সাত মাসেও এলপিজি আমদানি করতে পারেনি বিপিসি

এলপিজি সিলিন্ডারফাইল ছবি

দেশের এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) বাজারে সরকারের অংশ মাত্র ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। আর বাকিটা বেসরকারি খাতের হাতে। এই বাজারে বেসরকারি খাতনির্ভরতা কমাতে এবং সংকটে হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করতে গত জানুয়ারিতে প্রথমবারের মতো সরাসরি এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। কিন্তু সাত মাস চেষ্টা করে এক টন এলপিজিও আমদানি করতে পারেনি সংস্থাটি।

গত সাত মাসে পাঁচবার দরপত্র আহ্বান করেছে বিপিসি। কিন্তু এসব দরপত্রের বিপরীতে গ্রহণযোগ্য সরবরাহকারী মেলেনি। এরপর নিয়মিত দরপত্রের বাইরে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে পাঁচ হাজার টন এলপিজি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে প্রায় ৪৫ কোটি টাকার এলপিজি সরবরাহের কাজ পায় স্পিড মার্কেটিং করপোরেশন নামের এক প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি গত বৃহস্পতিবার জামানত জমা দিয়েছে। তবে কবে নাগাদ গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে, তা এখনো নিশ্চিত নয় বিপিসি।

বিপিসির দায়িত্বশীল দুই কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, জামানত জমার পর এখন প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি হবে বিপিসির। এরপর আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খুলতে হবে। ফলে কবে আমদানি করা এলপিজি দেশে পৌঁছাবে, তা এখনই নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।

বিপিসির এলপিজি আমদানির অনুমোদনের অন্যতম শর্ত ছিল, আমদানি করা এলপিজি দেওয়া হবে অনুমোদিত বেসরকারি অপারেটরদের। পরে তারা নিজেরা তা বাজারজাত করবে।

এ বিষয়ে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি আমিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, বেসরকারি অপারেটররা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তবে এ জন্য বাণিজ্যিক শর্তসহ সব ধরনের নিয়ম ও শর্ত উভয় পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে হবে।

এলপিজি আমদানির প্রক্রিয়া চলছে। দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। শিগগিরই আমদানি শুরু হবে। এর বাইরে চট্টগ্রাম ও মোংলায় এলপিজি প্ল্যান্ট স্থাপনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে
মো. মনজুর আলম প্রধান, চেয়ারম্যান, বিপিসি

গত ২০ জানুয়ারি তিন শর্তে বিপিসিকে এলপিজি আমদানির অনুমোদন দিয়েছিল জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এরপর ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ দফায় সরবরাহকারী খোঁজা হয়। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখায়নি। পরে ৪ আগস্ট স্পিড মার্কেটিং নিজে থেকে এলপিজি সরবরাহের আগ্রহ প্রকাশ করলে সরাসরি ক্রয়ের উদ্যোগ নেয় বিপিসি।

জানতে চাইলে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. মনজুর আলম প্রধান প্রথম আলোকে বলেন, এলপিজি আমদানির প্রক্রিয়া চলছে। দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। শিগগিরই আমদানি শুরু হবে। এর বাইরে চট্টগ্রাম ও মোংলায় এলপিজি প্ল্যান্ট স্থাপনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এসব প্ল্যান্ট তৈরি করা গেলে এলপিজিতে সক্ষমতা তৈরি হবে। ভোক্তারাও তাতে উপকৃত হবেন।

দেশে আবাসিকে নতুন গ্যাস-সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয় ২০১৫ সালে। এরপর রান্নার জ্বালানি হিসেবে দ্রুত বাড়তে থাকে এলপিজির ব্যবহার। এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) হিসাবে, ২০১৬ সালে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল আগের বছরের তুলনায় ১০০ শতাংশ। ২০১৭ সালে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ১২৩ শতাংশে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে সাড়ে পাঁচ লাখ টন এলপিজি সরবরাহ হয়েছিল। বর্তমানে তা বেড়ে বছরে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টনে পৌঁছেছে। বাজার বড় হলেও এই ব্যবসার প্রায় পুরোটাই বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে।

বিপিসির হিসাবে, সরকার কোনো এলপিজি আমদানি করে না। সরকারি তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারিতে তেল পরিশোধনের সময় উপজাত হিসেবে কিছু এলপিজি পাওয়া যায়। বেসরকারি খাতে এলপিজির বড় অংশ আমদানি করে ১৫ থেকে ২০টি প্রতিষ্ঠান।

দেশে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় ৮০ শতাংশই যায় গৃহস্থালির রান্নায়। ২০২০ সালে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ছিল প্রায় ৯০০ টাকা। ২০২১ সালের মে মাস থেকে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। ওই বছরের মে মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ছিল ৮৪২ টাকা। তবে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবে দাম বাড়তে থাকে। গত ডিসেম্বরের তীব্র সংকটে দেশের কোনো কোনো এলাকায় একটি সিলিন্ডার তিন হাজার টাকায়ও বিক্রি হয়। দেশজুড়ে সংকট দেখা দেওয়ায় বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং সংকটে বাজারে সরবরাহ বাড়াতে গত জানুয়ারিতে সরকারিভাবে এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নেয় বিপিসি। এ জন্য গত ১০ জানুয়ারি নীতিগত অনুমোদন চেয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে চিঠি দেয় সংস্থাটি। ২০ জানুয়ারি তিন শর্তে সেই অনুমোদন দেওয়া হয়।

এলপিজির বাজার প্রায় পুরোপুরি বেসরকারি খাতনির্ভর। এ কারণে বাজারে সরকারের কার্যকর উপস্থিতি বাড়ানো জরুরি। বিপিসি আমদানি করলে সরবরাহের একটি বিকল্প উৎস তৈরি হবে
শামসুল আলম, জ্বালানি উপদেষ্টা, ক্যাব

অনুমোদনের পর ফেব্রুয়ারিতে দুই দফা এবং জুলাইয়ে তিন দফা—মোট পাঁচবার দরপত্র আহ্বান করে বিপিসি, কিন্তু তাতে কেউ আগ্রহ দেখায়নি। বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, আগ্রহী সরবরাহকারী পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা অতিরিক্ত মূল্য বা প্রিমিয়াম। একটি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোর চুক্তিমূল্যের সঙ্গে প্রতি টনে ২৭০ মার্কিন ডলার প্রিমিয়াম চেয়েছিল। কিন্তু অতি উচ্চ ও অলাভজনক বিবেচনায় সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি বিপিসি।

পাঁচবারের চেষ্টায় সরবরাহকারী না পাওয়ার পর গত ৪ আগস্ট স্পিড মার্কেটিং করপোরেশন এলপিজি সরবরাহে আগ্রহ জানিয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে প্রস্তাব দেয়। প্রতিষ্ঠানটি বিপিসির তালিকাভুক্ত সরবরাহকারী নয়। পরে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে তাদের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টন এলপিজি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

স্পিড মার্কেটিং সৌদি আরামকোর আগস্টের চুক্তিমূল্যের সঙ্গে প্রতি টনে ৯৭ ডলার প্রিমিয়ামে এলপিজি সরবরাহের প্রস্তাব দেয়। বিপিসির মূল্যায়ন কমিটি ওই দরে পাঁচ হাজার টন এলপিজি কেনার সুপারিশ করে। এতে মোট ব্যয় ধরা হয় ৩৬ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার বা প্রায় ৪৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা। বিপিসির নথিতে বলা হয়েছে, স্পিড মার্কেটিং মোট ক্রয়মূল্যের ৫ শতাংশ কার্যসম্পাদন জামানত দিতে সম্মত হয়েছিল। এর বাইরে ব্রাদার্স এলপিজি নামের আরেক প্রতিষ্ঠান এলপিজি সরবরাহ করতে রাজি হয়েছে। বিপিসির বোর্ডে সরবরাহের অনুমোদন হয়েছে, তবে সরকারের অনুমোদন এখনো মেলেনি।

এদিকে বিপিসির উদ্যোগে এলপিজি আমদানি প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা উচিত বলে মনে করেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, শুধু একবার এলপিজি আমদানি করলেই বাজারে সরকারের কার্যকর উপস্থিতি তৈরি হবে না। এ জন্য বিপিসির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেডের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে নিয়মিত এলপিজি আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি নিজস্ব আমদানি, সংরক্ষণ ও বোতলজাত করার অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

শামসুল আলম আরও বলেন, এলপিজির বাজার প্রায় পুরোপুরি বেসরকারি খাতনির্ভর। এ কারণে বাজারে সরকারের কার্যকর উপস্থিতি বাড়ানো জরুরি। বিপিসি আমদানি করলে সরবরাহের একটি বিকল্প উৎস তৈরি হবে এবং প্রতিযোগিতা বাড়বে।