২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ঢাকা সফরের সময় চীনা অর্থনৈতিক জোন স্থাপনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। তখন দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়। তবে নানা জটিলতায় বিষয়টি ঝুলে যায়। এক দশক পর অবশেষে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে প্রকল্পটি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরের আগেই চার হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্প অনুমোদন পেতে পারে।
জানা গেছে, আজ মঙ্গলবার নতুন সরকারের চতুর্থ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভায় প্রকল্পটি উত্থাপন করা হচ্ছে। পরিকল্পনা কমিশনের সূত্রমতে, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সরকারি ভিত্তিতে (জি–টু–জি) প্রায় ৭৮৩ একর জমিতে এ অর্থনৈতিক জোন গড়ে তোলা হবে। সেখানে কর্মসংস্থান হবে প্রায় এক লাখ মানুষের। সব মিলিয়ে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পটির কাজ আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয় ২০৩১ সালে, অর্থাৎ পাঁচ বছরে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এ জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি ব্যয় ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা। বাকি ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা আসবে চীনা সহায়তা থেকে।
এ নিয়ে বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি মোহা. খোরশেদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি হলে দেশে চীনা বিনিয়োগে পোশাক, মোবাইল, জুতা, ইলেকট্রিক ও খেলাধুলা সামগ্রীর অনেক কারখানা হবে। তবে এখানে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ দিতে গেলে সরকারের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
প্রকল্পের প্রধান কাজ
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে গ্যাস–বিদ্যুৎ সংযোগ এবং সড়ক ও সেতু নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও আনুষঙ্গিক সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। এ জন্য ২০ কিলোমিটার বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, ১২ মিটার প্রশস্ত সড়ক, ১২ কিলোমিটার সীমানাপ্রাচীর এবং ১ হাজার ২০০ মিটার দীর্ঘ জেটি স্থাপনের পাশাপাশি ২ কিলোমিটার গ্যাস লাইন, পানি সংরক্ষণাগার ও ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে তা দেশের রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণে অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আমরা বিনিয়োগ চাই। তারা এখানে বিনিয়োগে আগ্রহী হলে সেটা আমাদের জন্য ভালো। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের আগে এ প্রকল্প বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় একটি বিষয় হবে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, মূলত অর্থনৈতিক জোনের ভূমি উন্নয়নসংক্রান্ত কাজ বাস্তবায়নের জন্যই প্রকল্পটি অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনাসচিব এস এম শাকিল আখতার প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাস্তাঘাট নির্মাণ, বিদ্যুৎ লাইন ও উপযোগ সেবার মতো প্রাথমিক কাজগুলো করে দেওয়া হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নানা জটিলতায় প্রকল্পটির কাজ দীর্ঘদিন স্থবির ছিল। এর মধ্যে ছিল ঠিকাদার নিয়োগ ও মালিকানা–সংক্রান্ত জটিলতা। ২০১৪ সালে প্রথম সমঝোতার পর ২০১৬ সালে ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়।
শুরুতে অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে (সিএইচইসি)। কিন্তু তাদের সঙ্গে চুক্তি হয়নি। এরপর কয়েক বছর সময় চলে যায়। একপর্যায়ে সিএইচইসির বিরুদ্ধে ঘুষের প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
পরে ২০২২ সালে চীনা সরকারের পক্ষ থেকে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে (সিআরবিসি) নতুন ডেভেলপার হিসেবে মনোনীত করা হয়। বেজা ও সিআরবিসি যৌথভাবে একটি কোম্পানি গঠন করে। সেখানে ৩০ শতাংশ মালিকানা পায় বেজা। জমির ৫০ বছরের লিজ মূল্যের ভিত্তিতে এ মালিকানা নির্ধারণ করা হয়। অন্যদিকে অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়নে ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের বিনিময়ে ৭০ শতাংশ শেয়ার পায় চীনা প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে সরকারি ক্রয়নীতি অনুযায়ী, একই প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্যতা যাচাই ও ডেভেলপার—দুই ভূমিকায় কাজ করতে পারে না। কিন্তু এ প্রকল্পে সিআরবিসি উভয় কাজই করেছে।
বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে বেজার নির্বাহী সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে সরকারের অগ্রাধিকারে হয়তো এ জোন ছিল না। এখন নতুন সরকার কর্মসংস্থানের জন্য প্রকল্পটি এগিয়ে নিচ্ছে।’
কী ধরনের কারখানা হতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে নজরুল ইসলাম বলেন, ইতিমধ্যে শতাধিক চীনা প্রতিষ্ঠান কারখানা স্থাপনে আগ্রহের কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চামড়া, হালকা প্রকৌশল, মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক খাতের প্রতিষ্ঠান। তবে কিছু পোশাক কারখানা থাকলেও এটিকে পোশাককেন্দ্রিক করতে চায় না বেজা।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্যমতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে চীন থেকে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা নেমে আসে ২৭৬ মিলিয়ন ডলারে। এমনকি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশটি থেকে নতুন কোনো ঋণের প্রতিশ্রুতিও পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বিনিয়োগ চাই। তারা এখানে বিনিয়োগে আগ্রহী হলে সেটা আমাদের জন্য ভালো। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের আগে এ প্রকল্প বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় একটি বিষয় হবে।’