বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত সপ্তাহে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৪৭ থেকে ৫২ টাকা নির্ধারণ করে। ঢাকার বাইরে ৪০ থেকে ৪৪ টাকা। এ ছাড়া খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ঢাকায় ১৮ থেকে ২০ টাকা, বকরির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১২ থেকে ১৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ঢাকার বাইরে ও ঢাকায় বকরি ও খাসির চামড়ার দাম একই।

প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ায় ৭ টাকা ও খাসির চামড়ার দাম ৩ টাকা বৃদ্ধি করায় মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং মসজিদ, এতিমখানা ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ আশা করেছিলেন, চামড়ায় এবার বাড়তি দাম মিলবে। শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। চামড়া কিনে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ লোকসানও গুনেছেন।

অবশ্য বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আফতাব খান দাবি করেন, ‘সবার জন্যই এবার চামড়া বেচাকেনা ভালো হয়েছে। মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা ও এতিমখানা—সবাই ভালো দামে চামড়া বিক্রি করতে পেরেছে। পোস্তার আড়তদারেরাও এবার চামড়া কিনে খুশি। আশা করছি, সরকার নির্ধারিত দরে ট্যানারির মালিকেরা চামড়া কিনবেন।’

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলতি বছর পবিত্র ঈদুল আজহায় সারা দেশে মোট ৯৯ লাখ ৫০ হাজার ৭৬৩টি গবাদিপশু কোরবানি হয়েছে। আট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পশু কোরবানি হয়েছে ঢাকা বিভাগে। ১১ লাখ ৬৭ হাজার ৮১০টি গরু-মহিষসহ মোট ২৪ লাখ ৯১ হাজার ৭৬৮টি গবাদিপশু কোরবানি হয়েছে এ বিভাগে।

ঢাকায় দাম কতটা কম

রাজধানীতে কোরবানির চামড়া ক্রয়–বিক্রয়ের সবচেয়ে বড় জায়গা পুরান ঢাকার পোস্তা। ঈদের দিন দুপুরের পর থেকে চামড়াবাহী ট্রাক আসতে থাকে। সেগুলো আড়তের সামনে থামছিল। দামে বনিবনা হলে চামড়া নামিয়ে দেয়। না হলে অন্য আড়তের দিকে রওনা দিচ্ছিল ট্রাকগুলো।

মাহবুব অ্যান্ড ব্রাদার্স নামের আড়তের ব্যবস্থাপক উত্তম কুমার সাহা বলেন, ছোট আকারের গরুর চামড়া ২০০–২৫০, মাঝারি ৫০০–৭০০ এবং বড় আকারের গরুর চামড়া ৮০০–৯০০ টাকায় কিনেছেন। সব মিলিয়ে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার চামড়া কিনবেন।

পোস্তার আড়তদারেরা জানান, বড় আকারের গরুর চামড়া ৩৫-৪০ বর্গফুট, মাঝারি ২১-৩০ এবং ছোট আকারের গরুর চামড়া ১৬-২০ বর্গফুটের হয়। একেকটি গরুর চামড়া সংরক্ষণে লবণ ও শ্রমিকের মজুরিসহ গড়ে ৩০০ টাকা খরচ হচ্ছে।

ধরা যাক, একটি মাঝারি আকারের গরুর চামড়ার আয়তন ২৫ বর্গফুট। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বেঁধে দেওয়া দর অনুযায়ী, লবণযুক্ত সেই চামড়ার দাম হয় ১ হাজার ২৩৭ টাকা। তার থেকে লবণ ও শ্রমিকের মজুরি গড়ে ৩০০ টাকা বাদ দিলে লবণবিহীন কাঁচা চামড়ার দাম হওয়ার কথা ৯৩৭ টাকা। তবে এই আকারের চামড়া বিক্রি হয়েছে ৩০০–৭৫০ টাকায়।

পানির দরে চামড়া বিক্রি

ফেনীতে কোরবানির চামড়া অনেকটা পানির দরে বিক্রি হয়েছে। গ্রামে গ্রামে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের দেখা মেলেনি। গরু ও মহিষের ছোট–বড় সব ধরনের চামড়া ১০০–৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

ফেনী পৌরসভার বাসিন্দা মীর হোসেন কোরবানির গরুর চামড়া বিক্রির জন্য বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। দুপুরে একজন মৌসুমি ব্যবসায়ী ১ লাখ ২৩ হাজার টাকা দামের গরুর চামড়ার দাম ১০০ টাকা বলে চলে যান। পরে চামড়াটি তিনি স্থানীয় মাদ্রাসাকে দিয়ে দেন।

দিনাজপুর শহরের রামনগর এলাকায় জেলার মূল চামড়ার বাজার। এই বাজারে ঈদের দিন প্রতিটি গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ২৫০ টাকা। আর ছাগলের চামড়া ৫–১০ টাকা।

দিনাজপুরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী করিম মোল্লা গত সোমবার দুপুরে বাজারে ৪টি গরুর চামড়া নিয়ে আসেন। আড়তদার প্রতিটি চামড়ার দাম বলেন ২০০ টাকা। করিম মোল্লা বলেন, ৪টি চামড়া তাঁর কেনা ১ হাজার ৮০০ টাকায়। সেই সঙ্গে অটোভাড়া ১০০ টাকা। গতবারের চেয়ে চামড়াপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম কম বলে দাবি করেন তিনি।

বগুড়ায় এলাকাভেদে ৩০০–৬০০ টাকায় গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে। খাসির চামড়া বিক্রি হয়েছে গড়ে ১০ টাকায়। শহরের মাটিডালি এলাকার একটি রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের ব্যবস্থাপক ফারুকুল হাসান বলেন, অনেকেই সেই দামও না পেয়ে খাসির চামড়া ভাগাড়ে ফেলে দিয়েছেন।

এদিকে চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহে বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি। সুন্নীয়া মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন গাউছিয়া কমিটি বাংলাদেশ চট্টগ্রামে চামড়া সংগ্রহে নামার কারণে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সুবিধা করতে পারেননি। গাউছিয়া কমিটি বিনা মূল্যে ৩০ হাজার চামড়া সংগ্রহ করেছে। আড়তদারেরা গরুর বড় চামড়া ৬০০–৭০০ এবং ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চামড়ার ৩০০–৫০০ টাকায় কিনেছেন।

চট্টগ্রামের আড়তদার সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, উপজেলা পর্যায়ে চামড়া লবণজাত করায় নগরের আড়তে চামড়া কম এসেছে। এখন পর্যন্ত দেড় লাখ গরুর চামড়া ও তিন হাজারের মতো ছাগলের চামড়া এসেছে।

দূষণ বন্ধ না হলে

আট বছর ধরে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম কমেছে। কোনোবারই নির্ধারিত দামে চামড়া বেচাকেনা হয়নি। ২০১৯ সালে তো বিপর্যয় ঘটে। সেবার দাম না পেয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চামড়া ফেলে দেন অনেকে। মাটিতে পুঁতে ফেলার ঘটনাও ঘটে।

অবশ্য চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, হেমায়েতপুরের চামড়াশিল্প নগরী দূষণ বন্ধ না হওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশি চামড়া কিনছে না। সে কারণে বাংলাদেশি চামড়ার মূল ক্রেতা হয়ে উঠেছে চীন। আর তারা দাম দেয় খুবই কম। তাই যত দিন চামড়াশিল্পের দূষণ বন্ধ না হবে, তত দিন অবস্থার উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

সাভারের হেমায়েতপুরে ২০০ একর জমিতে একটি চামড়াশিল্প নগর করতে ১৯ বছর পার করেছে সরকার। এখনো কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি। কঠিন বর্জ্য ফেলার জায়গা বা ডাম্পিং ইয়ার্ডের কাজ শুরুই হয়নি। ফলে চামড়াশিল্প নগরে এবারও দূষণের আশঙ্কা করছেন সেখানকার ট্যানারিশিল্পের মালিকেরা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের কাছে চীনাদের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে চামড়া বিক্রি করা সম্ভব। তার জন্য আমাদের চামড়াশিল্প নগরীকে আন্তর্জাতিক সংগঠন লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ নিতে হবে। সেই সনদ পেতে প্রথম শর্তই হচ্ছে কার্যকর সিইটিপি ও কঠিন বর্জ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনা। এসব নিশ্চিতে কার্যকর বিনিয়োগ দরকার।

[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন প্রথম আলোপ্রতিবেদক, চট্টগ্রাম, বগুড়া, ফেনীদিনাজপুর]

শিল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন