প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতাই পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ

‘বায়লা ফিউচার সামিট–২০২৬’ শীর্ষক এক সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরীসহ অতিথিরা। বাংলাদেশ অ্যাপারেল ইয়ুথ লিডার্স অ্যালায়েন্স (বায়লা) গত রোববার রাজধানীর হোটেল র‍্যাডিসনে দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনের আয়োজন করে
ছবি: বায়লা

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পকে আরও শক্তিশালী করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন এবং উচ্চ মূল্য সংযোজন পণ্য উৎপাদনে দ্রুত এগিয়ে যেতে হবে।

‘বায়লা ফিউচার সামিট–২০২৬’ শীর্ষক এক সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে শিল্পনেতা, উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকেরা এই আহ্বান জানান। তাঁদের মতে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা শুধু কম উৎপাদন ব্যয় বা বাজারসুবিধার ওপর নির্ভর করবে না। বরং উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন, টেকসই উৎপাদন ও মূল্য সংযোজনই হয়ে উঠবে প্রবৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি।

রাজধানীর হোটেল র‍্যাডিসনে গত রোববার বাংলাদেশ অ্যাপারেল ইয়ুথ লিডার্স অ্যালায়েন্স (বায়লা) দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরী।

আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, তৈরি পোশাকশিল্প কর্মসংস্থানের অন্যতম বড় উৎস। প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের চাহিদা পূরণে শ্রমশক্তিকে নতুন দক্ষতায় গড়ে তোলা এবং নতুন প্রজন্মের উদ্ভাবনী নেতৃত্ব তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। সে জন্য সরকার শ্রমিক–মালিকের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে শিল্পবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত এবং টেকসই শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দিচ্ছে।

নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ও ডিজিটাল প্রযুক্তি গ্রহণ ছাড়া ভবিষ্যতে কোনো পোশাক কারখানার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। প্রথম প্রজন্ম বাংলাদেশকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেছে। এখন সেই অর্জনকে আরও এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব নতুন প্রজন্মের।

তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি বিদিয়া অমৃত খান বলেন, এলডিসি–পরবর্তী বাস্তবতায় শুধু চুক্তিভিত্তিক উৎপাদনের ওপর নির্ভর না করে উদ্ভাবন, নিজস্ব ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা, নকশা উন্নয়ন ও মূল্য সংযোজনের দিকে যেতে হবে। তিনি এআই, অটোমেশন ও ইন্ডাস্ট্রি ৪.০–কে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য উল্লেখ করে এসব প্রযুক্তিতে আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানান।

শেল্‌টেক্‌ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ বলেন, কোটা–পরবর্তী সময় ও কোভিড–১৯–এর মতো বড় চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রয়েছে। এখন এলডিসি–পরবর্তী বাস্তবতায় টিকে থাকতে অটোমেশন, এআই, দক্ষ মানবসম্পদ, বাজার বহুমুখীকরণ, লজিস্টিকস উন্নয়ন এবং উচ্চ মূল্য সংযোজন পণ্যে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

ইউরোচ্যাম বাংলাদেশের চেয়ারম্যান নুরিয়া লোপেজ বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের জোরালো চাহিদা রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে টেকসই উৎপাদন, পরিবেশগত মান এবং পণ্যের বহুমুখীকরণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বায়লার সভাপতি আবরার হোসেন সায়েম বলেন, আগামী দিনের বৈশ্বিক বাজারে প্রচলিত ব্যবসায়িক মডেল দিয়ে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব হবে না। ‘থিংক বিয়ন্ড টুডে’ শুধু একটি স্লোগান নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হওয়ার মানসিকতা। নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের দ্রুত এআই, ইন্ডাস্ট্রি ৪.০ এবং উদ্ভাবনকে গ্রহণ করতে হবে।

সম্মেলনের ‘ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের গণ্ডি পেরিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ: ডিস্ট্রিবিউশন ও ভোক্তা–অভিজ্ঞতার শক্তি’ শীর্ষক অধিবেশনে ট্রান্সকম লিমিটেডের গ্রুপ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান বলেন, বৈশ্বিক ক্রেতারা এখন শুধু পোশাক নয়; বাংলাদেশের কাছ থেকে মানসম্মত উৎপাদন, টেকসই উন্নয়ন, আস্থা, উদ্ভাবন ও নির্ভরযোগ্যতাও প্রত্যাশা করেন। তিনি বলেন, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ যেন উৎকর্ষের প্রতীক হয়ে ওঠে, সে লক্ষ্যেই সবাইকে কাজ করতে হবে। তাঁর মতে, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ শুধু প্রযুক্তি বা উৎপাদনের মাধ্যমে নয়, বরং দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বায়লার প্রথম সহসভাপতি হাসিন আরমান।