দুই কারণে বাড়ছে রডের দাম

  • কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে গত দুই মাসে টনপ্রতি রডের দাম ১২-১৩ হাজার টাকা বেড়েছে।

  • বর্তমানে চট্টগ্রামে ভালো মানের (৬০ গ্রেডের ওপরে) প্রতি টন রড বিক্রি হচ্ছে গড়ে সাড়ে ৬৫ হাজার টাকায়।

  • বিএসআরএমের ভালো মানের রড বিক্রি হচ্ছে ৬৭ হাজার ৫০০ টাকায়।

রডের দাম নিয়ে বাজারে কোনো সুখবর নেই। গত নভেম্বর থেকে বিশ্ববাজারে রড তৈরির কাঁচামালের দাম বাড়ছে। দেশের বাজারেও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রডের দাম। টনপ্রতি রডের দাম গত দুই মাসেই বেড়েছে ১২-১৩ হাজার টাকা। তাতে বিপাকে পড়েছেন ব্যক্তি খাতে বাড়ি নির্মাণকারী, আবাসন ব্যবসায়ী ও সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদারেরা।

ইস্পাত খাতের কয়েকজন ব্যবসায়ী বলছেন, বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম ব্যাপকভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে শীতকাল, নির্মাণকাজের ভরা মৌসুম হওয়ায় রডের চাহিদা বেশি। এই দুই কারণেই রডের দাম বেড়েছে। কাঁচামালের দাম না কমলে সামনের মাসগুলোতে দেশের বাজারে রডের দাম টনপ্রতি ৭০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বিশ্ববাজারে রডের কাঁচামালের দাম যে পর্যায়ে চলে গেছে, তা দিয়ে রড তৈরি করতে গেলে খরচ অনেক বেশি পড়বে।
বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত

বর্তমানে চট্টগ্রামে ভালো মানের (৬০ গ্রেডের ওপরে) প্রতি টন রড বিক্রি হচ্ছে গড়ে সাড়ে ৬৫ হাজার টাকায়। তা ছাড়া বিএসআরএমের ভালো মানের রড বিক্রি হচ্ছে ৬৭ হাজার ৫০০ টাকায়। কেএসআরএমের রডের দাম ৬৭ হাজার টাকা। গত নভেম্বরে চট্টগ্রামে ৫৩-৫৪ হাজার টাকায় ভালো মানের রড বিক্রি হয়েছে। তবে পরিবহন খরচ যোগ হওয়ায় রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য জেলায় রডের দাম আরেকটু বেশি হয়।

জানতে চাইলে ইস্পাত খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে রডের কাঁচামালের দাম যে পর্যায়ে চলে গেছে, তা দিয়ে রড তৈরি করতে গেলে খরচ অনেক বেশি পড়বে। সরকারের বড় প্রকল্পে রড সরবরাহ যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্যই বাড়তি দামেও কাঁচামাল আমদানি করতে হচ্ছে। কাঁচামালের দাম বাড়তে থাকায় মূলত রডের দাম সমন্বয় করা হচ্ছে।’  

বিশ্ববাজারে সংকট

রড তৈরির কাঁচামাল হলো পুরোনো লোহার টুকরা। এই কাঁচামাল সরাসরি আমদানি করে প্রায় ৭০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করে দেশীয় উৎপাদকেরা। বাকি প্রায় ৩০ শতাংশ জাহাজভাঙা শিল্প থেকে আসে। উন্নত দেশগুলোতে পুরোনো অবকাঠামো ভাঙার পর এই কাঁচামাল পাওয়া যায়। আবার ইস্পাতের ব্যবহার্য পণ্যও কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হয়।

ব্যবসায়ীরা জানান, মহামারির সময় গত বছরে বিশ্বজুড়ে উন্নয়ন কার্যক্রম থমকে যায়। তাতে লোহার টুকরা উৎপাদন কমে যায়। করোনার ধাক্কা কিছুটা কাটিয়ে ওঠার পর গত বছরের শেষে উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হলে চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকে। তবে কাঁচামালের জোগান কমতে থাকায় দাম বাড়ে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় উৎপাদক দেশ চীন বিশ্ববাজার থেকে নিজেই পুরোনো লোহার টুকরা কিনতে শুরু করায় তেতে উঠেছে কাঁচামালের বাজার।

গত নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বিশ্ববাজারে টনপ্রতি ভালো মানের পুরোনো লোহার টুকরা বিক্রি হয়েছে ৩৩৩ ডলার। তা এখন দেশভেদে ৪৯০ থেকে ৫০০ ডলারে বেচাকেনা হচ্ছে। আবার সাধারণ মানের লোহার টুকরার দাম নভেম্বরে ছিল ৩০৭ ডলার, তা এখন ৪৬০-৪৭০ ডলারে বেচাকেনা হচ্ছে। দুই মাসের ব্যবধানে টনপ্রতি ১৫০ ডলার দাম বেড়েছে।

পণ্যভিত্তিক তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘ফাস্টমার্কেটস’ গত শুক্রবার এক প্রতিবেদনে বলেছে, বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া থেকে সাধারণ মানের লোহার টুকরা টনপ্রতি ৪৭০-৪৮০ ডলারে কিনেছে বাংলাদেশের উৎপাদকেরা।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক পুরোনো লোহার টুকরা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জাগুয়ার স্টিলের বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার ইফতেখার আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ভালো মানের স্ক্র্যাপের (পুরোনো লোহার টুকরা) দাম এখন দেশভেদে ৪৯০ থেকে ৫০০ ডলার। সাধারণ মানের স্ক্র্যাপ ৪৬০-৪৭০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। উন্নত দেশগুলোতে করোনার কারণে স্ক্র্যাপ সংগ্রহ কমে যাওয়ায় ও কনটেইনার ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় দাম বাড়ার মূল কারণ।

ব্যবসায়ীরা বিপাকে

দেশে বছরে রডের চাহিদা ৫৫ লাখ টনের বেশি। সেই হিসাবে মাসে সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ টন রড দরকার হয়, শুষ্ক মৌসুমে চাহিদা আরও বেশি। হিসাব করে দেখা যায়, টনপ্রতি গড়ে ১২-১৩ হাজার টাকা বাড়লে প্রতি মাসে গ্রাহকদের বাড়তি ব্যয় দাঁড়াবে সাড়ে পাঁচ শ কোটির টাকার বেশি।

আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘রডের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় আমাদের প্রকল্পের নির্মাণ খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অথচ করোনার এ সময়ে আমরা ফ্ল্যাটের দাম বাড়াতে পারব না। সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে আপাতত রডের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাস করলে সবাই উপকৃত হবে।’

দেশে স্বয়ংক্রিয় ইস্পাত কারখানা আছে ৪২টি। সনাতন পদ্ধতির কারখানা ১০০-এর কম। ইস্পাত খাতে রডসহ সব ধরনের উৎপাদিত পণ্যের বার্ষিক বিক্রির পরিমাণ ৪৫ হাজার কোটি টাকা। দেশে একক খাত হিসেবে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয় ইস্পাতশিল্পে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ মাসাদুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ২০০৮ সালের পর চীন স্ক্র্যাপ আমদানি শুরু করায় আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বেড়েছে। জাহাজ ভাড়াও বেশি গুনতে হচ্ছে। আবার শীতকালে নির্মাণকাজের ভরা মৌসুমে রডের দাম ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা বাড়তি থাকে। বর্তমান দরকে স্বাভাবিক দাবি করে তিনি বলেন, ৪৫০ ডলার বা তার বেশি দামে কেনা কাঁচামাল দেশে এলেই রডের দাম আরও বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকবে না।

অবশ্য রডের বর্তমান দামকে স্বাভাবিক বলতে চান না সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত ঠিকাদারদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনস্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এস এম খোরশেদ আলম। তিনি বলেন, ২৫-৩০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি স্বাভাবিক হতে পারে না। রডের কারণে ইতিমধ্যে প্রকল্পের খরচ ৭-৮ শতাংশ বেড়ে গেছে।