উদ্যোক্তাদের স্বস্তি, ক্রেতার অস্বস্তি

  • পাঁচ বছরে যে পণ্য এক কেজিও আমদানি হয়নি, সেটির শুল্ক কমানো হয়েছে।

  • ইস্পাত শিল্পের ৪টি কাঁচামাল ও রাসায়নিক আমদানিতে অগ্রিম কর প্রত্যাহার।

বিশ্ববাজারে রড তৈরির কাঁচামালের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় দেশে রডের দাম দফায় দফায় বাড়ছে। নভেম্বরের আগে দেশে রডের দাম যেখানে ছিল, এখন তার চেয়ে টনপ্রতি ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা বেশি। এই অবস্থায় বাজেটে সুখবরের আশায় ছিলেন রডের ক্রেতা বা গ্রাহকেরা। কিন্তু বাজেট ঘোষণার পর তাঁদের হতাশ হতে হয়েছে।

তবে দেশীয় উদ্যোক্তারা স্বস্তি পাচ্ছেন। কারণ, ২০২১–২২ অর্থবছরের বাজেটে রডের কাঁচামাল আমদানির ওপর অগ্রিম কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর ফলে ব্যবসায় লাভ–লোকসান যা–ই হোক, পণ্য উৎপাদনের আগেই কাঁচামাল আমদানিতে তাঁদের অগ্রিম কর পরিশোধ করতে হবে না।

অগ্রিম করের চাপ থেকে মুক্ত হলেন ইস্পাত খাতের উদ্যোক্তারা। তবে শুল্ক না কমায় এবং বিশ্ববাজার চড়া থাকায় গ্রাহকদের অস্বস্তি বাড়বে

প্রস্তাবিত বাজেটে ইস্পাত শিল্পের কাঁচামাল ও রাসায়নিক মিলিয়ে প্রধান চারটি পণ্য আমদানিতে অগ্রিম কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে স্ক্র্যাপ বা পুরোনো লোহার টুকরা, পুরোনো জাহাজ, স্পঞ্জ আয়রন ও ফেরো অ্যালয় নামের রাসায়নিক। এসব কাঁচামাল ও রাসায়নিক আমদানিতে চলতি ২০২০–২১ অর্থবছরে অগ্রিম কর ছিল চার শতাংশ। তার আগে ছিল পাঁচ শতাংশ। আমদানির পর অবশ্য এই কর সমন্বয় করা হয়ে থাকে।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত বৃহস্পতিবার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের অন্যতম উপকরণ হচ্ছে সিমেন্ট, লৌহ এবং লৌহজাত পণ্য। এসব পণ্য উৎপাদনে নিয়োজিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে করসুবিধা দেওয়া হলে ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ সহজ ও সাশ্রয়ী হবে। বাজেট বক্তৃতায় তিনি অগ্রিম কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়ার দিনেই এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়েছে।

অগ্রিম কর কমানোয় মূলত সুবিধা পাবেন উদ্যোক্তারা। শুল্ক কমালে পরোক্ষভাবে সুবিধা পেতেন ভোক্তারা। কিন্তু বাজেটে রড তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কর কমানো হয়নি। শুধু স্টেইনলেস স্টিল বা মরিচারোধী ইস্পাতের পুরোনো টুকরা বা বর্জ্য আমদানিতে টনপ্রতি নির্ধারিত শুল্ক দেড় হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৫০০ টাকা করা হয়েছে। বিস্ময়কর হলো, গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে এই পণ্য এক কেজিও আমদানি হয়নি। বরং এই পণ্য দেশ থেকে রপ্তানি হয়। চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে মরিচারোধী এই ইস্পাতের পুরোনো টুকরা রপ্তানির ফলে দেশে ৩ কোটি ১৭ লাখ ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা এসেছে।

জানতে চাইলে শীর্ষস্থানীয় ইস্পাত পণ্য রড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) তপন সেনগুপ্ত প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগাম কর বাবদ শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর বছরে ৫০ থেকে দেড় শ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হতো। এটা চলতি মূলধনের টাকা। এই টাকা আটকে থাকায় এত দিন পুঁজিতে টান পড়ত। অগ্রিম কর প্রত্যাহারের ফলে এই টাকা আর আটকে থাকবে না। মূলধন আটকে না থাকলে সুদও দিতে হবে না। তাই বলব, সরকার খুব ভালো একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

বাজেট উদ্যোক্তাদের এমন স্বস্তি এনে দিলেও গ্রাহকদের জন্য স্বস্তির খবর নেই। কারণ অবশ্য বিশ্ববাজার। বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম গেল নভেম্বর থেকে ঊর্ধ্বগতিতে ছুটছে। যেমন, নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে রড তৈরির প্রধান কাঁচামাল গলনশীল ভারী লোহার টুকরা (এইচএমএস) বিশ্ববাজারে টনপ্রতি ৩১০–৩১২ ডলারে বেচাকেনা হয়েছিল। উত্থান–পতন শেষে গতকাল বিশ্ববাজারে একই ক্যাটাগরির কাঁচামাল বিক্রি হয়েছে ৫০৫ থেকে ৫২২ ডলারে। টনপ্রতি দাম বেড়েছে ১৯৫–২১০ ডলার।

ইস্পাতের কাঁচামালের ৯৫ শতাংশের বেশি আমদানি করে স্থানীয় চাহিদা মেটানো হয়। তাই বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারে। এখন কোম্পানিভেদে প্রতি টন ভালো মানের রড বিক্রি হচ্ছে ৬৯ হাজার থেকে ৭৪ হাজার টাকা, যা গত বছরের নভেম্বরের তুলনায় ১৬–১৮ হাজার টাকা বেশি। দাম বাড়ায় নির্মাণশিল্পে ব্যয় বেড়েছে।

ব্যক্তি খাতের নির্মাণকাজ শুরুর অপেক্ষায় থাকা একজন শিপিং ব্যবসায়ী প্রথম আলোকে জানান, দেশে রডের দাম যেমন চড়া, তেমনি বাজেটেও সুখবর নেই। রডের দাম গত ছয় মাসে যেভাবে বেড়েছে, তাতে গ্রামে বাড়ির কাজে হাত দেওয়ার সাহস পাচ্ছেন না তিনি।

মেট্রোসেম স্টিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘বিশ্ববাজারে ইস্পাতের কাঁচামালের দাম বাড়ায় ভারত ও চীন শুল্ক প্রত্যাহার করেছে। আমাদের এখনো টনপ্রতি ১ হাজার ৫০০ টাকা শুল্ক রয়ে গেছে। এটা প্রত্যাহার হলে ভোক্তাদের জন্য স্বস্তি থাকত।’