নির্মাণে নতুনত্ব, বদলে যাচ্ছে ঘর
একসময় ‘ঘর’ মানে ছিল কেবল ইট-পাথরের দেয়াল আর মাথার ওপর একটি ছাদ। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় মানুষের জীবনযাত্রায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। এখন ঘর শুধু থাকার জায়গা নয়; বরং আধুনিক রুচি, নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের এক অনন্য সংমিশ্রণ। আধুনিক নির্মাণে এখন শুধু সুন্দর ঘর নয়, প্রয়োজন ‘বুদ্ধিমান’ বা ‘স্মার্ট’ ঘর। উন্নত মানের কেব্ল, স্মার্ট সুইচ, এনার্জি সেভিং লাইট, শৈল্পিক টাইলস আর নতুন প্রযুক্তির গ্লাসের ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে দেশের আবাসনচিত্র। নগর ছাড়িয়ে এই আধুনিকতার ছোঁয়া এখন পৌঁছে গেছে মফস্সলের অলিগলিতেও।
আরামের নতুন ঠিকানা
আধুনিক ইন্টেরিয়র ডিজাইনে স্মার্ট সুইচ এখন অত্যন্ত জনপ্রিয়। একসময় সুইচ বোর্ড মানেই ছিল প্লাস্টিকের বড় একঝাঁক বাটন, যা ঘরের সৌন্দর্য ম্লান করে দিত। এখন এর বদলে জায়গা করে নিয়েছে গ্লাস প্যানেল বা মেটালিক ফিনিশিংয়ের টাচ সুইচ।
এসব স্মার্ট সুইচের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি রিমোট বা স্মার্টফোন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ঘরে না থেকেও আপনি পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে আপনার এসি, গিজার বা লাইট বন্ধ বা চালু করতে পারছেন। এতে একদিকে যেমন আভিজাত্য বাড়ছে, অন্যদিকে নিশ্চিত হচ্ছে অভাবনীয় আরাম। বিশেষ করে বয়স্ক বা অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য এই প্রযুক্তি আশীর্বাদস্বরূপ।
নিরাপত্তায় আপসহীন
নির্মাণ উপকরণের আধুনিকায়নের সবচেয়ে বড় সুফল হলো নিরাপত্তা। ছোট শিশুদের ঘরে বৈদ্যুতিক সকেট নিয়ে অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। বর্তমানে বাজারে থাকা ‘চাইল্ড-প্রুফ’ সকেটে এমন একধরনের প্রটেকটিভ শাটার থাকে, যা শিশুর আঙুল বা কোনো সূক্ষ্ম বস্তু প্রবেশের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়।
এ ছাড়া ‘ওভারলোড প্রটেকশন’–যুক্ত সকেট ও সুইচ বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে ঘরকে রক্ষা করে। কোনো কারণে ভোল্টেজ বেশি হলে বা শর্টসার্কিট হওয়ার উপক্রম হলে এই সেন্সরগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। অগ্নিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে বর্তমানে উচ্চ মানের ‘ফায়ার রিটারডেন্ট’ কেব্ল বা তার ব্যবহার করা হচ্ছে, যা আগুনের শিখা ছড়াতে বাধা দেয় এবং ধোঁয়া কম উৎপন্ন করে।
নিরাপত্তা আর আস্থার সমন্বয়ে দেশের কেব্লস কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের সেবায় প্রতিযোগিতা করে যাচ্ছে। বিআরবি কেব্ল ইন্ডাস্ট্রিজের বিপণন বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক হাদিউল ইসলাম এ প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিরাপত্তা আমাদের মূল লক্ষ্য হলেও বর্তমানে আমরা পণ্যের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের ওপর বিশেষ নজর দিচ্ছি। ক্রেতাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে আমরা নিয়ে আসছি আধুনিক মানসম্মত পণ্য, যা স্মার্ট ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিতে বড় ভূমিকা রাখছে। আধুনিক আবাসনব্যবস্থায় এখন প্রযুক্তি আর নিরাপত্তার মেলবন্ধনই সময়ের দাবি।’
নতুন প্রযুক্তির বিদ্যুৎ–সাশ্রয়ী নানা বৈদ্যুতিক পণ্য বাজারে নিয়ে আসার কথা জানান সুপারস্টার গ্রুপের রিয়াজুল হাসান। তিনি বলেন, বাল্বের বাজারে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। এ সাফল্য পেতে প্রযুক্তি বেশ সহায়ক ছিল। এখন নতুন করে আধুনিক প্রযুক্তির লিফট নিয়ে আসছে সুপারস্টার গ্রুপ।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন
বিদ্যুৎ সাশ্রয় এখন কেবল সচেতনতা নয়; বরং প্রয়োজনের নাম। আধুনিক স্মার্ট হোমে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে মোশন সেন্সর লাইট। আপনি যখন ঘরে প্রবেশ করবেন, তখন আলো জ্বলবে আর ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে নিজে নিজেই নিভে যাবে। বাথরুম, বারান্দা বা সিঁড়িতে এই সেন্সর লাইটের ব্যবহার বিদ্যুতের অপচয় কমিয়ে আনছে ৩০-৪০ শতাংশ।
এলইডি প্রযুক্তির এনার্জি সেভিং লাইটগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি টেকসই এবং চোখের জন্য আরামদায়ক। স্মার্টফোন দিয়ে আলোর উজ্জ্বলতা বাড়ানো বা কমানোর সুবিধা থাকায় ঘরে তৈরি করা যায় ভিন্ন ভিন্ন আবহ।
নান্দনিক টাইলস ও আধুনিক ফিনিশিং
ঘরের সৌন্দর্যের বড় একটি অংশ দখল করে থাকে টাইলস। বর্তমানের আধুনিক টাইলস কেবল চকচকে মেঝেই নিশ্চিত করে না; বরং এর স্থায়িত্ব ও রক্ষণাবেক্ষণও অনেক সহজ। অ্যান্টি-স্কিড বা পিচ্ছিলরোধী টাইলস বাথরুমে বয়স্কদের পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমায়। আবার লিভিংরুমের জন্য রয়েছে বড় ফরম্যাটের মার্বেল ফিনিশ টাইলস, যা ঘরকে দেয় বিশালত্বের অনুভূতি। নির্মাণে এখন ‘লো মেইনটেন্যান্স’ উপকরণের চাহিদা বাড়ছে, যা বছরের পর বছর নতুনের মতো উজ্জ্বল থাকে।
বুদ্ধিমান ঘর: কেন প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ‘স্মার্ট হোম’ বা বুদ্ধিমান ঘর তৈরির প্রাথমিক খরচ সাধারণ ঘরের চেয়ে সামান্য বেশি হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এটি অত্যন্ত লাভজনক। প্রথমত, এটি বিদ্যুতের বিল সাশ্রয় করে। দ্বিতীয়ত, যান্ত্রিক গোলযোগ ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমিয়ে জানমালের সুরক্ষা নিশ্চিত করে। তৃতীয়ত, জীবনযাত্রার মানকে আধুনিক ও সহজতর করে তোলে।
বর্তমানে নির্মাণে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির পণ্যের কদর বেশ বেড়েছে। এ কারণে আমদানিতে বিদেশি ও দেশীয় কোম্পানির তৈরি এখন নতুন এআই প্রযুক্তির লিফট, এসিসহ নানা পণ্য বাজারে আছে। শান্তা হোল্ডিংসের প্রধান বিক্রয় কর্মকর্তা শিহাব আহমেদ প্রথম আলোকে জানান, ভবনের সৌন্দর্য ও আধুনিক নির্মাণশৈলী আন্তর্জাতিক মানকে প্রতিফলিত করে। প্রতিটি ভবনে বহু অফিসের কর্মীদের সহজ যাতায়াতের জন্য বিশ্বমানের এআই অ্যানাবলড এলিভেটর ব্যবহার করা হচ্ছে। এই এলিভেটরগুলো ফ্লোরে অপেক্ষমাণ যাত্রীর সংখ্যা নির্ণয় করে দক্ষতার সঙ্গে দ্রুত সেবা প্রদান করে। সর্বাধুনিক প্রযুক্তির এয়ারকন্ডিশনিং (এইচভিএসি) সিস্টেম কর্মপরিবেশে দূষিত বাতাস দূর করে সার্বক্ষণিক সতেজ বাতাস গ্রহণের ব্যবস্থা রাখছে শান্তা, যা দীর্ঘ কর্মঘণ্টাকে ক্লান্তিহীন করছে।
নগর থেকে মফস্সলে আধুনিকতার বিস্তার
একটা সময় ভাবা হতো, এই প্রযুক্তি শুধু ঢাকা বা চট্টগ্রামের বড় বড় অট্টালিকার জন্য। কিন্তু ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং ই-কমার্সের কল্যাণে মফস্সলের মানুষও এখন আধুনিক কেব্লিং এবং স্মার্ট ডিভাইসের দিকে ঝুঁকছে। বিশেষ করে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে গড়ে ওঠা মফস্সলের আলিশান বাড়িগুলোতে এখন অত্যাধুনিক ফিটিংস ও স্মার্ট সিকিউরিটি সিস্টেমের ব্যবহার লক্ষণীয়।