিআই স্বীকৃতি আদায় করতে পারলে বিশ্ববাজারে এর দাম কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব।

পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ: চা–বাগানের মালিকদের সহজ শর্তে ঋণ এবং কর রেয়াত দিয়ে প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলোকে আধুনিকায়ন করতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের চায়ের গুণগত মান অত্যন্ত চমৎকার। ঐতিহ্যগত ধারা থেকে বেরিয়ে এসে যদি আধুনিক বিপণন ও ব্র্যান্ডিং স্ট্র্যাটেজি গ্রহণ করা যায়, তবে চা–শিল্প শুধু টিকে থাকার লড়াইয়েই জিতবে না, দেশের অর্থনীতিতে অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হিসেবে পুনরুজ্জীবিত হবে।